passport servicce

কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ববোধের অভাব

কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ববোধের অভাব, মানসিকতা ও আচরণগত সমস্যা

বাংলাদেশে অফিস পলিটিক্স আর গ্রুপিং খুব মারাত্মক সমস্যা। আমার একবার শীর্ষস্থানীয় হোটেলগুলোর ম্যানেজমেন্টদের সাথে একটি প্রশিক্ষণে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ হয়েছে। প্রায় সব হোটেলেই শীর্ষপদে বিদেশী কর্মী। আমি যখন তাদের প্রশ্ন করলাম কেন দেশী কর্মী নয়। তখন তারা বলল দেশীদের এই কয়টি সমস্যা আছে।

ক) তারা ম্যানেজার বা বস সেজে থাকে নিচের পর্যায়ে কাজে মনোযোগ দেয় না, সমস্যা হলে হাত লাগায়না অধীনস্থর দোষ দিয়ে দায় সারে।  বিদেশীদের এই সমস্যা নেই। তারা যেকোন কাজ অবলীলায় করে।

খ) তারা গ্রুপিং করে পরে কোনো কারণে তার চাকরি চলে গেলে গ্রুপ নিয়ে টান দেয়।   এটাও বিদেশীদের করার সুযোগ নেই। চাকরি চলে গেলে সে পেছনের কথা ভুলে নতুন চাকরির সন্ধান করবে।

গ) বিশেষ করে নতুনরা বা নতুন প্রমোশন হলে কাজ করতে চায়না, তারা ভাবে আমার আসল জায়গা আরো উপরে সেখানে গিয়ে কাজ করবো এখানে আপাতত টাইম পাস করলে হবে। কিন্তু বিদেশীরা মনে করে এখানে আমার সেরাটা দিয়ে আমার ব্যক্তিগত ইমেজহ উন্নত করতে হবে।

যাই হোক এবার মূল আলোচনায় আমি।  কর্মক্ষেত্রে শুধু দক্ষতা থাকলেই সফল হওয়া যায় না; প্রয়োজন সঠিক মানসিকতা, দায়িত্ববোধ এবং ইতিবাচক আচরণ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কর্মীদের মধ্যে দায়িত্ব এড়িয়ে চলা, নেতিবাচক মনোভাব ও অপ্রফেশনাল আচরণ প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। নিচে এই সমস্যাগুলো বিশদভাবে তুলে ধরা হলো—

 নিজের কাজ অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া

অনেক কর্মী নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে অন্য সহকর্মীর উপর কাজ চাপিয়ে দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এতে কর্মপরিবেশে ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং দায়িত্বশীল কর্মীরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দলের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

 অন্যের ভুল খুঁজে বের করার প্রবণতা

কিছু কর্মী নিজের উন্নতির দিকে মনোযোগ না দিয়ে বরং অন্যের ভুল খুঁজে বের করতে বেশি আগ্রহী থাকে। এই প্রবণতা একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতা ও সমালোচনার পরিবেশ তৈরি হয়।

 মনোযোগের অভাব

অফিস সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগত কাজ, সোশ্যাল মিডিয়া বা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে সময় ব্যয় করলে কাজের প্রতি মনোযোগ কমে যায়। এতে কাজের গুণগত মান নষ্ট হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

 কাজের চাপ নিতে না পারা

অনেক কর্মী কাজের চাপ এলে ভেঙে পড়েন বা দায়িত্ব এড়িয়ে চলেন। এর ফলে কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি হয়।

 অন্যের বদনাম করা

সহকর্মীদের নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা বা গসিপ কর্মপরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে। এটি পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করে এবং দলগত কাজকে বাধাগ্রস্ত করে।

 অন্যকে ডিমোটিভ করা

কিছু কর্মী ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্যকে নিরুৎসাহিত করে। এতে কর্মীদের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং তাদের কাজের প্রতি আগ্রহও হ্রাস পায়।

 কেন এমন হয়?

এই ধরনের আচরণের পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—

প্রথমত, অফিস সময়ের মধ্যে অন্য কাজে যুক্ত থাকার সুযোগ পেলে কর্মীদের মনোযোগ ধীরে ধীরে মূল কাজ থেকে সরে যায়। এটি অভ্যাসে পরিণত হলে তারা কাজকে গুরুত্বহীন মনে করতে শুরু করে।

দ্বিতীয়ত, অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজের সুনির্দিষ্ট বণ্টন থাকে না। একই কাজের বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদা ব্যক্তিকে দেওয়া হলেও কারো ওপর পূর্ণ জবাবদিহিতা থাকে না। ফলে দায়িত্ববোধ তৈরি হয় না।

তৃতীয়ত, ম্যানেজমেন্ট যদি সরাসরি কর্মীর কাজ সম্পর্কে না জেনে অন্যের কাছ থেকে তথ্য নেয়, তাহলে কর্মীদের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে কথা বলার প্রবণতা বাড়ে। এতে গসিপ ও নেতিবাচকতা বৃদ্ধি পায়।

চতুর্থত, কাজের চাপ কীভাবে সামলাতে হবে সে বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ, দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা না থাকলে কর্মীরা চাপের মুখে দুর্বল হয়ে পড়ে।

 সমাধান কী?

এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি—

প্রথমত, প্রত্যেক কর্মীর দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং তার কাজের জন্য তাকে সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এতে দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পাবে।

দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অন্যের ভুল ধরার বদলে সহযোগিতা ও সমাধানমুখী মনোভাবকে উৎসাহ দেওয়া হবে।

তৃতীয়ত, অফিস সময়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কঠোর নীতি প্রণয়ন করতে হবে এবং মনোযোগ ধরে রাখার জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও ফিডব্যাক দিতে হবে।

চতুর্থত, কর্মীদের জন্য স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, টাইম ম্যানেজমেন্ট এবং প্রফেশনাল আচরণ বিষয়ক প্রশিক্ষণ আয়োজন করতে হবে। বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে তাদের শেখানো প্রয়োজন কিভাবে চাপের মধ্যে থেকেও কার্যকরভাবে কাজ করা যায়।

পঞ্চমত, ম্যানেজমেন্টকে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। কোনো কর্মীর বিষয়ে জানতে হলে তার কাছ থেকেই জানতে হবে এবং অন্যের বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা নিরুৎসাহিত করতে হবে।

ষষ্ঠত, কর্মীদের অনুপ্রাণিত করতে নিয়মিত প্রশংসা, স্বীকৃতি এবং ইতিবাচক ফিডব্যাক দেওয়া জরুরি। এতে তারা আরও ভালো কাজ করতে উৎসাহিত হবে।

কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ববোধ ও ইতিবাচক আচরণ একটি প্রতিষ্ঠানের সফলতার মূল ভিত্তি। ছোট ছোট নেতিবাচক অভ্যাস ধীরে ধীরে বড় সমস্যায় পরিণত হতে পারে। তাই সময় থাকতেই সচেতনতা, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। একটি সুস্থ, সহযোগিতামূলক এবং দায়িত্বশীল কর্মপরিবেশই পারে একটি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদে সফলতার পথে এগিয়ে নিতে।

লেখাটি বাস্তবসম্মত নোট থেকে এআই দিয়ে গুচিয়ে নেয়া হয়েছে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply