ই-কমার্স উদ্যোক্তারা যেভাবে প্রতারিত হচ্ছেন!

ই-কমার্স উদ্যোক্তারা যেভাবে প্রতারিত হচ্ছেন!

উদ্যোক্তাও প্রতারিত হয়ে থাকেন

আমরা সব সময় ক্রেতাদের প্রতারণার গল্প শুনি। কিন্তু একজন বিক্রেতা বা উদ্যোক্তাও যে প্রতারণার শিকার হয়। সেটা আমরা হয়তো সেভাবে মনে যুক্ত করতে পারি না। ক্রেতাকে ইচ্ছেকৃত যারা প্রতারণা করে তারা যেমন প্রকৃত উদ্যোক্তা নয় বরং উদ্যোক্তার ছদ্মবেশে প্রতারক। ঠিক তেমনি বিক্রেতাদের যারা পথে বসায় বা ক্ষতিসাধন করে তারা যদি ক্রেতারুপী হয় তাহলে সে দুষ্কৃতিকারী, তারা যদি কর্মীরুপী হয় তাহলে সে ঠকবাজ অথবা সহযোগী বা সাপ্লায়াররুপী হয় তাহলে তাকেও লোকে বাটপার বলে থাকে।

এটাও সত্য যে, সবাই সবসময় সবাইকে ইচ্ছেকৃত ঠকায় এমন নয়। যদি সেটা কালে ভদ্রে হয় তাহলে আমরা সহজে বুঝতে পারি যে, এটা অনিচ্ছাকৃত। আর যদি মাঝে মধ্যেই এমনটা হয় তাহলে বুঝতে হবে যার দ্বারা এমনটা হচ্ছে তিনি সঠিক চিন্তার লোক নন। তিনি গাফিলতি করছেন অথবা অন্যকোনো কারণে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন অথবা তার মূল্যবোধ, দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্বের সমস্যা রয়েছে। আর যদি কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ঠকানোর জন্য বা জাল জুয়াচুরির উদ্দ্যেশ্যে লেনদেন বা কার্যসম্পাদন করেন তিনি আসলে অপরাধী। তাকে লোকেরা ক্ষুব্দ হয়ে যে নামে ডাকুক। আইনের কাঠামোতে তিনি শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। যদিও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন চুরি করা, লোক ঠকানো, দূর্নূীতি করা একেকটা মানসিক রোগ।

যাই হোক একজন ডিজিটাল উদ্যোক্তা বিশেষ করে ই-কমার্স উদ্যোক্তা কিভাবে প্রতারিত হয়। সেটা এখানে আলোচনা করব। এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে যারা উদ্যোক্তা হবেন তারা যেন সতর্কভাবে পথ চলতে পারেন।

 

শুরুতেই হোঁচট

এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং একজন ডিজিটাল উদ্যোক্তার সমস্ত উদ্যমকে নষ্ট করে দিতে পারে। এটা মূলত কোনো নির্দিষ্ঠ পেশার সমস্যা নয়। এটা আমাদের সামাজিক সমস্যা। না বুঝে কাউকে কোনো কাজের জন্য টাকা দিলেন কিন্তু সে টাকাটা মেরে দিলো। এমনটা সাপ্লায়ার থেকে শুরু করে অফিস ভাড়ার ক্ষেত্রে হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সমস্যাটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ না হলেও একটি ক্ষেত্রে খুব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেটা হচ্ছে কোনো ই-কমার্স উদ্যোক্তা যদি ওয়েবসাইট বানাতে যান। এক্ষেত্রে প্রতারণা কিংবা যন্ত্রণার শিকার শতকরা ৯৮ জন। তবে সবক্ষেত্রে সফ্টওয়ার কোম্পানী বা ওয়েব ডেভলপারের সমস্যা তা নয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা হয় অপেশাদারিত্ব ও ভুল বোঝাবোঝির কারণে। সঠিকভাবে ডিল না করার কারণে দুজনের সাথে দূরত্ব তৈরী হয়। এক পর্যায়ে ডেভলপার উদ্যোক্তাকে আটকে দেন মানে তার সব এক্সেস নিয়ে তাকে কাজটা করে দেন না। অথবা ঝুলিয়ে দেন মানে আজ-কাল করে টাইম পাস করেন। এখানে একজন উদ্যোক্তা পিছিয়ে যান। পেশাদারিত্বের অভাব এবং আমাদের সমাজের লোক ঠকানো মানসিকতাই এর জন্য দায়ী এটা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠির সমস্যা নয়। কারণ যার কাছে টেকনিক্যাল এক্সেস বা ক্ষমতা আছে তিনি মনে করেন তিনি সংক্ষুব্দ হলে তিনি তা অপব্যবহার করতেই পারেন। কিন্তু বস্তুত এটা কোনো পেশাদার আচরণ নয়। বলাবাহুল্য বেশীরভাগ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা অন্যায়ভাবে জিম্মি হয়ে যান।

সাম্প্রতীক সময়ে শুরু হয়েছে নতুন এক ব্যাধি। কিছু কর্মী ও প্রতিষ্ঠান একজনের জন্য তৈরী করা সফ্টওয়ার বা ওয়েবসাইট সোর্সকোডসহ আরেকজনের কাছে বিক্রি করছেন। এমনকি সোর্সকোডসহ হবুহু দিয়ে দিচ্ছেন যা সততার মধ্যে পড়েনা। কেউ আবার কাস্টমার ডাটা চুরি করে বিক্রি করছেন যা রীতিমত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অপরাধ। ডেটা চুরি করে বিক্রি করা একটা চক্র গড়ে উঠেছে রীতিমত। এদের কাছে জিম্মি অনেকে। কোনো কোনো উদ্যোক্তাও আবার তাদের পাল্লায় পড়েন। কারণ তারা যখন এক প্রতিষ্ঠান থেকে ডেটা চুরি করে তাকে দেয়ার প্রস্তাব করেন তখন তারা তা গ্রহণ করেন। পরে তারা নিজেরা একই চক্রে পড়ে যান। মানে তাদের ডেটাও তারা চুরি করে অন্যত্র বিক্রি করে দেয়।

 

বিটুবি সমস্যা

সাপ্লায়ার ও সেবাদাতার কাছ থেকেও মাঝে মধ্যে প্রতারণার শিকার হন উদ্যোক্তারা। ভুল পণ্য দেয়া, টাকা দিয়ে পণ্য না দেয়া এমন হয়ে থাকে। এখানেও আমি একই কথা বলব। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা এমনটা করেন না। কিছু লোক ব্যবসায়ীর বেশ ধরে এসে এ ধরনের বিপদে ফেলে দেন উদ্যোক্তাদের। সাপ্লায়ারের নিন্মমানের পণ্য দেয়া ও সময়মতো পণ্য না দেয়ার জন্য বহু লোকের ব্যবসাই বন্ধ হয়ে গেছে। একটি সমস্যা একসময় খুব প্রকট ছিল। এখনো মাঝে মধ্যে শোনা যায়। সেটা হলো ডেলিভারী কোম্পানী ই-কমার্স উদ্যোক্তার টাকা নিয়ে প্রগার পার। ই-ক্যাবের বিভিন্ন পদক্ষেপ, সরকারী লাইসেন্স চালু এবং বেশকিছু ভাল ভাল লজিস্টিক সেবাদাতা আসার পর এই খাতে সমস্যা অনেকাংশেই কমে গিয়েছে।

 

ভুল তথ্য ও ভুল পরামর্শদ্বারা

অনেক নবীন উদ্যোক্তা অনেক কিছু না জেনে শুরু করেন। তারা যখন কিছু মানুষের কাছে পরামর্শের জন্য যান কেউ না জানার ভান করেন আবার কেউ না জেনেও অনেক বুদ্ধি দেন কেউবা চুপ থাকেন।  এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। সমস্যা হয় কেউ যখন পরামর্শের নামে উদ্যোক্তার আইডিয়াটা শুনে নেন। কেউ আবার ভুল পরামর্শ দেন কিংবা ভুল তথ্য দেন।  যদিও এই সমস্যা খুব কম বলতে গেলে উল্লেখযোগ্য নয়। এই খাতে বেশীরভাগ মানুষ সহযোগী মনোভাবের।

 

অন্যান্য

যাই হোক, বিষয়টা এমন নয় যে, আপনি ব্যবসা করতে গেলে বা ই-কমার্স করতে গেলে এ ধরনের সমস্যা পড়বেন। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে এবং সুযোগবঞ্জিত হওয়ার কারণে কিছু মানুষ বিপথে চলে যায়। আবার কিছু মানুষের নৈতিক ভিত্তিক খুব দূর্বল হয় তখনি সমস্যাগুলো তৈরী হয়। কিন্তু সমস্যা দুটো ক্ষেত্রে খুব প্রকট হয়ে যায় একটা হলো যখন সেটা রিসোর্স এর সাথে সম্পর্কিত হয় যেমন, টাকা, পয়সা, মালামাল ও আইসিটি সেবা। একজনকে ফেসবুক মার্কেটিং করতে দেয়ার পর সে ব্যক্তি কতৃক পেইজ হাইজ্যাক করা, ওয়েব হাইজ্যাক করা এগুলোও ঘটে থাকে।  তবে একজন উদ্যোক্তাকে যেকোনো পরিস্থিতিতে নৈতিক ভীতের উপর অটল থাকতে হয়। তা না হলে বেশীদূর যেতে পারেন না।

 

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply