এস্তোনিয়া বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল দেশ

এস্তোনিয়া বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল দেশ

এস্তোনিয়া বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল দেশ

এস্তোনিয়া মূলত জলা ও প্রাচীণ অরণ্যে ঘেরা উত্তর ইউরোপের একটি দেশ। দেশটির উপকূলীয় জলসীমায় বহু দ্বীপ রয়েছে। এস্তোনিয়ার রাজধানী তাল্লিন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাল্টিক সমুদ্রবন্দর এবং দেশের বৃহত্তম শহর। ইইউ ও সেনজেনভুক্ত এস্তোনিয়া মানবাধিকার সূচকে সব চাইতে ওপরে এটা সবাই জানি কিন্তু এই শতকে এস্তোনিয়া নিজেদের নতুন পরিচয় উন্মোচন করেছে। এই দেশটি পরিচিত ডিজিটাল দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এটি বিশ্বের সর্বপ্রথম রাষ্ট্র যারা তাদের সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয় অনলাইনে। দেশটির সবরকম গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সাইন করা হয় ডিজিটালি। এস্তোনিয়া পৃথিবীতে ‘ই-কান্ট্রি’ হিসেবে পরিচিত।

এই দেশের উচ্চমানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগের জন্য পরিচিত। দেশটি সামাজিক সূচক, মানবিক নিরাপত্তা, সম্পদের পর্যাপ্ততা, অভিবাসীদের জন্য সুবিধা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এস্তোনিয়া সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে উচ্চ স্থান অধিকার করে। দেশটির মানব উন্নয়ন সূচক (HDI) উচ্চ, যা জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানের প্রতিফলন। এস্তোনিয়ায় অপরাধের হার তুলনামূলকভাবে কম, যা মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

জাতিতত্ব ও নাগরিক নীতি

জাতিগতভাবে একজাতীয়অ ১৫টি কাউন্টির মধ্যে ১৩টিতে ৮০% এরও বেশি জাতিগত এস্তোনিয়ান জনসংখ্যা রয়েছে। জাতিগত রাশিয়ান সংখ্যালঘু এস্তোনিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৪%, মূলত সোভিয়েত যুগের অভিবাসনের ফলে, এবং ২০২২ সালে আসা সাম্প্রতিক ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের সাথে বিদ্যমান, যা এখন জাতীয় জনসংখ্যার প্রায় ৬% প্রতিনিধিত্ব করে।
যদিও ঐতিহাসিকভাবে, এস্তোনিয়া এবং লাটভিয়াতেও একটি উল্লেখযোগ্য বাল্টিক জার্মান সম্প্রদায় ছিল বলে জানা যায়। 19 শতকের শেষের দিকে জার যুগের রুশিকরণ নীতি পর্যন্ত এবং কখনও কখনও আরও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জার্মান ভাষা তার শীর্ষস্থান বজায় রেখেছিল। পরবর্তীতে জার্মান-ভাষী জনসংখ্যার বেশিরভাগই 1939 সালে এস্তোনিয়া ছেড়ে চলে যায়।

উত্তর-পশ্চিম উপকূল এবং দ্বীপপুঞ্জের বিশাল অংশে আদিবাসী জাতিগত গোষ্ঠী র‍্যানারুটস্লেসেড (“উপকূলীয় সুইডিশ”) বসবাস করে। ২০০৪ সালে এস্তোনিয়ায় ইঙ্গরিয়ান ফিনিশ সংখ্যালঘুরা একটি সাংস্কৃতিক পরিষদ গঠন করে এবং সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। ২০০৭ সালে এস্তোনিয়ান সুইডিশ সংখ্যালঘুরাও একইভাবে সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। সবচেয়ে ছোট সংখ্যালঘু প্রায় ১,০০০-১,৫০০ জনের একটি রোমা সম্প্রদায়ও রয়েছে। ২০০৮ সালের জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রতিবেদনে এস্তোনিয়ার নাগরিকত্ব নীতির বর্ণনাকে “অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য” বলে অভিহিত করা হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা:

এস্তোনিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা উচ্চমানের এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃত। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রোগ্রাম রয়েছে, যা অভিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয়। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও উন্নত, যা সবার জন্য সহজলভ্য। সার্বিকভাবে, এস্তোনিয়া একটি উদ্ভাবনী ও সমৃদ্ধ দেশ, যা অভিবাসীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ ও সুবিধা প্রদান করে।

অভিবাসীদের জন্য সুবিধা:

এস্তোনিয়া অভিবাসীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করে। উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ, উন্নত জীবনযাত্রার মান, পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ, সন্তানের শিক্ষার জন্য ভালো মানের বিদ্যালয়, সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের সময়, চাকরির সুরক্ষা এবং আইনগত সহায়তা সহজলভ্য। এছাড়াও, একাধিক বছর থাকার পর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায়।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মানবাধিকার:

এস্তোনিয়া একটি সংসদীয় প্রজাতন্ত্র, যেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকার উচ্চমাত্রায় সম্মানিত হয়। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য, যা তার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতিফলন। মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে এস্তোনিয়া সাধারণত উচ্চ রেটিং পেয়ে থাকে।

আবহাওয়া:

এস্তোনিয়ার আবহাওয়া সমুদ্রীয় এবং মহাদেশীয় জলবায়ুর মিশ্রণ। শীতকালে তাপমাত্রা সাধারণত হিমাঙ্কের নিচে থাকে, এবং গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা প্রায় ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়। বছরজুড়ে বৃষ্টিপাত সমানভাবে বিতরণ হয়, তবে শরৎ ও বসন্তে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশ ও এশিয়ার লোকেদের সেটেলমেন্ট:

বাংলাদেশ ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের নাগরিকরা এস্তোনিয়ায় কাজ, শিক্ষা বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে স্থায়ী হতে পারেন। কাজের জন্য সাধারণত ওয়ার্ক পারমিট এবং রেসিডেন্স পারমিট প্রয়োজন হয়। শিক্ষার্থীরা স্টুডেন্ট ভিসার মাধ্যমে এস্তোনিয়ায় আসতে পারেন, যা পরবর্তীতে কাজের সুযোগে রূপান্তরিত হতে পারে। এস্তোনিয়ার সরকার তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ পেশাজীবীদের আকর্ষণ করতে আগ্রহী, যা এশিয়ার পেশাজীবীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে।
এস্তোনিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। তবে, বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তবে এস্তোনিয়ায় বাংলাদেশি কমিউনিটি ছোট হলেও সুসংগঠিত এবং সক্রিয়।

ইউরোপে অবস্থান ও আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য:

এস্তোনিয়া উত্তর ইউরোপে বাল্টিক সাগরের পূর্ব তীরে অবস্থিত। দেশটির জীবনযাত্রার খরচ অন্যান্য পশ্চিম ইউরোপীয় দেশের তুলনায় কম, তবে আয়ও তুলনামূলকভাবে কম। বাসস্থান, খাদ্য ও পরিবহন খরচ যুক্তিসঙ্গত হওয়ায় আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা সাধারণত সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়, যা নাগরিকদের জন্য সুবিধাজনক।

সার্বিকভাবে, এস্তোনিয়া একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ দেশ, যা অভিবাসীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ ও সুবিধা প্রদান করে। বাংলাদেশ ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের নাগরিকরা সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এস্তোনিয়ায় স্থায়ী হতে পারেন এবং উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন।

বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা ও নাগরিকত্ব সুবিধা:

বাংলাদেশি নাগরিকরা এস্তোনিয়ায় কাজের জন্য ডি-টাইপ ভিসা (লং-স্টে ভিসা) বা টেম্পোরারি রেসিডেন্স পারমিটের জন্য আবেদন করতে পারেন। ডি-টাইপ ভিসা ৩৬৫ দিনের জন্য প্রদান করা হয়, যা স্থানীয় অভিবাসন দপ্তর বা এস্তোনিয়ার দূতাবাস থেকে আবেদন করা যায়। টেম্পোরারি রেসিডেন্স পারমিট এক বছরের বেশি কাজের জন্য প্রয়োজন, যা কোটা সিস্টেমের আওতায় বা বিশেষ ক্ষেত্রে প্রদান করা হয়, যেমন: তথ্য ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, স্টার্টআপে কাজ করা, উচ্চ আয়ের চাকরি (মাসিক ২৫২৮ ইউরো বা তার বেশি বেতন)। এছাড়াও, এস্তোনিয়ায় একাধিক বছর থাকার পর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায়。

দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৩ লক্ষ। যা বাংলাদেশের বহু জেলার জনসংখ্যা থেকে কম। এস্তোনিয়ার মোট আয়তন ৪৫,৩৩৯ বর্গকিলোমিটার (১৭,৫০৫ বর্গমাইল)। এটি ইউরোপের একটি ছোট দেশ, যার আয়তন বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম (বাংলাদেশের আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার)। তা সত্বেও এই দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক কম। এখানে প্রতি বর্গকিলোতে ৩০ জন লোক বাস করে। এস্তোনিয়ার অর্থনীতি স্থিতিশীল এবং ক্রমবর্ধমান। তথ্য ও প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্টার্টআপ সেক্টরে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। দক্ষ শ্রমিকদের জন্য উচ্চ চাহিদা রয়েছে, যা অভিবাসীদের জন্য সুবিধাজনক।

ইন্টারনেট অবলম্বনে: জাহাঙ্গীর আলম শোভন, ছবি: Freepik

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply