ই-কমার্সে আইন ও ভোক্তা অধিকার

ই-কমার্সে আইন ও ভোক্তা অধিকার

ই-কমার্সে আইন ও ভোক্তা অধিকার

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

অন্যান্য পণ্য সেবার মতো ই-কমার্সে ভোক্তার অধিকার রক্ষা ও সে অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা করা ই-কমার্স উদ্যোক্তা ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠানের কিছু নীতি থাকবে। ই-কমার্স কি পণ্য বিক্রি করবেন? কিভাবে করবেন? কাদের নিকট বিক্রি করবেন? কেমন লাভ করবেন? পণ্যটি কিভাবে গুদামজাত করবেন? কিভাবে বা কত সময়ের মধ্যে বিক্রেতার নিকট পৌঁছে দিবেন। এর প্যাকেজিং কি মানের হবে? পন্যে সাথে বিক্রেতা কি কি প্রতিশ্রুতি দিবেন। এবং সেগুলো কিভাবে রক্ষা করবেন এটা নিয়ে নিজস্ব পলিসি থাকবে। তবে সেটা কিন্তা দেশের প্রচলিত আইনের বাইরে যাবে না।
এখানে হচ্ছে তিনি যেকোনো পণ্য অনলাইনে বিক্রি করতে পারবেন না। প্রথমত সেটি বৈধ পণ্য হতে হবে। আবার কিছু বৈধ পণ্য আছে। সেগুলো বৈধ হলেও তার জন্য আলাদা লাইসেন্স দরকার। যেমন ঔষধ একটি বৈধ পণ্য কিন্তু শুধুমাত্র একটি ট্রেড লাইসেন্স বা কোম্পানী লাইসেন্স দিয়ে আপনি ঔষধ বিক্রি করতে পারবেন না। এজন্য আলাদা লাইসেন্স লাগবে। আবার যেমন মাদক আমরা একটি অবৈধ পণ্য বলি। কিন্তু এটিও লাইসেন্স নিয়ে ক্রয় বিক্রয় করা যায়। ধুমপান এবং আগ্নেয়াস্ত্র এগুলোর ক্ষেত্রেও তাই।
বলে রাখা ভাল যে, মাদক, ধুমপান ও আগ্নেয়াস্ত্র আপনার লাইসেন্স থাকলেও অনলাইনে বিক্রি করতে পারবেন না। কারণ আপনাকে যে এলাকায় যতুটুকু বিক্রি করতে যে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে আপনি শুধু ততটুকুই পারবেন। আবার ঔষধের তাই। তবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অনলাইন ফার্মেসির জন্য আলাদা লাইসেন্স দিয়ে থাকে।
বাংলাদেশের ই-কমার্স সরাসরি কয়েখটি আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এগুলো হলো
ক) ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯
খ) কোম্পানী আইন ১৯৯৪
গ) প্রতিযোগিতা আইন ২০১২
গ) নিরাপদ খাদ্য আইন ইত্যাদি।
ঘ) ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১
ঙ) ডিজিটিাল বিজনেস অন্ত’ভ’ক্তিকরণ (ডিবিআইডি) নির্দেশিকা ২০২২

এছাড়া আরো ডজনখানেক আইন রয়েছে যেগুলো প্রত্যক্ষভাবে আংশিক ই-কমার্সের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে শুরু করে কপিরাইট নীতিমালাসহ আরো অনেক কিছু। আমরা আজ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ নিয়ে আলোচনা করব। এছাড়া ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ নিয়ে দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
একজন বিক্রেতাকে যেহেতু ভোক্তা অধিকার আইন সম্পর্কে জানতে ও মানতে হয়। তাই আমরা এখানে এর কিছু নির্বাচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ আলোচনা করব। যা না জানলেই নয়। এছাড়া আরো বেশী জানতে হলে ভোক্তা অধিকার আইন দেখে নিতে পারেন।

ধারা ২০ এ “ভোক্তা-অধিকার বিরোধী কার্য” বলতে বলা হয়েছে-
(ক) কোন আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোন পণ্য, ঔষধ বা সেবা বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা;
(খ) জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা;
(গ) মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকারক কোন দ্রব্য, কোন খাদ্যপণ্যের সহিত যাহার মিশ্রণ কোন আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হইয়াছে, উক্তরূপ দ্রব্য মিশ্রিত কোন পণ্য বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা;
(ঘ) কোন পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা;
(ঙ) প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করা;
(চ) কোন পণ্য সরবরাহ বা বিক্রয়ের সময়ে ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনের পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা;
(ছ) কোন পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ওজন পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত বাটখারা বা ওজন পরিমাপক যন্ত্র প্রকৃত ওজন অপেক্ষা অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শনকারী হওয়া;
(জ) কোন পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত পরিমাপ অপেক্ষা কম পরিমাপের পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা;
(ঝ) কোন পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দৈর্ঘ্য পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছু প্রকৃত দৈর্ঘ্য অপেক্ষা অধিক দৈর্ঘ্য প্রদর্শনকারী হওয়া;
(ঞ) কোন নকল পণ্য বা ঔষধ প্রস্তুত বা উৎপাদন করা;
(ট) মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা; বা
(ঠ) সেবা গ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হইতে পারে এমন কোন কার্য করা, যাহা কোন আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হইয়াছে;

এই আইনের চতুর্থ অধ্যায়ে: অপরাধ, দন্ড, ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন ধরনের পণ্য সেবার বিবরণ থাকলেও আমরা ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশটি তুলে ধরছি।

পণ্যের মোড়ক, ইত্যাদি ব্যবহার না করিবার দন্ড
ধারা: ৩৭৷ কোন ব্যক্তি কোন আইন বা বিধি দ্বারা কোন পণ্য মোড়কাবদ্ধভাবে বিক্রয় করিবার এবং মোড়কের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, ব্যবহার-বিধি, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেটজাতকরণের তারিখ এবং মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করিবার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করিয়া থাকিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

মূল্যের তালিকা প্রদর্শন না করিবার দন্ড
ধারা: ৩৮৷ কোন ব্যক্তি কোন আইন বা বিধি দ্বারা আরোপিত বাধ্যবাধকতা অমান্য করিয়া তাহার দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোন স্থানে পণ্যের মূল্যের তালিকা লটকাইয়া প্রদর্শন না করিয়া থাকিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

সেবার মূল্যের তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করিবার দন্ড
ধারা: ৩৯৷ কোন ব্যক্তি আইন বা বিধি দ্বারা আরোপিত বাধ্যবাধকতা অমান্য করিয়া তাহার দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সেবার মূল্যের তালিকা সংরক্ষণ না করিলে এবং সংশ্লিষ্ট স্থানে বা সহজে দৃশ্যমান কোন স্থানে উক্ত তালিকা লটকাইয়া প্রদর্শন না করিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

ধার্য্যকৃত মূল্যের অধিক মূল্যে পণ্য, ঔষধ বা সেবা বিক্রয় করিবার দন্ড
ধারা: ৪০৷ কোন ব্যক্তি কোন আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোন পণ্য, ঔষধ বা সেবা বিক্রয় বা বিক্রয়ের প্রস্তাব করিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

ভেজাল পণ্য বা ঔষধ বিক্রয়ের দন্ড
ধারা: ৪১৷ কোন ব্যক্তি জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করিলে বা করিতে প্রস্তাব করিলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।
মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করিবার দন্ড
ধারা: ৷৪৪৷ কোন ব্যক্তি কোন পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করিবার দন্ড
ধারা: ৪৫৷ কোন ব্যক্তি প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

ওজনে কারচুপির দন্ড
ধারা: ৪৬৷ কোন ব্যক্তি কোন পণ্য সরবরাহ বা বিক্রয়ের সময় ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনে উক্ত পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।
অপরাধ, দন্ড, ইত্যাদি

মেয়াদ উত্তীর্ণ কোন পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করিবার দন্ড
আরা ৫১৷ কোন ব্যক্তি মেয়াদ উত্তীর্ণ কোন পণ্য বা ঔষধ বিক্রয় করিলে বা করিতে প্রস্তাব করিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।
অপরাধ, দন্ড, ইত্যাদি

অবহেলা, ইত্যাদি দ্বারা সেবা গ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য, জীবনহানি, ইত্যাদি ঘটাইবার দন্ড
আরা ৫৩৷ কোন সেবা প্রদানকারী অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতা দ্বারা সেবা গ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানী ঘটাইলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।
অপরাধ, দন্ড, ইত্যাদি

অপরাধ পুনঃ সংঘটনের দন্ড

ধারারা: ৫৫৷ এই আইনে উল্লিখিত কোন অপরাধের জন্য দন্ডিত ব্যক্তি যদি পুনরায় একই অপরাধ করেন তবে তিনি উক্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যে দন্ড রহিয়াছে উহার দ্বিগুন দন্ডে দন্ডিত হইবেন৷
এখানে মূলত আইনটির অংশবিশেষ আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে যে অংশটি ই-কমার্সের সাথে সম্পৃক্ত। এছাড়া প্রস্তাবিত সংশোধনীতে যা রয়েছে।

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply