আত্ম-বির্নিমানের এক নতুন পথে

আত্ম-বির্নিমানের এক নতুন পথে

আত্ম-বির্নিমানের এক নতুন পথে

ভারতীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছেন সে দেশের সফল ব্যবসায়ী ও ধনকুবের রতন টাটা। স্বভাবতই সেখানে শিক্ষার্থীরা পার করার পর এক নতুন রঙীন ও চকচকে জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে সমাবর্তনে যোগদান করেছিলো। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ এই আশায় তাকে দাওয়াত দিয়েছিলেন যে, তিনি ছাত্রদের জীবনের জন্য শুধু দিক নির্দশনা মূলক কিছু বলবেন তা-ই নয় বরং তিনি হয়তো ভবিষ্যতে তার প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যাপারে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করাদের প্রতি বিশেষ নজর দিবেন। বলাবাহুল্যৈ শিক্ষার্থীরা হয়তো সে আশা করেছিলো পাশপাশি তারা হয়তো আশানুরুপ কিছু শোনার প্রতীক্ষাও ছিলো।
সেদিন রতন টাটা শুরু করলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবে। তিনি প্রথমে জানতে চাইলেন কোন কোন ছাত্র মাকে রান্নায় সাহায্য করে থাকেন। দেখি হাত তোলেন ছাত্র-শিবিরে তখন নিরবতা। কোন কোন ছাত্রী বাবার জুতার ফিতা বেঁধে দিয়েছেন, তখন ছাত্রী পল্লীতে অবনতা।
এভাবে সেদিন তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। যারা হাতের কাছে এতটুকু দায়িত্ব যেচে গ্রহণ করেনি যেগুলো হয়তো অন্যলোকের উপর নির্ভর করেছে। তারা কি করে একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেবে? কি করে একজন সিইও হবে?
কারা কারা নিয়মিত মা বাবার জামা কেঁচে দিতেন কখনো কখনো। কারা নিয়মিত দীদাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। কারা কারা কাজের লোকের মায়ের অসুস্থ্যতার খবর রাখেন? কারা কারা প্রতিবেশীকে অসুস্থ্য হলে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যান? কারা কারা আত্মীয়দের সাহায্য করেন।
এই প্রশ্নের উত্তরে হয়তো আশানুরুপ সংখ্যায় লোক পাওয়া যাবেনা। হয়তো কথা আসবে এগুলো করার জন্য লোক রয়েছে। আমি কেন ওসবে মনোযোগ দিয়ে আমার সময় নষ্ট করতে যাবো।
প্রথমত অন্যকেউ যখন কাজটি করে তখন আমার দায়িত্ব পালন হয়না শুধু অন্য কারো দায়িত্বটাই পালিত হয়। দ্বিতীয়ত সবসময় একটা কাজের জন্য অন্য একটা লোক থাকতেই পারে, কিন্তু মাঝে মাঝে বা কখনো কখনো সে কাজটা আমি করে দেখতে পারি। এতে কিছু শেখা হবে, সে কাজটি সম্পর্কে জানা হবে। সে কাজটি করতে গিয়ে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হলে সেটা সমাধান করার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করার যোগ্যতা তৈরী হবে।
আসুন সে আলোকে আমরা কিছু বিষয়ে আলোকপাত করি।
কর্মজীবনের সূচনায়
আমরা আমাদের ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পর আমরা মোচ পাকিয়ে চাকরির বাজারে হানা দিই। কেউ কেউ মনে করি ‘‘সবকিছু শেখা শেষ এখন ম্যালা টেকা বেতন পাওয়ার সময়’’। আসুন চাকরীতে প্রবেশের আগে আমি জেনে নিই যিনি আমাকে চাকুরী দেবেন তিনি কেন দেবেন আর আমি আসলে জানিটা কি?
১. আমি কি ১০-২৫ জনের কোনো দলকে পরিচালনা করতে পারি। বা দলের সাথে একজোট হয়ে নিজের কাজটা করতে পারি?
২. আমি কি অফিসের কাজে বিভিন্ন লোকের সাথে যোগাযোগ করতে পারবো এবং তাদের দরকারী বিষয়ে বোঝাতে পারবো?
৩. আমি কি অফিসের হয়ে কোনো, চিঠি, প্রস্তাাবনা, পরিকল্পনা, প্রোফাইল ও অন্যান্য অফিসিয়াল ডকুমেন্টস তৈরী করতে পারি?
৪. আমি যে বিষয়ে কাজ করবো সে বিষয়ে ফার্মের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী অন্য কারো দেয়া সাহায্য ছাড়া কাজ শেষ করে আসতে পারবো।
৫. আমি কি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পারবো। এবং অযুহাত বা অন্যকে দোষারোপ ব্যতিত কাজটি সঠিকভাবে শেষ করতে পারবো?
যদি আপনার উত্তর হাঁ হয় এবং সঠিক হয়। তাহলে আপনাকে সাধুবাদ ও চাকরীর বাজারে স্বাগতম। যদি বলেন ওটা ব্যাপার না, ২ দিনে তুড়ি মেরে শিখে নেব। তাহলে বলবো দাড়ান, শিক্ষা জীবনের ১৫ বছরে যা শিখেছেন তা সিরিয়ালী লিখতে থাকেন। যেভাবে উপরের কাজগুলো লিখেছি। যেসব বিষয় আপাতত চাকরীর ক্ষেত্রে লাগবেনা সেগুলো বাদ দিয়ে লিখুন। তখনি বুঝবেন ১০ বছরে কি শিখেছেন আর কাজের কাজগুলো কি দুই দিনে শিখতে পারবেন কিনা? অথবা কতদিন লাগবে আর কি করা উচিত?

লক্ষ্যের সাথে সমন্বয় করে কর্মপদ্ধতি ঠিক করা
উপরের সমস্যাগুলোর জন্য আগেই আমাদের প্রস্তুতি থাকা উচিত। এসব বিষয়ে প্রস্তুত না থাকার কারণ হলো আমরা নিজের লক্ষ্য ও কর্ম নিরুপনে সন্দিহান ছিলাম। তাই ভাবা হয়নি মূল কাজের বিষয়। তাই আগের পরিচ্ছদে যেভাবে জীবনের লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে। সেভাবে লক্ষ্য ঠিক করার পর। প্রতিটি কাজ শেখা, করা, খবর নেয়া ইত্যাদি করার সময় কোনো দ্ধিধা দ্ধন্ধ না রেখে করে যেতে হবে। যেটা লক্ষ্যের সাথে যায় সেটা অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেটা লক্ষ্যের সাথে যায়না সেটা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়না। যেমন আপনি যদি মনে করেন পর্যটন ব্যবসায় করবেন তাহলে তথ্যপ্রযুক্তি জানতেই পারেন সেটা কাজে লাগবে। এমনকি রান্না শিখলেও কাজে লাগবে। ভূমি জরিপ হয়তো তখন আপনার সাবজেক্ট থাকবেনা।

যা করছি মনোযোগ দিয়ে করি
অনেক সময় আমরা কাজ করে স্রেফ করতে হবে সেজন্য। কখনো কখনো লেখাপড়াও তেমন। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে তেমন হলে বিপদ। একটা কাজে আমাকে পাঠানো হলো আমি সেটা না বুঝে করে আসলাম বা করে আসার চেষ্টা করলাম এমনটা যেন না হয়। তাহলে সে কাজ এবং কাজের ফল সেখানেই শেষ হয়ে যাবে। কাজটা বুঝে করলে ইতিবৃত্ত জানলে, তার ভালো-মন্দ সুবিধা অসুবিধা অন্যান্য বিষয় জানলে সেটা কাজে লাগতে পারে পরেও।
যেমন ধরি, আবিরকে তার বাবা সাথে করে গরু কিনতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কোরবানির আগে। প্রতিবছর তিনি তাকে নিয়ে যান। সে শুধু বাবার সাথে যায় আর গরুর রশি ধরে নিয়ে ফিরে আসে। এর বাইরে সে আর কিছু জানে না জানতে চায়না।
কিছুদিন পর বাবা মারা গেলেন মা বললেন আবীরকে বাজারে গিয়ে গরু কিনে আনতে। কিন্তু সে বলল, ‘‘মাম্মি গরু কিভাবে দরদাম করে, কোন গরু ভালো আমিতো কিছুই জানি না। আমিতো বাবার সাথে বাজারে যেতাম কেবল গরুটা যেন পালিয়ে না যায় সেজন্য’’। আশাকরি বিষয়টা পরিষ্কার হয়েছে।

অন্তত একটি বিষয়ে অবশ্যই অভিজ্ঞ হই।
আমরা কেউ ব্যক্তি বা কর্মজীবনে নিশ্চই অনেকগুলো কাজ করবনা। সেটা করা সম্ভবও নয়। তবে দুটো বিষয়ে সমন্বয় হলে কখনো কখনো দারুন কিছু হয়। যেমন আমি যদি একজন হিসাবরক্ষক ও আইনজীবি হই তাহলে টাকা পয়সা বা হিসাব সংক্রান্ত আইনগতকাজে কিংবা একজন দক্ষ ইনকাম ট্যাক্স উকিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার সবসময় এমনটা হয়না যেমন আমি নিশচই একসাথে একজন হিসাবরক্ষক ও ডাক্তার হবো না।
সবকিছু করতে বা শিখতে যাওয়া ঠিক নয়। তবে সংশ্লিষ্ট বিষয় সমূহ জ্ঞান রাখা যেতে পারে যেমন, আমি যদি একজন ডাক্তার হই সেইসাথে যদি এনিমেশন শিখতে পারি তাহলে ডাক্তারী শিক্ষার অনেক কিছুকে এনিমেশনে নিয়ে আসতে পারব। অথবা যদি একজন প্রোগ্রামার হই হয়তো আমার কাছ থেকে পৃথিবী পাবে কিছু চিকিৎসা সংক্রান্ত সফটওয়ার। তবে সেটাও বুঝে শুনে শিখতে হবে। যদি কাজে লাগাতে না পারি। তাহলে ডাক্তারীর সাথে ল না পড়ে ডাক্তারীর সাথে জড়িত কোনো কিছু শিখলেই হয়। বিদেশী কিন্তু মেডিক্যাল এবং ল শিক্ষার্থীরা চিকিৎসা সংক্রান্ত মামলাগুলোতে দক্ষ হয়ে থাকেন।
আমাদের দেশে একজন ডাক্তার যদি একজন ভালো ব্যবস্থাপক হোন তাহলে তিনি হয়তো কখনো হাসাপাতাল ব্যবস্থাপনায় ভালো করতে পারেন। অবশ্যই একটি কাজে দক্ষ হওয়ার পর অন্য কাজের কথা ভাবা যায়। যদি সেটা সম্পর্কিত হয় বা কাজে লাগে।
অবশ্যই যেকোনো জ্ঞান অর্জন করা যেতেই পারে। শিখলে সেটা কোনো কোনো কাজে কখনো একটু হলেও লাগতে পারে। মনে রাখতে হবে আমরা কেউ সবজান্তা হতে পারবোনা। সব কাজ করতে পারবনা। একটা কাজই করতে হবে। আর সে কাজটা দক্ষতার সহিত করতে হবে। প্রতিটি কাজে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি যোগ হয়, সেগুলো শিখতে পারলে সে বিষয়ে আরো দক্ষ হয়ে উঠতে পারি। আমি একটি কাজে দক্ষ হয়ে উঠার মাধ্যেমে আমার মেধাকে সঠিকভোবে কাজে লাগাতে পারি।
কখনো সিইও কিংবা টপার হওয়ার জন্য কিংবা সামরিক বাহিনীতে চাকরীর ক্ষেত্রে এভারেজ কোয়ালিটি প্রয়োজন হতে পারে। সেটাও অন্তত একটা কাজে খুব ভালো দক্ষ হওয়ার পর। একটা কাজে দক্ষ হয়ে যদি অনেক কাজ জানা যায়। তাহলেতো সোনায় সোহাগা। এধরনের লোকের সংখ্যা বিরল বেশীরভাগ মানুষই আমরা গতানুগতিক। অন্যনান্য বিষয় সমূহে ধারণা রাখা থাকা ভালো, মূল কাজের পাশাপাশি জানতে পারেন একটি বিকল্পও কাজও যেমনটা আগে উদাহরণ দেয়া হয়েছে।

শুনুন তবে তেমন একজন মানুষের কথা
মাত্র ২৪ বছর বয়সেই ২০টি ডিগ্রি অর্জন করেছেন ১৯৫৪ তে জন্মনেয়া ভারতের একসময়ের তরুন শ্রীকান্ত জিচকার। তিনি লিমকা বুক অফ রেকর্ডস অনুযায়ী ভারতের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি। ভারতের সবচেয়ে প্রতিভাধর ব্যক্তি ও। ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০টি বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। তার স্নাতকোত্তর ডিগ্রীই আছে দশটা। বিজ্ঞান, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃত, ইংরেজি সাহিত্য, অর্থনীতি, মনোস্তাত্ত্ব ইত্যাদি তো আছেই। ডাক্তারি ও আইনসহ, শিল্পী, চিত্রগ্রাহক, এবং অভিনয়ের ওপর ডিগ্রি নেন। মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটযুদ্ধে জয়লাভ করেন শ্রীকান্ত। ১৯৮০ সালে তিনি বিধায়ক নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে যায় শ্রীকান্তের জীবন।

অন্যের কথা নয়, নিজের গল্প বলার প্রস্তুতি নিন
ইকবাল বাহারের ‘‘নিজের বলার মতো গল্প’’ এর সাথে সূর মিলিয়ে বলি। সত্যি নিজের বলার মতো গল্প থাকলে আপনার কাজ নিজের জন্যও সহজ হয়ে যাবে। অন্যের কাছেও সহজে বার্তা পৌছে যাবে।
নিজের পেশা ও আয় খুব ভালো না হলে বিশেষ করে ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বিকল্প একটি পেশার কথা ভেবে অন্য একটি কাজ শিখে রাখতে পারেন। নিজেকে তৈরী করে রাখতেই পারেন। আর্থিক সঙ্গতির জন্য ব্যয় ও সঞ্চয়ের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে জানতে হবে।
ক) ব্যয়ের পর সঞয় নয়, বরং আগে সঞ্চয় করুন, বাকী অংশ ব্যয় করুন। ধরি আপনার আয় বাইশ হাজার টাকা, আপনার জমা মাসে দুই হাজার। সে দুই হাজার আগে জমা করে তারপর বাকী টাকা খরচ করুন।
ক) সঞ্চয়ের চেয়ে বিনিয়োগ ভালো, সঞ্চয় আপনাকে খুব অল্প একটি পরিমাণ অর্থ দেবে। যা দিয়ে আপনি হয়তো একটি নতুন জামা কিংবা অনেক টাকা সঞ্চয় হলে বড়োজোর একটি বাড়ী করতে পারবেন। কিন্তু বিনিয়োগ আপনাকে বড়ো উদ্যোক্তা বা এরচেয়ে বেশীকিছু বানাতে পারে। অবশ্য এজন্য সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরী কিন্তু। সব সঞ্চয় বিনিয়োগ না করে তার একটা অংশ আগে বিনিয়োগ করতে পারেন।
গ) উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করুন। আপনার হাতে কিছু টাকা আছে। খরচের আছে দুটো অপশন। এক হচ্ছে ধুমধাম করে বড়ো মেয়ের বিয়ে দেয়া দুই, ছোটোমেয়েটা ডেন্টালে পড়তে চায়, তাকে সে ব্যাপারে সাহায্য করা। আপনি অবশ্যই এমন কাজটাই করবেন যেখান থেকে ভবিষ্যতে কিছু আসবে।
আমরা যখন কোনো ফল খাই। সে ফলের জীবনচক্রের দিকে আমরা আমাদের দৃষ্টি নিবন্ধ করতে পারি। ফল পরিপক্ক হওয়ার আগে তার বীজ পরিপক্ক হয়। বীজের ভেতর ফল তার শক্তি সঞ্চয় করে তারপর অন্যঅংশ খাদ্যে পরিণত হয়। খাদ্য অংশটা নরম আর সুস্বাদু হয়। আর বীজ হয় শক্ত খোলসে আবৃত আর বেশীরভাগ ক্ষেত্রে অনুপাদেয় অন্তত কাচায়। এখান থেকেই আমরা আমাদের জীবনের শিক্ষাটা নিতেই পারি।

 

লেখা : জাহাঙ্গীর আলম শোভন

ছবি: উইকিহাউ