ই-কমার্সে অস্থিরতা, সমাধান কি বহুদূর?
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
এক মোজা বিক্রেতাকে হটানোর জন্য প্রথমে কমদামে মোজা বিক্রি কিংবা পণ্যের দাম বাড়িয়ে সেখানে বড় ধরনের ছাড় দেয়ার কৌশল পুরনো হয়ে গেছে। যখন ফ্রিজ, বাইক আর অটোমোবাইল পণ্যে তিনভাগের এক ভাগই ছাড় দিয়ে বিজ্ঞাপন ছাড়ে। তখন যার কাছে যে বার্তাই যাক না। কিছু সাধারণ মানুষ এটাকে সুযোগ হিসেবেই দেখে। কিছু বোদ্ধা মানুষ মানে যারা ব্যবসা বাণিজ্য ঘাটায় তারা একটা অন্য ব্যাখ্যা দিল। কেউ বলল, আহারে বাইক ব্যবসায় যে এত গুমোর সেটাতো অনলাইন অফার না দেখলে জানতামইনা। কেউ আবার আরেক ধাপ বাড়িয়ে বলল, এটাতো বিজনেস পলিসি। অফার দিয়ে এককোটি গ্রাহক বানাবে দৈনিক ৫০ হাজার পণ্য বিক্রি হবে মোটের উপর ১০ হাজার টাকা লেনদেন হবে। তখন ওই কোম্পানী বিনিয়োগ বাজারে (শেয়ার বাজার নয়) হাজার কোটি টাকার কোম্পানী হিসেবে মোটা বিনিয়োগ পাবে।
সন্দেহবাদীরা হাসল, আশাবাদীরা অপেক্ষা করল আর যারা সুযোগ মনে করল তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল। এই বুদ্ধিদীপ্ত তামাশার শেষ দৃশ্য হলো লক্ষ লক্ষ ক্রেতার মাথায় হাত আরো লাখো ক্রেতা কমদামে পণ্য পেয়ে চুপচাপ। না সবাই পণ্য পায়নি কেউ কেউ টাকাও পেয়েছে। সবাই মূল্য ফেরত পায়নি কেউ লাভও করেছে। কারণ পণ্য দিতে পারেনি বলে অনলাইন প্রতিষ্ঠানটি ঘোষিত ফেরত দিয়েছে বিক্রয়মূল্য নয়। মানে সের এর উপর সোয়াসের দিয়েছে। এক পর্যায়ে এই কেনাকাটার নাম হয়েছে বিনিয়োগ। কেউ বলবেন, আরে না শেষ দৃশ্য আসেনি। পিকচার আভি বাকী হ্যায় মেরে দোস্ত!
খুব বোকা চোখে কিন্তু গভীরভাবে দেখলে একথা বলতে পারি যদি এমন সুযোগ থাকে। ৩০/৪০ দিনে পণ্য সরবরাহ করার নাম করে ৩/৪ মাস ঘুরিয়ে রাখা যায় এভাবে বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা তোলা যায়। তাহলে কেউ কেউ এই সুযোগ নিবে সেটা অনলাইন হোক কিংবা অন্যলাইন হোক। সত্যি বলছি এখনো ফ্লাট, প্লট বিক্রয়ের প্রতারণা বন্ধ হয়নি। এত এত ঘটনার পর জিনের বাদশার ব্যবসা যেখানে এখনো জমজমাট সেখানে বাইক বাদশা’র হালে পানিতো না মধু উঠার কথা। হয়েছেও তাই।
কেমন করে এমন হলো, দেশের যোগাযোগ, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, স্মার্টফোন, সোস্যাল মিডিয়া, বিকাশ ও অনলাইন পেমেন্ট এই ৭ নিয়ামক অনলাইন কেনাকাটায় গতি এতে দিল। আর করোনা এনে দিল অগ্রগতি। কেউ একজন শুরু হলো সাহসী অফারসমূহ। কেউ ভাবে, কেউ কিনে, কেউ দেখে এভাবে চলছিল। পণ্য পাওয়ার বেলায় কেউ পায়, পায় পায়না। ঘটনা কি? বলা হলো, আরো বাংলাদেশের ই-কমার্সে এখনো লজিস্টিক ভালো না, করোনার কারণে চালান আসেনি। তাই ২/৪টা অর্ডার সমস্যা হচ্ছে। আমরা দ্রুত সমাধান করে দিচ্ছি। এর আগে যখন বলা হলো এভাবে অফার কিভাবে সম্ভব? আরে বুঝলেন না, আমরাতো বিগ ভলিউম কিনি, ফ্যাক্টরীর সাথে সরাসরি চুক্তি, আমরা বড়ো অংকের কমিশন পাচ্ছি।
এখন দেখা গেল সেই কথা সঠিক ছিল না। আমি আশাবাদী মানুষদের কথা বলছি। তারা এটা বলবেন যে এসব তথাকথিত ব্যবসায়ীরা সৃজনশীল আইডিয়ার নামে ধোকা দিয়েছে। সাবধানীরা বলবে, হে আমরাতো আগে থেকে জানতাম এমনটা হবে। গত বছর ২৭ আগষ্ট থেকে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসেব বন্ধ করে দিয়ে ১ মাস পর চালু করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু কোনো শর্ত না থাকায় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের ব্যবসা করতে প্রলুব্দ হয়।
প্রায় ১০টির মতো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অফার দিয়ে বাজার থেকে টাকা তুলে নিয়েছে। এখন তারা গ্রাহকের টাকা বা পণ্য কোনোটাই দিতে পারছেনা। গত ৪ জুলাই বাংলাদেশ ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা-২০২১ ঘোষনার ফলে সমস্যা মোটা দাগে সামনে চলে আসে। কারণ পেমেন্ট প্রসেসর প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য ডেলিভারীর নিশ্চয়তা না পেলে অর্থ ছাড় দিচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাদের এটাই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সোজা কথা বাংলাদেশ তাৎক্ষনিক এই ঝুঁকিপূর্ণ লেনদে ন বন্ধ করার জন্য এটা একটা উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে। যদিও যারা ক্রেতাদের ঠকায়নি তারাও এখন ব্যবসা চালাতে হিমসিম খাচ্ছে।
পেছন ফিরে দেখা যাক।
আগেই কি ঠেকানো যেত এই জোয়ার। কিছুটা যেত বটে। কিভাবে? প্রতিটি কোম্পানীর পেইডআপ ক্যাটেল এর উপর ভিত্তি করে তাদের বার্ষিক, মাসিক, দৈনিক লেনদেন এর মাপকাঠি ঠিক করে দিলে হয়তো চাপটা এতবড় হতো না। এটা হয়তো নীতিগতভাবে ঠিক করা আছে কিন্তু কারিগরি ভাবে করা যেত। যেমন ই-অরেঞ্জ নামীয় কোম্পানীটি ৪ হাজার টাকার একটা ট্রেড লাইসেন্স মাত্র। এই প্রতিষ্ঠানের ১১শ কোটি টাকা লেনদেন এর যে তথ্য মিডিয়াতে এসেছে তা যদি সত্যি হয়। বিষয়টি রীতিমত শংকার। একটা ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কি যা খুশি তাই করা যাবে? এ প্রশ্নটা কানের কাছে হাওয়া দিচ্ছে বার বার।
এখন কি করা যায়? এখানে তিনটে বিষয় রয়েছে, প্রথমত এ ধরনের কাজ করার রাস্তা বন্ধ করা, দ্বিতীয়ত যারা করেছে তাদেরকে জবাবদিহিতা কিংবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিচারের মুখোমুখী করা। তৃতীয়ত: যেসব ক্রেতা ভোক্তা প্রতারিত হয়েছে তাদের ক্ষতিমুক্ত করা।
আসা যাক প্রথম কথায়। বন্ধ করার কি কি উপায় হতে পারে। এক. যে এসক্রো ব্যবস্থা বর্তমানে ফোনের মাধ্যমে চলছে তাকে স্বয়ংক্রিয় করা। এখানে ই-কমার্স প্লাটফর্ম, ডেলিভারী সিস্টেম এবং এসক্রো তিনটাকে যুক্ত করলে ডেলিভারী নিশ্চিতকরণ বার্তা পাওয়ার পর টাকা বিক্রেতার হিসেবে চলে যাবে। এই যুক্ত থাকবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযোগ পোর্টাল, ক্রেতা অসন্তুষ্ঠ বাটন ছাপার সাথে স্বয়ংক্রিয় অভিযোগ চলে যাবে অধিদপ্তরের কাছে। এই অভিযোগের ড্যাশবোর্ড প্রতিটি কোম্পানীরও থাকবে। যাতে তারা নিজেরা ক্রেতা সন্তুষ্ঠির মাধ্যমে ৭২ ঘন্টার মধ্যে এটি সমাধান করতে পারে। তাহলে গ্রাহকের ঝুঁকি কমবে। দুই. অনলাইন ডেলিভারী ভিত্তিক ই-কমার্সের জন্য আলাদা অনুমতি থাকবে যাদের তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকবে এবং তারা সংশ্লিষ্ঠ ট্রেড এসোসিয়েশন এর সদস্যপদ নিতে বাধ্য থাকবে। ব্যাংক নজরদারী করবে। অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে কিনা। যারা লম্বা সময় নিয়ে পণ্য দিতে চায় তাদের জামানত নেয়ার বিধানও থাকতে পারে। কিংবা সবসময় মোট ছাড়যোগ্য অর্থের ১০% পেমেন্ট প্রসেসর জমা রেখে দিতে পারে।
এবার দ্বিতীয় কথা, যারা খেলাটা খেলেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে কিনা? সুযোগ কয়েকখান আছে বৈকি? যেমন প্রতিযোগিতা কমিশন বাজার বিশ্লেষন করে যদি দেখে কেউ ব্যবসা মনোপলি করেছে তাহলে প্রতিযোগিতা আইন অনুসারে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী লেনদেন সীমা অতিক্রম করার শাস্তি আসতে পারে। যেসব ভোক্তারা ক্ষতির মুখে তাদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী জেল জরিমানা হতে পারে। আপাত দৃষ্টিতে এটা ভাল ব্যাপার যে, এই অপরাধ আটকানোর ম্যাকানিজম না থাকলেও ঘটনা ঘটার পর প্রচলিত আইনেই শাস্তি দেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা একটু অন্যরকম।
জেলখানা কতৃপক্ষ কোনো দুষ্ঠু আসামির উপর রাগ করে তাকে জেল থেকে বের দেয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত বেশী যে, কাউকে জেলে নিলে এটা তার জন্য একটা আর্শিবাদ হয়ে যাবে। সে সকল দায় থেকে বাহ্যিকভাবে দূরে সরে যাবে। কারণ শাস্তি দিলেতো তার সাজা হবে কিন্তু ক্রেতার সমস্যার সমাধান কোথায়।
হয়তো আছে। আমরা যদি এভাবে চিন্তা করি। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ মূলত ৩ ধরনের। এক. যারা বাজারে থাকতে চায় এবং থাকতে পারবে যাদের আর্থিক, কৌশলগত, কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা সামর্থ রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের হিসেব বিশ্লেষন করে প্রশাসক নিয়োগ করা, সমস্যা সমাধানে সময় বেঁধে দেয়া এবং নীতিমালা মানছে কিনা পর্যবেক্ষন করা, পাসপোর্ট জমা নেয়া, ব্যাংক হিসেব নজরদারি করা। দুই: যেসব মালিকের খারাপ উদ্দেশ্য রয়েছে, টাকা পাচারের লক্ষণ বা সুযোগ রয়েছে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্রেতার অর্থ পরিশোধ করা, অথবা সম্পদ জমা রেখে তাকে ঋনের ব্যবস্থা করে দেয়া। তিন, যাদের দায় সীমিত তাদেরকে একইভাবে নজরদারিতে সময়সীমা বেঁধে দেয়া।
জুয়াটা বন্ধ করা এবং সাজা দেয়ার বিষয় বলা হলো। এবার আসি ক্রেতার সমস্যার সমাধানে। যদি ধরে নিই সবগুলো প্রতিষ্ঠান দুই হাজার কোটি টাকা দেনা। তাহলে যেহেতু এরা ৩০% এর বেশী ছাড় দিয়ে পণ্য বিক্রি করেছে। যদি আমরা শুধু গ্রাহকের মূল টাকা ফেরত দেয়ার কথা ভাবি তাহলে এই দায় ২৫% কমে যাবে। এবার যদি এভাবে চিন্তা করা যেসব ক্রেতা আগে কিছু পণ্য ক্রয় করেছে তাতে তারা বাজার দরের উপর বেশকিছু লাভ করেছে। তাদেরকে চিহ্নিত করা খুব সহজ। তাদের সুযোগ বা অপশন দেয়া হয়। তারা আগে যে পরিশান ক্রয়-লাভ করেছে। তার একটা অংশ তারা তাদের আটকে থাকা অর্ডার থেকে ছাড় দিয়ে চাইলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ উত্তোলন করতে পারবে। তাহলে হয়তো আরো ১০% দায় কমে যাবে। এবার যারা একটা মাত্র পণ্য অর্যডার করেছে তাদেরকে প্রকৃত ক্রেতা হিসেব করে তাদের টাকা আগে প্রদানের ব্যবস্থা করলে এ ধরনের ক্রেতার সংখ্যা হয়তো ২০%। এছাড়া যারা একই পণ্য একাধিক অর্ডার করেছে তাদের আংশিক দেনা শোধ করে বাকী দেনার জন্য তাদেরকে লম্বা একটা সময় দেয়া যায় সেইসব প্রতিষ্ঠান যারা সঠিক ব্যবসায় ফিরে আসতে চায়। সবার জন্য এই সুবিধা থাকা ঠিক নয়। এছাড়া সেই সব লোভী ক্রেতাদের সাজা হওয়া উচিৎ যারা একজন ২২টা বাইক অর্যডার করেছে। কোনো ক্রেতা বা বিক্রেতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশী পণ্য ক্রয় করে বাজারে অস্থিরতা বা ক্রাইসিস সৃষ্টি করলে সেটাও এক ধরনের অপরাধ। অন্তত দেরীতে টাকা পাওয়ার শাস্তিটা আংশিকভাবে তারা পেতে পারে।
আমি বলছিনা যে, এটা খুব ভাল বুদ্ধি বা ভাল সমাধান। এটা অবশ্যই একটা ভাল সমাধান নয়। কিন্তু যদি মালিকদের জেলে পুরে দিয়ে ২০ বছরের জন্য মামলা আদালতে গড়াতে থাকে। অথবা তারা বিদেশে পালিয়ে সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে না দেয়। তারচেয়ে এই সমাধান কিছুটা ভাল।
এই লেখার সাথে সম্পর্কিত অনেক তথ্যই বলা হয়নি। যেমন- লোকজন যতটা ফেসবুকে পোস্ট দেয়, ততটা ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ করে না। যতটা ট্রেড এসোসিয়েশনকে দোষারোপ করে, ততটা উদ্বেগ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কিংবা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিতভাবে জানায়না। ক্রেতা সাবধানতা এখানে বকের বচন। যেন আমি কেন মদ খাইলাম সেটা বোতলের দোষ। কারণ বোতলই মদটাকে ছিপি মাইরা রাখছিল।
(এই লেখায় বিশ্লেষণ ও মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সাথে কোনো সংস্থা, ব্যক্তি, সম্প্রদায়ের কোনো যোগ নেই।
