উত্তর বঙ্গের লোকসাহিত্য 

উত্তর বঙ্গের লোকসাহিত্য 

উত্তর বঙ্গের লোকসাহিত্য

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের লোকসাহিত্য স্বমহিমায় আর্ভিভুত হয়ে আছে। লোক সাহিত্যের প্রায় সবকটি বিভাগেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ধারা পরিলক্ষিত হয়। লোকজ গান, লোককথা, লোকজ খেলাধুলা, লোকজ আচার অনুষ্ঠান এই প্রতিটি বিভাগ প্রতিটি অঞ্চলে বেশ সমৃদ্ধ এবং এলাকা ভিত্তিক বিশাল বিশাল সম্ভার রয়েছে। লোককবিতা লোকজ ছড়াও এর ব্যতিক্রম নয়। লোক নৃত্যের বেলায় একটু ব্যতিক্রম রয়েছে। লোকনৃত্য এলাকাভিত্তিক ভিন্নতা ধারণ না করে তা শ্রেনী পেশা ও সম্প্রদায়ভিত্তিক ভিন্নতা রয়েছে তবে তা স্বত্বেও এর তালও লয় এর প্রতি লক্ষ করলে তা দেখা যাবে কোথায় যেন তা এক সূত্রে গাঁথা রয়েছে। এক্ষেত্রে ভিন্নতার কথাই যদি বলি তাহলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির কথা বলা যায়।
বর্তমানে লোকনৃত্য হিসেবে যা পরিবেশিত হয় তা আমাদের লোক কথা লোক গীতির মতো একবারে পুরনো নৃত্যকে তুলে ধরেনা আবার আধুনিক বাংলা গানের মতো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির নতুনত্বের প্রতিনিধিত্বও করেনা। এটা লোকজ সুর তাল-লয় এর এক গ্রামীণ প্রয়াস বলা যেতে পারে। যাই হোক উত্তরাঞ্চলের লোক সাহিত্যের মূল সূর আবহমান বাংলার লোক জীবনের মূলধারা থেকে অবিচ্ছিন্ন হলেও উত্তরের লোক সাহিত্যে নিজেদের জীবন জীবিকা পেশার আবাহন রয়েছে, রয়েছে ভাব আবেগ ভালোবাসার প্রকাশে নিজস্ব উত্তরীয় ধারা। চাকমা মারমা গারো সাঁওতাল তাদের নৃত্যের সাথে আদিবাসী বাঙালীর প্রচলিত লোকনৃত্যের মিল নেই। তাদের নিজস্বতাই তাদের উপজাতি বা আদিবাসী উপজাতি নৃত্যের শক্তি।

গরুরগাড়ী নির্ভর উত্তরাঞ্চলে গাড়িয়ালকে নিয়ে গান আর গাড়িয়ালের গান দুই ভরন্ত সাহিত্য ও বিনোদন রসের আধার আর সেজন্যই আব্বাস উদ্দিনের কন্ঠ হয়ে ভাওয়াইয়া এসব গান ছড়িয়ে পড়েছে নিখিল বাংলায়। লোকজ খেলাধুলার বেলায় সমষ্টিগত ও একক দুটি ক্ষেত্রেই কিছু নিজস্ব খেলা রয়েছে এ অঞ্চলে।
উত্তরবাংলায় জেলাভিত্তিক কিছু কিছু ভিন্ন ভিন্ন ক্রীড়ানুষ্ঠানের কথা শোনা যায়। আসলে আমাদের মূল বাঙ্গীলী সংস্কৃতির মতোই অফুরন্ত সাহিত্য উপাদান রয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে তার প্রতিটি শাখার আবার উপশাখা আছে আছে অসংখ্য পদ। আরো বেশ কিছু ব্যাপার উত্তরজেলা সংস্কৃতিকভাবে ধনাঢ্য তার মধ্যে রয়েছে গাজীর গান, বারোমাসিগান, গম্ভীরা ইত্যাদি। বারোমাসি গান ও গাজীর গান দেশের অন্যত্র বিদ্যমান থাকলেও। গম্ভীরা উত্তরাঞ্চলের নিজস্ব।
পশ্চিম বঙ্গের মালদহ জেলায় এর জন্ম বলে গবেষকরা অভিমত ব্যক্ত করলেও কুচবিহারেও এর অস্তিত্ব শোনা যায়। তবে নানা নাতির রং ঢংএ পরিবেশিত গম্ভিরার বর্তমান চরিত্র পুরোটার উত্তরবঙ্গীয়। নানা নাতির কথা বলার ঢং ও ভাষা বিষয়বস্তু অঙ্গভঙ্গি হালকা নৃত্য সবই এখানকার মানুষ, তাদের জীবন, তাদের সমস্যা ওসম্ভাবনাকে শৈল্পিক স্বার্থকতায় উপস্থাপন করে। আর ধর্মীয় গান ভজন, মহিমা, জারি সারি, মুশিদী, ভক্তিমূলক কিংবা বিবাহের নানাপর্বের গান অথবা নবান্ন ধানতোলা, ধানলাগানো, ধানভানা এসব জীবনমূখী সংস্কৃতি চর্চা উত্তরের জেলাগুলাতো সমান মাত্রায় বিদ্যমান। এছাড়া লৌকিক নানা সামাজিক পারিবারিক আচার অনুষ্ঠান বিয়ে, জন্মদিন এবং অন্যান্য বিষয়গুলোতো আছেই।

এখানেও আছে কিছু ঐতিহ্যগত বাঙ্গালীয় পর্ব আর আছে উত্তরবঙ্গের নিজস্ব কিছু ব্যাপার। সব মিলিয়ে উত্তরাঞ্চলের রুক্ষ প্রকৃতির মাঝে মানুষের জীবনের সাবলীল প্রয়াসের সে সুর শুনতে পাই তা ভাবুক মনকে রাখালের বাশির দ্যোতনায় নিয়ে য়ায় রংপুর দিনাজপুর রাজশাহীর ধুলা উড়ানো গোধুলীতে গরু মহিষ বিচরিত অবারিত প্রান্তরের দিগন্তে।

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply