আমার জীবনের লক্ষ্য!
এই অধ্যায়ের শুরুতে আমরা নিজেদের প্রতি কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেব। সেসব প্রশ্নের উত্তর ধরে আমরা আলোচ্য বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করবো। এটা হবে মূলত আমার পূর্বে প্রকাশিত ‘‘নিজেকে গড়ে তুলতে’’ বইয়ের সার সংক্ষেপ। তো আমরা এবার সরাসরি প্রশ্নে চলে যাই?
প্রশ্নমালা
১. আমি যে বিষয়ে ক্যারিয়ার গঠন করবো সে বিষয়টাতে আমি আনন্দ পাই কিনা?
২. আমি যে বিষয়ে লেখাপড়া করতে চাই সে বিষয়টাতে আমি ভালো বুঝি কিনা?
৩. আমি যে বিষয়ে কাজ করবো ভাবছি তার চাহিদা কেমন বাজারে। অথবা আমি যখন কাজ করবো তখন এর চাহিদা কেমন থাকবে?
৪. এই কাজটি করার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও বিদ্যা আমার আছে কিনা বা আমি সেটা গ্রহণ করছি কিনা?
৫. এই কাজটি করার জন্য যোগাযোগ ও উপস্থাপনা যোগ্যতা দরকার সে বিষয়ে আমার অবস্থান কোথায়
৬. এই কাজে যে ভাষা ও প্রযুক্তি জ্ঞান দরকার। সে বিষয়ে আমার ধারণা ও প্রস্তাৃতি কেমন?
৭. এই কাজটি ভালোভাবে সম্পাদন করার জন্য আরো যেসব গুনাবলী, তথ্য ও জ্ঞান দরকার সে গুলোর বিষয়ে আমার পরিকল্পনা কি?
৮. এই কাজে আমি আমার পরিবার বন্ধু বান্ধব ও প্রতিবেশীর কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাবো কিনা? পেলে সেটা কেমন হবে? এবং কার কাছ থেকে কতটুকু হতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে নিচের প্রতিটি অংশে।
জীবনের লক্ষ্য ঠিক করা
আমরা কি করবো? কেন করবো? এবং কিভাবে করবো? অন্তত এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর যেন আমাদের জীবনের লক্ষ্যের মধ্যে থাকে। হয়তো প্রথমে মাত্র একটি উত্তর থাকতে পারে। পরে বাদবাকী উত্তর সময়ের সাথে যোগ হতে পারে। তবে সেটা অবশ্যই সময়মতো যোগ হতে হবে। একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি একটি লিডার শীপ ট্রেনিং করাচ্ছিলাম। জীবনের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা আমার কাছে জানতে চেয়েছিলো আমার জীবনের লক্ষ্য কি? আমি বলেছিলাম ‘হাসি খুশি থাকা’’ আর তাই আমি সব সময় এমন কাজ বেচে নেই যাতে আমি আনন্দ পাই এবং হাসি খুশি থাকি। আমাদের এই লক্ষ্য ঠিকের স্তরে আস্তে আস্তে অন্য প্রশ্নের উত্তর যোগ হতে পারে? যেমন কখন করবো? কার সাথে করবো? কোথায় করবো? এগুলো একেবারে কাজ বা ক্যারিয়ার শুরুর আগে সিদ্ধান্ত নিলেও চলবে। বেশীরভাগ সময় আমরা লক্ষ্য, লক্ষ্য অর্জনের উপায়, উদ্দেশ্য আর স্বপ্ন, শখ ও সুখভোগের উপায়কে গুলিয়ে ফেলি। যেমন আমার লক্ষ্য ভালো থাকা, সেটা অর্জনের উপায় ডাক্তার হওয়া, আর ডাক্তার হওয়ার উদ্দেশ্য মানুষের সেবা করা আর স্বপ্ন সুন্দর সমাজ গড়া, শখ কাজের ফাঁকে ঘুরতে যাওয়া আর সুখ ভোগের উপায় সুন্দর বাড়ি গাড়ির মালিক হওয়া।
তবে আমাদের অবশ্যই যতটা সম্ভব জেনে রাখলে পরে সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ হবে। আমরা জীবনের লক্ষ্য ঠিক করি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, লেখক, কৃষক, ব্যবসায়ী, নেতা, সাংবাদিক এসব হবো বলে। এটা কিন্তু দ্বিতীয় স্তর। আমরা জীবনের লক্ষ্য ঠিক করার প্রথম স্তরটা ফেলে যাই বলে দ্বিতীয় স্তারে কখনো কখনো দ্ধিধায় পড়ে যাই।
আমাদের জীবনলক্ষ্যের প্রথম স্তর হওয়া উচিত আমি কি করবো? প্রশ্নের উত্তর খুজে বের করা। এখানে কয়েকটি পছন্দ আছে।
ক) আমি এমন কাজ করবো যাতে আমার জীবিকাও চলে আবার সমাজ উপকৃত হয়। সেরকম কাজগুলো কি কি তার একটা তালিকা হতে পারে। সেখান থেকে আমার পছন্দ ও সাধ্যের মধ্যে যা আছে সেটা আমি বেচে নেব।
খ) আমি এমন কাজ করবো, যাতে ব্যক্তিগত লাভ হয় এবং আনন্দ পাই। উপরের কাজের মতো করে এখানকার কাজগুলোই লিখে সম্ভ্যাবতা যাচাই করতে পারি।
গ) আমি জীবিকার জন্য একটা মূল কাজ বেচে নেব। তার পাশপাশি কিছু সংস্কৃতি র্চচা করবো যাতে করে মনের প্রশান্তি থাকে।
ঘ) আমার অতো দেশ উদ্ধারে কাজ নেই। আমি যেভাবে বেশী টাকার মালিক হওয়া যায় সেটাই করবো। জীবনে বহুত দেখেছি। টাকা ছাড়া কোনো কিছুর দাম নেই।
লক্ষ্যহীন জীবন মাঝি বিহনী নৌকার মতো।
বলিউড অভিনেতা অক্ষয় কুমার বলেছেন, ‘‘আমি হোটেলে চাকরী করে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। চাইতাম কোনো প্রশিক্ষণ নিয়ে অভিনেতা হবো। সেটাও যখন হলো না খুজতাম এই বিষয়ে কোনো বই আছে কিনা? একদিন সেরকম সেকেন্ডহ্যান্ড একটি বই পেয়েও গেলাম। বইটির দাম ১১৮ টাকা আর আমার কাছে আছে ৭২ টাকা। বইটি কেনা হলো না। একটু পাতা উল্টিয়ে দেখলাম। এর দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় লেখা রয়েছে। ভালো অভিনেতা হতে হলে আগে ভালো মানুষ হতে হবে। সে কথাটি আজো মনে রেখেছি। (প্রথম আলো)
এবার আমি ঠিক করে নিয়েছি। কি হতে চাই আর কেন হতে চাই? তাই এবার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এটা মৌখিক প্রশ্ন নয়। এটা অনুশীলন, অধ্যাবসায় ও সাধনা করে অর্জন করার বিষয়।
ধরা যাক একজন ঠিক করেছেন তিনি বড়ো হয়ে একজন ব্যবসায়ী হবেন। কি ব্যবসায়ী হবেন এটা ধরে নিলাম এখন ঠিক করতে পারেননি। এখন তিনি যে পরিবার পরিবেশ ও স্কুলিং এর মধ্যে রয়েছেন তা আসলে পদ্ধতিগতভাবে কোনো ব্যবসায়ী তৈরী করে না এবং ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য শিক্ষাও দেয়না। তাহলে এই ব্যক্তির নিজের করনীয় নিজেকে ব্যবসায়িক মেজাজে প্রস্তুত করা। তাহলে করনীয় কি?
তিনি যদি ছাত্র হোন তার উচিত তার নিয়মিত লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তার কাংখিত বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করা। উচ্চশিক্ষাটা অন্তত সে বিষয়ের উপর নেয়া। তা যদি সম্ভব না তাতেও কোনো সমস্যা নেই। সে বিষয়ের উপর তিনি চাইলে একটি পেশাদার কোর্স বা ডিগ্রি নিতেই পারেন। তাও সম্ভব না হয়। শিক্ষাজীবনে ফাঁকে ফাঁকে এবং শিক্ষাজীবন শেষে সিরিয়াসলি এ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন।
জরুরী না যে, তাকে সে বিষয়ে পুথিগত বিদ্যা দিয়ে শুরু করতে হবে। তবে থাকলে ভালো আর মূল হলো বাস্তুবিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান।
আমরা বিল গেটসের কথা জানি যিনি শৈশবে বাবা-মা তাঁকে আইনজীবী বানাতে চেয়েছিলেন। ১৩ বছর বয়সে তিনি লেকসাইড স্কুলে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৯৭৩ সালে পাশ করেন। তিনি স্যাট পরীক্ষায় ১৬০০ এর মধ্যে ১৫৯০ পান এবং ১৯৭৩ এর শরতে হার্ভার্ড কলেজে ভর্তি হন।
ভারতীয় ব্যবসায়ী মুকেশ আম্বানি ইনস্টিটিউট অব কেমিক্যাল টেকনোলজি (ইউডিসিটি) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বিই ডিগ্রি লাভ করেন। মুকেশ পরবর্তীতে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ সম্পন্ন করতে ভর্তি হন কিন্ত তার পিতার রিলায়েন্স প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করতে তিনি এই প্রোগ্রাম শেষ না করেই চলে আসেন। রিলায়েন্স তখন ছোট কিন্তু দ্রুত বর্ধমান প্রতিষ্ঠান ছিল। দেখুন। এরা হয়তো নিজের বিষয়ে লেখাপড়া করেননি। কোনো এক পর্যায়ে তাকে প্রয়োজনীয় বিদ্যা আয়ত্ত করতে হয়েছে।
লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকা
কোনো কারণেই নিজ জীবনের লক্ষ্যকে হেলাফেলা করার মতো ভুল করা ঠিক নয়। সকালে বিকোলে লক্ষ্য বদলে ফেলাও ঠিক নয়। কেউ যদি একজন সেলসম্যান হোন বা সেলসম্যান হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। তিনি একসময় সে কোম্পানীর সিইও না হলেও হেড অব সেলসতো হতে পারেন। এটা খুব সহজ উদাহরণ। কারণ প্রায় সব হেড অব সেলসকে একদিন কোম্পানীর সেলসম্যান হিসেবে যোগদান করতে হয়েছে।
ওয়ারেন বাফেটকে আমরা চিনি যিনি পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ ধনী। যিনি জীবনের শুরুতে ছিলেন হকার। বিক্রি করেছেন সংবাদপত্র। এক সময় মুদি দোকানেও কাজ করতেন এ উদ্যোক্তা। বর্তমানে ৬৩টি কোম্পানির মালিক। পৃথিবীর দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী হওয়া সত্বেও তার মধ্যে নেই কোন বিলাসিতা। আরো মজার ব্যাপার হলো মাত্র এগার বছর বয়সে প্রথম শেয়ার কিনেছিলেন। তারপরও তিনি মনে করেন এ ব্যবসায় আসতে তার অনেক দেরি হয়ে গেছে। আরও আগে ব্যবসা শুরু করা উচিত ছিল। তাই তার পরামর্শ আপনার সন্তানকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেন। তিনি সংবাদপত্র বিক্রি করা অর্থ দিয়ে তিনি মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে ছোট্ট একটি ফার্ম কেনেন। তার মতে, অল্প অল্প করে জমানো অর্থ দিয়ে যে কেউ কিনতে পারেন অনেক কিছু। সেজন্য সন্তানদের তিনি কোন না কোন ব্যবসায় নিয়োাজিত করার পরামর্শ দেন। তবে এর অর্থ এই নয়যে, তার উল্টো উদাহরণও নেই। তবে মানুষের জীবনের বয়স খুব বেশীদিন পাওয়া যায়নাতো, মানুষকে যা করার ওই একজীবনেই করতে হয়। (সূত্র: ইন্টারনেট)
আমরা যেন সহজে হাল ছেড়ে না দিই। তবে অবশ্যই বিনা কারণে জেদের বশে এমন কিছু ধরে থাকা ঠিক হবেনা যার কোনো ভবিষ্যত সম্ভাবনা নেই। লক্ষ্য নয় পদ্ধতি পরিবর্তন এই বিষয়ে পূর্বে অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

