ভাষা সৈনিক মমতাজ বেগম
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কথা উঠলে আমরা শহীদদের নাম জানি, ছাত্রনেতাদের স্মরণ করি, ভাষাসৈনিকদের ইতিহাস পড়ি। কিন্তু এক নারীর নাম অনেক সময়ই আড়ালেই থেকে যায়—মমতাজ বেগম। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার “অপরাধে” যিনি স্বামীর দেওয়া তালাকনামা গ্রহণ করেছিলেন। কতজন জানি তাঁর কথা?
যে মানুষটিকে ভালোবেসে তিনি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কলকাতা ছেড়ে এসেছিলেন পূর্ববাংলায়, আপন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন—সেই স্বামীই তাঁকে জেলখানায় তালাক পাঠান। কারণ তিনি আপস করেননি। পাকিস্তান সরকারের দেওয়া শর্তাধীন বন্ডে স্বাক্ষর করলে তাঁর সংসার টিকে যেত, সরকারি চাকরি রক্ষা পেত, বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে হতো না। কিন্তু তিনি মিথ্যার কাছে মাথা নত করেননি।
মমতাজ বেগমের জন্ম ১৯২৩ সালের ২০ মে, পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার শিবপুরে, এক সম্ভ্রান্ত কিন্তু অত্যন্ত রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারে। তাঁর আসল নাম ছিল কল্যাণী রায়চৌধুরী, ডাকনাম মিনু। বাবা রায়বাহাদুর মহিমচন্দ্র রায়চৌধুরী ছিলেন Calcutta High Court-এর বিচারপতি এবং মা মাখনমতি দেবী ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষিকা। প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী ছিলেন তাঁর মামা।
রক্ষণশীল পারিবারিক পরিবেশে মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ ছিল সীমিত। তবুও অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে তিনি ১৯৩৮ সালে কলকাতা থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর পরিবার থেকে পড়াশোনা বন্ধের চাপ আসে। কিন্তু নিজের অনড় অবস্থানের কারণে অবশেষে কঠোর পর্দা প্রথার মধ্যে থেকেই পড়ার অনুমতি পান। ১৯৪২ সালে Bethune College থেকে বিএ পাশ করেন। পরে ১৯৫১ সালে University of Dhaka-এর অধীনে বিএড সম্পন্ন করেন। ১৯৫৮ সালে এডুকেশন ওয়ার্কশপ ফর টিচার্স কোর্স শেষ করেন এবং ১৯৬৩ সালে এমএড ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৪২ সালে তিনি State Bank of India-এ যোগ দেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে ময়মনসিংহে চলে আসেন এবং বিদ্যাময়ী স্কুলে সাত মাস সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জের মর্গ্যান হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে আনন্দময়ী গার্লস স্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হন এবং পরবর্তীতে আহমদ বাওয়ানী জুটমিল বিদ্যালয়েও প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে ‘শিশু নিকেতন’ নামে একটি স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন।
অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়েও তিনি ভালোবেসে বিয়ে করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও পরবর্তীতে সিভিল সাপ্লাই অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নাফকে। ধর্মান্তরিত হয়ে তিনি ‘মমতাজ বেগম’ নাম গ্রহণ করেন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তাঁর সংসার ভেঙে যায়। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার দায়ে স্বামীর দেওয়া তালাক গ্রহণ করা তিনিই ছিলেন একমাত্র নারী।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি নারায়ণগঞ্জের মর্গ্যান হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে মর্গ্যান স্কুলের নিকটবর্তী রহমতুল্লাহ মুসলিম ইনস্টিটিউট মাঠে বিশাল জনসভা হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। ওই সভায় মর্গ্যান স্কুলের ছাত্রী ও নারীদের প্রথম মিছিল নিয়ে উপস্থিত হন মমতাজ বেগম। সারা দেশে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকার পরও বিক্ষুব্ধ জনতা মিছিল বের করে, আর নারীদের নিয়ে নেতৃত্ব দেন তিনি।
রক্ষণশীল পরিবেশ ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে নারীদের সংগঠিত করা এবং ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করতে গোপন বৈঠক ও মতবিনিময়ের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। তিনি তৎকালীন রাজনীতিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং আদমজী জুট মিলের শ্রমিকদের সঙ্গেও একাধিক বৈঠক করে আন্দোলনে উৎসাহিত করেন।
২৯ ফেব্রুয়ারি সকালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে হাইকোর্টে নেওয়া হয়; জামিন নামঞ্জুর হয়। খবর ছড়িয়ে পড়তেই নারায়ণগঞ্জ উত্তাল হয়ে ওঠে। জনতা থানা ঘেরাও করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তাঁকে ঢাকায় নিতে চাইলে চাষাড়া এলাকায় জনতার তীব্র বাধার মুখে পড়ে। লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। ঢাকা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী আসে। উত্তাল জনতা চাষাড়া থেকে পাগলা পর্যন্ত প্রায় ১৬০টি গাছ কেটে ব্যারিকেড তৈরি করে। সংঘর্ষে শত শত মানুষ আহত হন, শতাধিক গ্রেপ্তার হন। অবশেষে গভীর রাতে ট্রাকে করে তাঁকে ও অন্য গ্রেপ্তারদের ঢাকায় নেওয়া হয়। এ ঘটনা দৈনিক আজাদ এবং ভারতের দ্য স্টেটসম্যানসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
সরকার শর্তাধীন বন্ডে স্বাক্ষর করে মুক্তির প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। মাতৃভাষার অধিকারের প্রশ্নে আপস তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই অস্বীকৃতির ফলেই তাঁকে চাকরি হারাতে হয়। যে মানুষটির জন্য ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, সেই স্বামী আব্দুল মান্নাফ জেলখানাতেই তাঁকে তালাক দেন। মহান ভাষা আন্দোলনের কারণে তিনিই প্রথম এবং একমাত্র চাকরিচ্যুত নারী। প্রায় দেড় বছর কারাভোগের পর ১৯৫৩ সালের মে মাসে মুক্তি পান।
মুক্তির পর তাঁর জীবন ছিল অভাব, একাকীত্ব ও দারিদ্র্যে ভরা। কারাগারের নির্যাতনে শরীর ভেঙে যায়। তবুও তিনি শিক্ষা বিস্তারে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ষাট বছর পর ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। নারায়ণগঞ্জের মর্গ্যান হাইস্কুলের সামনের সড়কের নামকরণ করা হয় ‘ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগম সড়ক’। একুশের হত্যাকাণ্ডের পর সর্বাধিক সময় কারাভোগ করা প্রথম নারী ছিলেন তিনি—প্রায় দেড় বছর।
১৯৬৭ সালের ৩০ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শোনা যায়, তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
ভাষার মাসে, আমৃত্যু আপসহীন এই সাহসিনী নারীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ও রোয়ার মিডিয়া

