একটি শান্তির প্রাচীর: ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনে তৃতীয় রাষ্ট্রের প্রস্তাব
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
বিশ্বজুড়ে বহু মানুষের মতো আমিও শৈশব থেকে ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে ব্যথিত। দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরও এই সংকট শত বছর পার করে আজও অমীমাংসিত, এবং তা একাধিকবার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে।
পেশাগত জীবনে আমি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতিগত প্রস্তাবনা জমা দিয়েছি। ভ্রমণের সময় আমি বিভিন্ন সমস্যার বাস্তব চিত্র দেখেছি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছি। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে জটিল সংকট মোকাবেলায় নতুন করে ভাবতে শেখায়।
এই প্রস্তাবটি আদর্শিক কোনো অবস্থান থেকে নয়, বরং মানবিকতা ও বাস্তবতার মিশেলে গঠিত। দুই পক্ষের সংঘাত যখন চরমে পৌঁছে যায়, তখন একটি নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষই প্রায়শই শান্তির পথ দেখাতে পারে। এমন একটি উপলব্ধি আমার মনে আসে কিছু সাধারণ জীবনঘটনা থেকে, যা পরে এই সংকটকে নতুন চোখে দেখতে সাহায্য করেছে।
কেন তৃতীয় রাষ্ট্র দরকার?
১৯৪৭ সালে গৃহীত দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান গত ৭৮ বছরে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিবার ব্যর্থতার পর এসেছে রক্তপাত, উচ্ছেদ ও বিদ্বেষের বিস্তার। যেমন ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের পরে ২৪ বছর পর বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়—একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা অনেক সময় প্রকৃতিই জানান দেয়।
ঠিক তেমনি, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মাঝে একটি নতুন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্র—অস্থায়ীভাবে নামকরণ জেরুজালেম—গঠনের প্রস্তাব করছি। এটি কোনও একপক্ষের অধীনে নয় বরং উভয়ের মাঝখানে অবস্থান করে একটি শান্তিপূর্ণ প্রাচীর হিসেবে কাজ করবে—সীমান্তে নয়, হৃদয়ে বিভাজন কমানোর জন্য।
এই তৃতীয় রাষ্ট্র কেমন হবে?
এই রাষ্ট্রটি আনুমানিক ৬৮০০ বর্গকিলোমিটার হবে, যাতে থাকবে সমুদ্রতীর ও নৌ-প্রবেশাধিকার। জনসংখ্যা হবে মিশ্র—ইসরায়েলি, ফিলিস্তিনি, আরব খ্রিস্টানসহ শান্তিপ্রিয় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী। কোনো গোষ্ঠীই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে না।
রাজধানী হবে জেরুজালেম সিটি। থাকবে নিজস্ব প্রশাসন, পতাকা, পাসপোর্ট ও আইনব্যবস্থা। প্রথমে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, পরবর্তীতে প্রশিক্ষিত স্থানীয় বাহিনী দায়িত্ব নেবে।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের নাগরিকরা চাইলেই স্বেচ্ছায় এই রাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারবেন। দিনে নির্দিষ্ট সংখ্যায় ভিসা-মুক্ত প্রবেশের সুযোগ থাকবে। তবে অস্ত্রধারী বা দলবদ্ধ সেনা সদস্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে।
ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলো—আল-আকসা মসজিদ, চার্চ অব দ্য হোলি সেপুলচর, ওয়েস্টার্ন ওয়াল—একটি আন্তর্জাতিক কাউন্সিলের অধীনে পরিচালিত হবে।
শাসনব্যবস্থা ও ভূমিকমালা
প্রাথমিকভাবে ২৫ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী কাউন্সিল এই রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। এতে থাকবে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, আরব লীগ, খ্রিস্টান প্রতিনিধি ও জাতিসংঘের সদস্যরা। পরবর্তীতে এটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারে রূপ নেবে।
এই রাষ্ট্র একটি সামাজিক ও কূটনৈতিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে—যেখানে সংঘাতের নয়, সহযোগিতার পথ তৈরি হবে।
মানবিক প্রস্তাবনা
সহিংসতার শিকারদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব করছি। এই সংস্থা:
- উভয় পক্ষের নিহতদের পরিবারকে পেনশন দেবে
- আহতদের জন্য বীমা ও চিকিৎসা সেবা দেবে
- উচ্ছেদ বা ক্ষয়ক্ষতির শিকারদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দেবে
এটি শুধু মানবিক নয়, বরং একটি চেতনার প্রতীক, যা জনগণের আস্থার জায়গায় পরিণত হতে পারে।
ত্রিপক্ষীয় ভবিষ্যৎ জোট
ভবিষ্যতে ইসরায়েল, ফিলিস্তিন ও নতুন রাষ্ট্র মিলে একটি ত্রিপাক্ষিক জোট গঠন করতে পারে। এই সংস্থা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু ও অর্থনীতির উন্নয়নে কাজ করবে—যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তি গড়বে।
বাস্তবতা ও সম্ভাবনা
Monaco মাত্র ২ বর্গকিমি, Nauru ২১, আর Maldives ৩০০ বর্গকিমি—তবু এসব রাষ্ট্র কার্যকরভাবে টিকে আছে। আমাদের প্রস্তাবিত রাষ্ট্র ৬৮০০ বর্গকিমি, অর্থাৎ আকারে অনেক বড়—এটি সম্পূর্ণ বাস্তব এবং কার্যকর হতে পারে, যদি এর পেছনে থাকে শান্তির ইচ্ছা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন।
উপসংহার
এই প্রস্তাব চূড়ান্ত নয়। সীমা, জনসংখ্যা ও অন্যান্য বিষয়ের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা আলোচনার মাধ্যমে নেবেন। তবে এটিই একটি সূচনা। যদি আমরা আজ না ভাবি, ভবিষ্যত আমাদের জন্য ভিন্নতর বিকল্প রাখবে না।
- একটি তৃতীয় রাষ্ট্র রক্তপাত বন্ধ করতে পারে;
- এটি নতুন করে ভাবতে, নিরাময়ের সুযোগ দিতে পারে;
- এবং সবচেয়ে বড় কথা, এটি অতীতকে সম্মান জানিয়ে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করতে পারে।
আরও এক শতাব্দী অপেক্ষা না করে—এসো, কল্পনা করি শান্তি আর একসঙ্গে গড়ে তুলি তা।
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ঢাকা, বাংলাদেশ

