Siple Home UP

ইউনিয়ন পরিষদের কর তথ্য

ইউনিয়ন-পরিষদ-(ট্যাক্স-সূচি)-২০১২-বিধি

বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থার সর্বনিন্ম বা তৃণমূল স্তর হলো ইউনিয়ন পরিষদ। যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন বলা হতো কয়েকটি দেশ নিয়ে গঠিত হওয়ার কারণে আর এখানে ইউনিয়ন পরিষদ বলা হয় কয়েকগ্রাম নিয়ে গঠিত হওয়ার কারণে। তবে মনে এর নাম ‘‘গ্রামসংঘ’’ হলে ভাল হতো বা গ্রামপুঞ্জ।

নিচে এই স্থানীয় সরকারের কর ব্যবস্থা তুলে ধরা হলো-

কার্যকর প্রশাসন ও শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থাপনা একে অপরের পরিপূরক। স্থানীয় সরকারের ইতিহাসে দেখা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলতে ১৮৭০ সালে গ্রাম চৌকিদারি আইন প্রণয়ন করা হয়, যার মাধ্যমে চৌকিদারি কর আদায় করে গ্রাম পাহারাদারদের বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এটিই মূলত পল্লী অঞ্চলে আইনগতভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সূচনা ঘটায়।

পরবর্তীতে, ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন আইন সংশোধন ও পরিবর্তনের ধারা পেরিয়ে ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২২ এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ নামকরণ করা হয়। এরপর ১৯৮৩ সালে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) অধ্যাদেশ কার্যকর হলে ইউনিয়ন পরিষদের কাঠামো ও নিজস্ব আয়ের উৎসে পরিবর্তন আসে।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী (ধারা ৪৩), প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদের জন্য একটি ‘ইউনিয়ন তহবিল’ গঠন করা বাধ্যতামূলক হয়। এই তহবিলে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান, স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কর-ফি, এবং অন্যান্য বৈধ উৎস থেকে আসা অর্থ জমা করা হয়।

ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব আহরণের প্রধান তিনটি উৎস হলো—
১) স্থানীয়ভাবে আদায়কৃত রাজস্ব,
২) সরকারি অনুদান,
৩) অন্যান্য উৎস।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) অধ্যাদেশ, ১৯৮৩, পরবর্তী সংশোধনী আইন (১৯৯৩) এবং সরকারের নির্বাহী নির্দেশনার মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদকে ছয়টি বিষয়ে কর ও ফি আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—

  • হোল্ডিং ট্যাক্স: বসতবাড়ির বার্ষিক মূল্যের ওপর কর, যা ইউনিয়ন পরিষদের সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎস।

  • পেশা ও ব্যবসায়িক কর: স্থানীয় ব্যবসা, পেশা ও বৃত্তির ওপর কর।

  • প্রমোদ কর: সিনেমা, নাটক, যাত্রা বা অন্যান্য বিনোদনমূলক কার্যক্রম থেকে আদায়।

  • লাইসেন্স ও পারমিট ফি: পরিষদের অনুমোদিত কার্যক্রমের জন্য নেওয়া ফি।

  • হাট-বাজার ও ফেরিঘাট ফি: ইউনিয়ন এলাকার হাট-বাজার বা ফেরিঘাট লিজ থেকে প্রাপ্ত আয়।

ইউনিয়ন পরিষদে কর আদায় প্রক্রিয়া

ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় পর্যায়ে কর, রেট, ফি ইত্যাদি আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এ প্রক্রিয়াটি সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়—

১. ঘোষণা ও অবহিতকরণ
কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে কীভাবে কর, রেট, বা ফি আদায় করা হবে, তার সময়, স্থান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম ইউনিয়ন পরিষদ নোটিশের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়। এই নোটিশ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের বোর্ডে অথবা ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানানো হয়।

২. কর প্রদানের স্থান ও পদ্ধতি
করদাতা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে সরাসরি অথবা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তি/ব্যাংকের মাধ্যমে কর পরিশোধ করতে পারে। কর প্রদানের সময় ইউনিয়ন পরিষদ রশিদ (ইউপি ফরম নং-১০) প্রদান করবে, যেখানে চেয়ারম্যান ও আদায়কারীর স্বাক্ষর, প্রদত্ত অর্থের পরিমাণ এবং অবশিষ্ট পাওনার হিসাব উল্লেখ থাকবে। যদি ব্যাংকে কর প্রদান করা হয়, সেক্ষেত্রে ব্যাংক রশিদ প্রদান করবে।

৩. বিল প্রদান ও ছাড়
ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে করদাতাদের কাছে বিল পাঠানো হয়। নির্ধারিত তারিখের মধ্যে পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করলে করদাতাকে ৫% হারে ছাড় দেওয়া যায়।

৪. অস্থায়ী স্থগিতাদেশ
যদি করদাতার আর্থিক অসুবিধা প্রমাণিত হয়, তবে ইউনিয়ন পরিষদ সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত কর আদায় স্থগিত রাখতে পারে।

৫. হ্রাসের সুযোগ
কোনো ক্ষেত্রে কর আরোপ বা আদায় করলে করদাতা অতিরিক্ত সমস্যায় পড়বে বলে মনে হলে ইউনিয়ন পরিষদ সর্বোচ্চ ১৫% পর্যন্ত ছাড় দিতে পারে। এর বেশি ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন হলে করদাতাকে ওই ১৫% হ্রাসকৃত অর্থ পরিশোধ করতে হয়, তারপর বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ধরা হয়।

৬. বকেয়া আদায় ব্যবস্থা
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর পরিশোধ না হলে ইউনিয়ন পরিষদ বকেয়া করের তালিকা প্রণয়ন করে নোটিশ বোর্ডে টানায়। ১৫ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর পরিষদ আইনানুগভাবে সরকারি দাবি বা ভূমি রাজস্বের মতো পদ্ধতিতে অর্থ আদায় করতে পারে। প্রয়োজনে চেয়ারম্যান ক্রোক পরোয়ানা জারি করে ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেন।

৭. অপ্রাপ্য কর মওকুফ
যে কর আদায় করা বাস্তবে সম্ভব নয়, বিধি অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ সেটি আদায় না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

আর্থিক সক্ষমতার গুরুত্ব

ইউনিয়ন পরিষদ আইন অনুযায়ী ১০টি বাধ্যতামূলক এবং ৩৮টি ঐচ্ছিক দায়িত্ব পালন করে থাকে। তবে এসব দায়িত্ব কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে অর্থের প্রয়োজন হয়। সীমিত আয় ও অপর্যাপ্ত রাজস্বের কারণে অনেক সময় জনগণের প্রয়োজনীয় কাজ সঠিকভাবে করা সম্ভব হয় না। এজন্য ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।

সূত্র: Unique law & Associates

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply