আত্মবিশ্বাসী
আপনার আত্মবিশ্বাস আপনার কাজকে সহজ করে দেবে

আত্মবিশ্বাস অর্জন করব কীভাবে?

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

আত্মবিশ্বাস অর্জন করব কীভাবে?

আমরা কথায় কথায় বলি, আত্মবিশ্বাস থাকা উচিত। আত্মবিশ্বাস মানুষকে সফল হতে সাহায্য করে। আত্মবিশ্বাস না থাকলে সামনে আগানো যায় না। কিন্তু কীভাবে আত্মবিশ্বাস অর্জন করব বা আত্মবিশ্বাস ধরে রাখব?
আত্মবিশ্বাস মানে কী? আত্ম মানে নিজ বা নিজের, বিশ্বাস মাসে আস্থা বা নির্ভরশীল হওয়ার মতো ধারণা। তা হলে আত্মবিশ্বাস মানে হলো, নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখা। তবে এটা ইতিবাচক অর্থে। মানে নিজের সম্পর্কে নিজের ক্ষমতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখা। যেমন ‘আমি ক্রেওকেরাডাং পাহাড়ে উঠতে পারব’, এটা আত্মবিশ্বাস। আবার আমার মনে হয়, আমি হেঁটে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যেতে পারব না। এটাও নিজে সম্পর্কে একটা বিশ্বাস বা ধারণা। কিন্তু এটা ইতিবাচক নয় বিধায় আমরা একে আত্মবিশ্বাস বা কনফিডেন্ট বলি না।
আসুন, তা হলে জেনে নেয়া যাক এই মহামূল্যবান আত্মবিশ্বাস কীভাবে অর্জন করব?

অনুশীলন এবং অনুশীলন
যেকোনো বিদ্যা বা বিষয়কে জানার মাঝেই শুধু সীমাবদ্ধ রাখলে তাতে তার সামনের পদক্ষেপ বা পরের সিঁড়ি কী হবে সেটা জানা যাবে না এবং সে ব্যাপারে সুবিধা-অসুবিধাও জানা যাবে না। এজন্য চাই অনুশীলন। অনুশীলনের ফলে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করা যায়।

উচ্চতর জ্ঞান
প্রতিটি বিষয়ে আমাদের প্রাথমিক একটা ধারণার ব্যাপার থাকে। যা আমরা অনেকেই ধারণ করি। আবার কোনো একটা বিষয়ে কেউ কেউ জানে। আবার সেই বিষয়ে একেবারে গভীর ধারণা হয়তো হাতেগোনা কয়েকজন রাখেন। তা হলে যিনি গভীর জ্ঞান রাখেন তিনিই কেবল সেই বিষয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কিছু বলতে পারেন। যেমন আমাজন বন কী? এ ব্যাপারে আমাদের মোটামুটি একটা ধারণা আছে। আমাজন বনে কোন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে এটা হয়তো সচেতন ও শিক্ষিত মানুষ বলতে পারবে। কিন্তু আমাজন বনে সিংহ আছে কি না, থাকলে তাদের বাস কোন এলাকায়, সেটা বলার জন্য নিশ্চয় এ সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে এমন একজন মানুষ দরকার। আর তিনিই কেবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন।
এখন কথা হলো প্রতিটি বিষয়ে কি উচ্চতর জ্ঞান নেয়া কারো পক্ষে সম্ভব। তা নিশ্চয় নয়। তবে কারো ক্যারিয়ারের সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে যতটা সম্ভব ভালো ও পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত।

নিজেকে সাবলীলভাবে প্রকাশ করা
অনেক সময় আমরা অনেক কিছু পারি বা অনেক কিছু জানি মনে করে চুপচাপ থাকি। মনে করি এটাতো আমি জানিই, এ ব্যাপারে আর জানার বা বলার কী আছে? কিন্তু এতে করে আমাদের জানার মাঝে কোনো অপূর্ণতা থাকলে তা আমরা বুঝতে পারি না। আর সেই জানার বিষয়টা আমি প্রয়োজনের সময় কতটা তুলে ধরতে পারব সেটাও বুঝতে পারি না। ফলে বাস্তবতার সাথে একটা ফারাক তৈরি হয়। আর এই ফারাক আমাদের আত্মবিশ্বাসী হতে বাধা সৃষ্টি করে।
যদি কখনো এমন হয় আমরা নিজেকে প্রকাশ করতে গিয়ে আবিষ্কার করি যে, নিজের সম্পর্কে যা ভাবতাম আমি আসলে সেরকম কেউ নয়। তখনো আমরা যেন নিজেকে সাবলীলভাবে প্রকাশ করা থেকে বিরত না থাকি। কারণ, এভাবে একদিন হয়তো আমাদের ত্রæটিগুলো কেটে যাবে। ত্রæটি কেটে যাওয়া মানেই আমি আত্মবিশ্বাসী হওয়ার পথে একধাপ অগ্রসর হলাম।

জয়ের পর উন্নতির চিন্তা করা
কখনো কখনো আমরা কোনো বিষয়ে জয়ী বা সফল হওয়ার পর নিজের অন্য উন্নতির কথা ভুলে যাই। আর এই ভুলটা আমাদেরকে পরবর্তী সময়ে পেছনে ফেলে দেয়। সুতরাং প্রথমবার সফলতার পর আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, আমি দশ জনের মধ্যে সফল হয়েছি। কিন্তু দশ লক্ষের মাঝে নাও হতে পারি। অথবা আমি জানুয়ারির শীতল সকালে যে কাজে সফল হয়েছি, আগস্টের উষ্ণ বিকেলে তার ফলাফল একই রকম নাও হতে পারে। তাই সফলতা ধরে রাখার জন্য আগের চেয়ে বেশি যোগ্য, দক্ষ, শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার জন্য সবসময় নিজের উন্নতির কথা ভাবতে হবে।

পরাজয়ের পরও উন্নতির কথা চিন্তা করা
শুধু যে জয়ের পর উন্নতির কথা ভাবলেই হবে, তা নয়। একই ভাবনা পরাজয়ের পরও ভাবা উচিত। জয় মানুষকে সফলতার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে সাহায্য করে, আবার হার মানুষের ভেতরের শক্তিটাকে জাগিয়ে দিয়ে পরবর্তী জীবনের সফলতার পাথেয় তৈরি করে দেয়। এজন্য পরাজয়ের পরও পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে এবং উন্নতির কথা ভাবতে হবে। মনে করতে হবে আমার পরাজয়টা হবে জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।
এই ভাবনা একটু ভিন্ন হতে পারে। যেমন বার বার চেষ্টা করেও টেনিস খেলায় ভালো করছেন না। এমন হতে পারে, কারো এই উন্নতি বা পরিবর্তনটা তিনি অন্যভাবে করতে পারেন। দেখা গেল যে, আসলে হকিতে ভালো করছেন।

নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ
অনেক সময় জগৎসংসার দূরে থাক আমরা নিজেরাই নিজেদের যোগ্যতা বুঝতে পারি না। অহেতুক নিজেকে চেঙ্গিস খান ভেবে বসে থাকি। অথবা ভাবি গোলাম হোসেন।। কিন্তু আমরা যা ধারণা করি, সেটাকে পরখ করে দেখলেই নিজের সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যেতে পারি। যেমন অনেকেই নিজের গানের গলা সম্পর্কে উচ্চতর ধারণা পোষণ করেন, অথচ একটা ছোট্ট পার্টিতে গান গাওয়ার পর শ্রোতার প্রতিক্রিয়া দেখলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। তাই নিজেকে সঠিকভাবে বুঝতে পারা খুব জরুরি। সিদ্ধান্তগুলো কতটা সফল হবে তা নির্ভর করছে নিজের সাথে সিদ্ধান্তগুলো কতটা বাস্তবসম্মত তার উপর।

অন্যদের সম্পর্কে পরিষ্কার জ্ঞান থাকা
আমি এ ব্যাপারে একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে থাকি। ধরি, আমি সাত রাজ্যের রাজা, আমার আছে তেরো লক্ষ সেনা, সোয়া লক্ষ হাতি, আধা লক্ষ ঘোড়া। বিশ হাজার তিরন্দাজ আর সাত শ য্দ্ধুজাহাজ। এর উপর ভর করে প্রতিরাতেই অন্য রাজ্য জয়ের স্বপ্ন দেখি। এখন অন্য রাজার যদি সতেরো লক্ষ পদাতিক, তিন লক্ষ নৌসেনা, দু লক্ষ হাতি, দেড় লক্ষ ঘোড়া, পঞ্চাশ হাজার তিরন্দাজ, এক হাজার জাহাজ, আশি হাজার বল্লমসেনা, নব্বই হাজার পালেয়ান থাকে। তখন ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে? সুতরাং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজের অবস্থান ও সফলতার সম্ভাবনা জানার জন্য অবশ্যই যার বা যাদের সাথে প্রতিযোগিতা করছেন তাদের সম্পর্কে ধারণা রাখুন।
অবশ্যই এই পরিস্থিতিতে প্রতিনিয়ত লেগে থেকে এবং কৌশল বদলে নিয়ে জয়ের বা সাফল্যের ছক তৈরি করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তবে নিজেকে কখনো খুব পিছিয়ে পড়া মনে করে হাল ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। আবার নিজেকে অগ্রসর মনে করে চুপ থাকাও উচিত নয়। তা হলে ঈশপের কচ্ছপ আর খরগোশের গল্পের মতো হয়ে যেতে পারে আমাদের জীবনের গল্প।
যেমন ধরুন, কেউ বুঝতে পারলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সফল হবেন না। এটা বোঝার পর কারো প্রথম কাজ হলো যে, নিজেকে আরো উপযোগী করে তৈরি করা এবং এর পরও সফল না হলে অন্যভাবে সফল হওয়ার ছক করা। কোনো কলেজে ভর্তি হয়ে সেরা রেজাল্ট করার পরিকল্পনা করতে পারেন। কর্মমুখী শিক্ষা নিয়ে পেশাগত জীবনে উন্নয়নের বীজ বুনতে পারেন এই চান্স না পাওয়ার বিষয়ে এটাই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত।

ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন
আমরা বলি কেউ দেখে শিখে, কেউ ঠেকে শিখে আর কেউ ঠকে শিখে। আর কেউ যদি কখনোই না শিখে তা হলে এর নাম কী হবে? জানি না। তবে এর পরিণতি নিশ্চয়ই ভালো হবে না। যিনি ভুল হওয়ার পরও আবার সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেন তার জন্য আসলে কোনো উপদেশই প্রযোজ্য নয়। আর যিনি ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। তিনি আসলে জীবন-বিদ্যালয়ের একজন মনোযোগী ছাত্র। সুতরাং তার আত্মবিশ্বাস ভালো হবে। তার উন্নতি হবে না তো আমার হবে? বিশেষ করে আমি যদি ন্যাড়া হয়েও বেলতলায় বার বার যাই। আরো একধাপ এগিয়ে থাকবেন যদি আপনার স্লোগান হয় ‘ভুল যেই করুক-না কেন, সেখান থেকে আমি শিক্ষা নিতে ভুল করব না।’

আবেগ নয় যুক্তি ও বাস্তবতা দিয়ে বিচার করুন
অনেক সময় আমরা মানুষ আমাদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আবেগ, অনুরাগ, বিরাগ এসবের বশবর্তী হয়ে নিয়ে থাকি। এটা এক ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এতে আমাদের সফলতার হার কমে যায়, ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হয়ে যায়। ব্যর্থতার ভারী পাল্লা আমাদের আত্মবিশ্বাসের রংটাকে ধীরে ধীরে ধূসর করে করে দেয়। এসবের কারণে অনেকেই কনফিডেন্ট পান না। তাই নিজের রাগ-অনুরাগ ও নিতান্ত অনুমানের উপরে নির্ভর করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। বাস্তবতার আলোকে এবং যুক্তির নিরিখে বিচার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। সে সিদ্ধান্ত আপনাকে শক্তি ও সংযম এনে দেবে।
কখনো কখনো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলা ঠিক নয়। অবাস্তব আত্মবিশ্বাসের উপর ভর করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়াও বিপজ্জনক। যেমন পর্বতারোহণ সম্পর্কে খুব ভালো জানেন না অথচ খুব জোর দিয়ে বলছেন প্রথমবারেই এভারেস্ট জয় করতে পারবেন। এরকম ভাবা অবাস্তব নয়, অনেক ক্ষেত্রে হাস্যকরও বটে।

আশা করি উপরের বিষয়গুলো মনে রাখলে এবং মেনে চললে কারো আত্মবিশ্বাসের যদি অভাব থাকে সেটা পূরণ হবে। তবে এজন্য সময় লাগবে। আর যদি ভুল আত্মবিশ্বাস নিয়ে বসে থাকেন। তা হলে সেটা খুব সহজে জানতে পারবেন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply