Work Rules, My Men

কাজে মনোযোগ ও আগ্রহ তৈরী করার কৌশল

কাজ শুরু করার প্রথম ধাপ: মনোযোগ ফিরে পাওয়ার কৌশল

২০১৬ সালে আমি যখন পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ যাই। তখন ১০১৭ কিলোমিটার রাস্তাকে আমি ৩৭ দিনে ভাগ করে নিয়েছে। সূতরাং প্রতিদিন আমি শুধু সেদিনের রাস্তা বা ২৫ কিংবা ৩৫ কিলোমিটার পথ নিয়েই ভাবতাম। একসময় আমার ৪৬ দিনে ১২৭৬ কিলোমিটার ভ্রমণ হয়ে যায়। আমার এখন মনে হলে বুকের ধুক করে উঠে কারণ এখন আমি একসাথে ১২৭৬ কিলোমিটারের কথা কল্পনা করি। তখন কিন্তু   এই বিশাল লক্ষ্য মাথায় আসতো না। বিশেষ করে প্লান করে ফেলার পর।

সূতরাং বড়ো এবং নিরস কাজগুলোতে আমাদের ভীতি ও অনীহা থাকে। আমার এখনো থাকে। তবুও শেষতক বের হয়ে আসার চেষ্টা করি।

জীবনে আমরা প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সামনে থাকলেও তার প্রতি মনোযোগ বা আগ্রহ তৈরি হয় না। কাজটা হয়তো বড়, জটিল কিংবা নতুন, তাই মস্তিষ্ক সেটাকে এড়িয়ে যেতে চায়। ফলে কাজ শুরু না করে আমরা সময় নষ্ট করি, অপরাধবোধে ভুগি। অথচ আসল সত্য হলো—আগ্রহ জাগানোর জন্য অপেক্ষা না করে ছোট ছোট পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমেই সেই আগ্রহ তৈরি হয়।

আমরা অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে পড়ি—একটা কাজ জরুরি, গুরুত্বপূর্ণ, নতুন, অথচ মনে হচ্ছে একেবারেই শুরু করা যাচ্ছে না। কাজটা যত বড় বা জটিল, ততই মস্তিষ্ক সেটাকে এড়িয়ে যেতে চায়। ফলে সময় নষ্ট হয়, চাপ বাড়ে, আর কাজ পিছিয়ে যায়।

কেন কাজ শুরু করতে সমস্যা হয়?

  1. কাজ বড় বা জটিল মনে হওয়া।

  2. কোথা থেকে শুরু করব—এ নিয়ে দ্বিধা।

  3. অন্য বিনোদনমূলক কাজের প্রতি আকর্ষণ।

  4. ব্যর্থতার ভয়ে পেছনে থাকা।

১. ৫ মিনিটে গুচিয়ে নিন

কাজটাতে কি কি করতে হবে। ডায়রীতে একটা ছোট নোট নিন। কোনটার আগে কোনটি সে হিসেবে।  প্রথম কাজটা করে ফেলুন বাকী কাজ কোনদিন কোনটা করবেন লিখে ফেলুন।  মনে মনে ও বলুন প্রতিদিন মাত্র ১ ঘন্টা কাজ করতে হবে। মানে যে সময়টা লাগবে সেটা বলুন।

৩. কাজকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করুন

পুরো কাজটাকে মাথায় নিয়ে বসলে মস্তিষ্ক ভড়কে যায়। কাজটা ৫–১০ মিনিটে বড় কাজ হলে ৩০ মিনিট বা ঘন্টায় শেষ করা যায় এমন ছোট ছোট ধাপে ভেঙে নিন।পুরো কাজের দিকে না তাকিয়ে শুধু প্রথম ধাপ ধরুন। যেমন: “ডকুমেন্ট খুলব” বা “এক লাইন লিখব।”

৪. সময় নির্ধারণ করে নিন (Pomodoro কৌশল)

২৫ মিনিট কাজ + ৫ মিনিট বিরতি। ভাবুন, “শুধু ২৫ মিনিট কাজ করব, তারপর বিরতি নেব।” কাজটি ২৫ মিনিটের বেশী হলে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নিন।  প্রতিটি বিরতিতে অন্য একটা করুন। ১ প্লাস পানি খান। জানালাই দিয়ে বাইরে দেখুন। পেট এর সাথে সময় দিন। ইত্যাদি। এরমধ্যে জটিল আর একটা কাজ না ঢুকানো ভাল। যেমন দেনাদারকে ফোন দেয়া। কারণ এতে জটিল চিন্তা আসলে কাজে মনোযোগ নষ্ট হতে পারে। তবে জরুরী কিছু করার কথা মনে আসলে তা লিখে রাখুন। অনেক সময় দেখা যাবে সেই ২৫ মিনিট শেষে আপনার কাজ চালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে।

৫. শুরু করার জন্য রিচুয়াল বানান

কাজ শুরু করার আগে একটা ছোট রুটিন করুন, যেমন—টেবিল গুছানো, পানি খাওয়া বা চা খাওয়া, ফোনটা সাইলেন্টে রাখা। এই ছোট রিচুয়াল মস্তিষ্ককে সিগন্যাল দেবে: এখন কাজ শুরু হবে।

৬. কাজের উদ্দেশ্য মনে করুন

নিজেকে প্রশ্ন করুন: এই কাজটা করলে আমার কী লাভ হবে? না করলে কী ক্ষতি হবে? উত্তরগুলো লিখে রাখুন। “কাজের উদ্দেশ্য” মনে থাকলে কাজের ভেতরে ঢোকা সহজ হয়। যদি অর্থ উপার্জন হয়। তাহলে সে অর্থ দিয়ে কি ক্রয় করবেন এবং যা ক্রয় করবেন তা আপনার জীবনে কি কাজে লাগবে তার একটি কাল্পনিক চিত্র ধ্যান করে নিন।

৭. নিজেকে চাপ নয়, খেলা হিসেবে নিন

ভাবুন, “আমি এখন চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি—শুধু প্রথম ধাপটা শেষ করব।” কাজকে গেমিফাই করুন (ধাপে ধাপে ছোট জেতা)। প্রত্যেক বার নির্ধারিত কাজ শেষ করার পর মনে মনে বলুন। দারুন আমি এটা পেরেছি।

৮. কাজটাকে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যের সাথে করে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিন

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—এই কাজ শেষ হলে আমি কী পাব? এটা কি আমার স্বপ্ন, ক্যারিয়ার, সুনাম বা মানসিক শান্তির সাথে সম্পর্কিত?  উদাহরণ: স্টিভ জবস বলতেন, “আপনি যদি এমন কিছু করেন যা আপনি ভালোবাসেন না, তবে সেটিকে টেনে নেওয়া সম্ভব হবে না।” তাই কাজের ভেতরে নিজের ভালোবাসা বা লাভ খুঁজে বের করুন।

পাশাপাশি কাজটাকে শুধু দায়িত্ব হিসেবে না দেখে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিন। ভাবুন: “এটা করলে নতুন কী শিখব?” “কাজটা শেষ করলে আমার কী দক্ষতা বাড়বে?”  আইনস্টাইন বলেছিলেন, “আমার কোনো বিশেষ প্রতিভা নেই, আমি শুধু প্রচণ্ড কৌতূহলী।”

৯. আজই শুরু করুন বা এখনি শুরু করুন

বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথায় অনুপ্রেরণা:

  • টলস্টয় বলেছিলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হলো এখন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সামনে যা আছে, সেটাই।”

  • মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, “কোনো কাজ করতে চাইলে, সেটাকে ভেঙে ছোট করে ফেলো। তখন সেটি সহজ হয়ে যাবে।”

  • ব্রুস লি বলেছিলেন, “জানা যথেষ্ট নয়, প্রয়োগ করতে হবে। ইচ্ছা করলেই হবে না, করতে হবে।”

এই বাণীগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কাজ এড়িয়ে যাওয়ার চেয়ে শুরু করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পরিকল্পনা করে কাজটি আগামী শুক্র কিংবা রবিবার ১ তারিখ কিংবা ১০ তারিখের জন্য রাখবেন না। আজকেই শুরু করুন। এখনি কিছু একটা করে প্রথম ধাপ শেষ করুন। তাহলে পরবর্তী ধাপগুলো করার জন্য তাড়া অনুভভ করবেন। শুরুটা যত ছোট করা যায় তত ভালো। শুরু হলে গতি নিজে থেকেই আসবে এবং আনন্দ পাবেন।

ধরুন আপনার ঘরের সামনে একটা বিশাল পুকুর রয়েছে। যেটা কাজে লাগে না। আপনি এটা ভরাট সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনার ভাইয়ের সাথে করলেন। কিন্তু এই বিশাল কাজটা করতে সে রাজি হলো তাতে আপনিও পেছনে হটলেন। কারণ হিসেব করে দেখলেন ৫ জন শ্রমিক ৭ দিন কাজ করতে হবে। পরে পরিকল্পনা বাদ দিলেন।

কিন্তু ৬ মাস দেখলেন এটা অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে। কারণ লোকেরা প্রতিদিন তাতে ময়লা ফেলছে। এখন হিসেবটা দেখুন। ৫ জন শ্রমিক যদি দিনে ৮ ঘন্টা করে ৭ দিন কাজ করে তাহলে মোট কাজের ঘন্টা দাড়ায় ২৮০ ঘন্টা। এখন আপনি যদি প্রতিদিন সকালে আপনার এক্সারসাইজের বদলে ১ ঘন্টা করে কাজ করেন। এটা ২৮০ দিনে কাজটা হয়ে যাবে।

অথবা আপনি যদি কাউকে একা কাজটি করতে বলেন সে হয়তো ঘাবড়ে যাবে। কিন্তু যদি এমন হয় প্রতিদিন ১০০ মোট ২৮,০০০ কেজী মাটি হলে এটি ভরাট হয়ে যাবে। তাহলে আপনি আপনার ভৃত্যকে শুধু বলুন প্রতিদিন সে যেন ১০০ কেজী মাটি ফেলে তাতেই কাজটি এক দ্বারাই শেষ হয়ে যাবে।

এরকম জটিল ও নিরস কাজগুলো আমরা নানাভাবে করতে পারি। কিন্তু আমার এই সমস্যাটা হয়। ব্রায়ান ট্রেসির ইট দ্যা ফ্রগ বইটা পড়ে সমস্যাটা বুঝতে পারি। এর সমাধান কি এই নিয়ে কাজ করে এটা লিখলাম। নতুন করে নিজে অনুপ্রাণীত হওয়ার জন্য।

কাজ যত বড়ই হোক, শুরু করার জন্য দরকার ছোট্ট এক ধাপ। যতক্ষণ না আপনি প্রথম ধাপ নেন, পুরো কাজটাই পাহাড়ের মতো মনে হবে। কিন্তু একবার শুরু করলে গতি নিজে থেকেই আসতে শুরু করবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply