ইন্টারনেট বন্ধ: ই-কমার্সে ১৩ দিনে ক্ষতি ১৭শ কোটি টাকা

ইন্টারনেট বন্ধ: ই-কমার্সে ১৩ দিনে ক্ষতি ১৭শ কোটি টাকা

ইন্টারনেট বন্ধ: ই-কমার্সে ১৩ দিনে ক্ষতি ১৭শ কোটি টাকা

বর্তমানে বাংলাদেশে ৫ লক্ষাধিক ফেসবুক উদ্যোক্তা। কয়েকলক্ষ ই-কমার্স কর্মী মিলে সরবরাহকারী ও সহযোগী ব্যবসাসহ এ্ খাতের উপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা অন্তত ২০ লাখ। সারাদেশে আমাদের প্রায় ৫০ হাজার ডেলিভারী সেবাকর্মীরা প্রতিদিন ৮ লাখের বেশী পরিবারকে সেবা দিচ্ছে। এই সেবা প্রতিবছর ২৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ই-কমার্সখাত এখনো শিশু হলেও এর সম্ভাবনা অপার। সারাবিশ্বে যেমন এর পরিসর বেড়েছে বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম হবেনা।

ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে অনলাইন ব্যবসা সম্পূর্ণরুপে বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিদিন প্রায় ১২০ কোটি টাকার যে ই-কমার্স লেনদেন ছিল তা বন্ধ হয়ে যায়। যারা মুদি, খাদ্যপণ্য ও পচনশীল দ্রব্য তথা মাছ মাংস অনলাইনে বিক্রি করতেন। তারা অর্ডার এবং স্টক নিয়ে বিপাকে পড়ে যান এবং বড়ো ধরনের ক্ষতির সম্মুখিন হোন। এছাড়া যারা ফেসবুকে এড রান করে পরে বন্ধ করতে পারেনি। তারাও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর মোট ই-কমার্সের ৫% এর মতো চালু হয়েছে কিন্তু ৯৫% শতাংশই বন্ধ রয়েছে। কারণ ফেসবুক এখনো চালু হয়নি।

ফেসবুক বন্ধ জনিত কারণে ক্ষুদ্র ও ফেসবুক উদ্যোক্তারা চরম বিপদে রয়েছে।  এদের বেশীরভাগই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যারা অল্প বিনিয়োগের মাধ্যমে ছোট ছোট করে ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যান। তাদের কোথাও হোচট খেলে আর উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে না ।

প্রতিদিনের ক্রয় বিক্রয় না হওয়ার কারণে প্রতিদিন ১২০ কোটি টাকার বেশী। প্রথম ১০ দিনে ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ১৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে একটা বড়ো অংশ রয়েছে এফ কমার্স উদ্যোক্তাদের, যার পরিমাণ নূন্যতম ৬০০ কোটি টাকা, ই-কমার্স লজিস্টিকসে এর পরিমাণ হতে পারে অন্তত ১গগ কোটি টাকা, ই-ট্যুরিজমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। তাছাড়া অনলাইন শপ, মার্কেটপ্লেস, সার্ভিস প্রোর্টাল, ই-লার্নিং ও ডিজিটাল প্রোডাক্টস রয়েছে। বিগত ১৩ দিনে মোট ক্ষতি সাড়ে ১৭শ কোটি টাকার অধিক। যদি ব্যাংক লোন কিস্তি ও অন্যান্য ঋণের দায় বা ঋণ পরিশোধ করতে না পারার ক্ষতি, মাসের শেষে ভাড়া, বিল ও বেতন সংক্রান্ত ব্যয়ের চাপ, ফেসবুকে এড রান করা সংক্রান্ত ব্যয় হিসেব করা হয় এই ক্ষতি আরো অনেক বেশী হবে।

এধরনের অবস্থা যদি বার বার হয় তাহলে ছোট উদ্যোক্তা যারা ছোট ছোট চালানের মাধ্যমে ব্যবসা চালু রাখে তাদের একটি অংশের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে,  যারা বেতনভূক্ত নয়, স্বাধীন কর্মী বা ফ্রি ল্যান্সার, তাদের আয় শুন্যের কোঠায় নেমে এসেছে,  প্রতিষ্ঠানের লোকসান হওয়া ও আয় কমে যাওয়ার কারণে অনেকের চাকরী যাবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে আরো রক্ষণশীল হয়ে যাবে, স্থানীয় বিনিয়োগকারীগণের ই-কমার্সে বিনিয়োগের গতি কমে যাবে। এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা তৈরী হতে পারে এই আশংকায় বিদেশী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্থ হবে।

চলমান সংকটে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকা ও অন্যান্য কারণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ ই-কমার্স খাতের ক্ষয়ক্ষতি ও বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে তা থেকে উত্তরণে নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টানেটের খাতের উদ্যোক্তারা। গত ৩১ জুলাই ২০২৪ ই-কমার্স অ্যাসোসিশেন অব বাংলাদেশ বনানীস্থ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ এবং সংকট উত্তরণে কয়েকটি দাবী ও পরামর্শ তুলে ধরা হয়।

গত ১৩ দিনে এই খাতে প্রায় ১৭শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে প্রতিদিন তার পরিমাণ বেড়ে চলেছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে এই ব্যবসা পুরো বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ইন্টারনেট চালু থাকলেও গতি কম থাকায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বন্ধ থাকার কারণে এখনো সংকট কাটিয়ে উঠেনি। এছাড়া কারফিউ ও নিরাপত্তাঝুকি সহ বিভিন্ন কারণে ই-কমার্স খাতের ৯৫% শতাংশ লেনদেন এখনো বন্ধ রয়েছে  বলে দাবী করা হয়।

যেসব উদ্যোক্তার ব্যাংক ঋণ রয়েছে তা পরিশোধের সময়সীমা ০৬ বৃদ্ধি করা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা, লজিস্টিকস ও ডিজিটাল মার্কেটিং এর সাময়িকভাবে ভ্যাট মওকুপ করা, ট্রেড লাইসেন্স এর বিলম্ব ফি মওকুপ ও মেয়াদ বৃদ্ধি করার দাবী জানান। এছাড়া ফেসবুকে সচল থাকা বিজ্ঞাপনের মূল্য ফেরত বা পূণবিজ্ঞাপনের জন্য ফেসবুকের সাথে যোগাযোগ করার জন্য সরকারের নিকট দাবী জানানো হয়।

 এই ক্ষতি পোষানোর জন্য যা করা যেতে পারে-

১। যেসব উদ্যোক্তার ব্যাংকঋণ রয়েছে সেসব ঋণের টাকা ও কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা অন্তত ০৬ মাস বর্ধিত করা বা কমপক্ষে ০৬ মাসের গ্রেসিং প্রিয়ড নিশ্চিত করা।

২। ইন্টারনেট যোগাযোগ ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী যে বার্তা যাবে তাতে দেশীয় স্টার্টআপে বিদেশী বিনিয়োগ বাঁধাগ্রস্থ হবে। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি দেশের ইতিবাচক বিষয়গুলো তুলে ধরে আন্তজাতিকভাবে ইতিবাচক ব্রান্ডিং করা

৩। যেহেতু ফেসবুকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যবসা করে তাদের ব্যবসা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য তাদেরকে একটি ন্যূনতম পরিমাণ পর্যন্ত বিনা জামানতে ও সর্বনিন্ম মুনাফায় ঋণ দেয়া এবং সাথে ১ বছরের গ্রেসিং প্রিয়ড রাখা।

৪। অনেকের ফেসবুক বন্ধ হওয়ার আগে বিজ্ঞাপন সচল থাকায় অনেক উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাই প্রথমত ফেসবুক বা মেটাকে এসোসিয়েশন এবং সরকারের পক্ষ থেকে এড ফান্ড রিসিডিউল করার সুযোগ দেয়ার জন্য অনুরোধ করা এক্ষেত্রে প্রয়োজনে আমরাও যোগাযোগ অব্যাহত রাখবো। দ্বিতীয়ত, আগামী ১ বছর ফেসবুক এড উপর ১৫% ভ্যাট প্রত্যাহার করা।

৫। ইন্টারনেট বন্ধের কারণে সকল ই-কমার্স উদ্যোক্তা যেহেতু ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাই এই খাতের ভ্যাট এবং লজিস্টিকস এর উপর ১৫% ভ্যাট কিছু সময়ের জন্য জন্য রহিত করা।

৬। বর্তমানে যেহেতু অর্থবছর শেষ হয়েছে এবং নতুন অর্থবছর শুরু হয়েছে তাই সকলের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। তাই সকল উদ্যোক্তাদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স এর বিলম্বজনিত জরিমানা প্রত্যাহার করা এবং বর্তমান ট্রেড লাইসেন্স এর মেয়াদ ৬ মাস বৃদ্ধি করা।

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply