আইসিটি খাতের বিভ্রান্তিকর ধারণা এই খাতকে পিছিয়ে দিচ্ছে
দেশের আইসিটি, কম্পিউটার, ডিজিটাল স্কিল, ফ্রি-ল্যান্সিং, কল সেন্টার, প্লাটফর্ম অর্থনীতি, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ইত্যাদি বিষয়ে নানা ধরনের ভুল ধারণা বিগত দিনে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায় থেকে ছড়ানো হয়েছে। সবার আগে তরুনদের কাছে এই ভুল ধারণার বার্তাগুলো তুলে ধরতে হবে।
আইসিটি খাতের যে বিভ্রান্তিগুলো বছরের পর বছর চলছে সেগুলো উন্মোচিত করবো-
১) আইসিটি উন্নয়ন:
আইসিটি উন্নয়ন বলতে বিগত সময়ে বিভিন্ন প্রচারনা ও কার্যক্রম এর কারণে জনগনের মাঝে এমন ধারনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, আইসিটি উন্নয়ন মানে ই-মেইল ব্যবহার আর ওয়েবসাইট সাথে কিছু ডিজিটাল সেবা। প্রকৃত পক্ষে আইসিটি আসলে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজকে সহজ, সময় সাশ্রয়ী, সস্তা এবং কল্যানকর করে তোলা। তাই এই বার্তাটি প্রজাতন্ত্রের সকল শাখায় প্রতিষ্টা করতে হবে।
২) আইটি স্কিল বা কম্পিউটার স্কিল:
নব্বইয়ের দশকে আইটি স্কিল বা কম্পিউটার স্কিল বলতে এদেশের তরুন সমাজকে বোঝানো হয়েছে কম্পিউটারের কয়টি অপারেটিং প্রোগাম শিখতে পারলে আমরা আইটিতে দক্ষ হতে পারবো। এই ধারনা দেয়ার মাধ্যমে দেশের হাজার হাজার কম্পিউটার অপারেটর তৈরী হয়েছে। প্রকৃত অর্থে আইটিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরী করা হয়নি। সেদিন যদি কম্পিউটারে দক্ষতার মানে বোঝানো হতো সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার কিংবা প্রোগ্রামিং দক্ষতা তাহলে আজকে আমরা আইটিতে অনেক এগিয়ে থাকতাম।
৩) ফ্রিল্যান্সিং:
বর্তমানে ফ্রি-ল্যান্সিং নিয়ে ভুল মতবাদ ছড়ানো হচ্ছে। ফ্রি-ল্যান্সিং কাজের একটি ধরণ মাত্র। বেতন বহিভূত সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারদের বলা হয় ফ্রি-ল্যান্সার। আমাদের বাসার ছুটা কাজেরও বুয়াও একজন ফ্রি-ল্যান্সার। ফ্রি-ল্যান্সার কোনো দক্ষতার নাম নয় এটি কাজ করার একটা ধরণ। আইসিটি খাতে যারা স্বাধীন ভাবে কাজ করে তাদেরকে এখন আমরা আউটসোর্স ফ্রি-ল্যান্সার বলছি। তাই বিষয়টি বুঝতে হবে।
ভুল হচ্ছে সরকারী ও বেসরকারী সবক্ষেত্রে বলা ফ্রি-ল্যান্সিং শিখুন আর টাকা কামাতে থাকুন। এ ধরনের বার্তা দিয়ে তরুনদের একটা বিরাট অংশকে ধ্বংষ ও বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, নষ্ট করা হচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ। কারণ ফ্রি-ল্যান্সিং কোনো কাজের নাম নয়। এটা কাজের একটা ধরণ। যেকোনো একটি দক্ষতাকে এই ধরনের মধ্যে রেখে তা দিয়ে আয় করা যেতে পারে। যেমন প্রোগ্রামিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ডিজিটাল মার্কেটিং। এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ এবং কমমূল্যের কাজ হলো ডাটা এন্ট্রি। মানে আপনি এই কাজগুলোর যেকোনো একটিতে দক্ষতা অর্জন করলে আপনি আউটসোর্স মুডে বা একজন ফ্রি ল্যান্সার হিসেবে বেতনভূক্ত কর্মচারী না হয়েও কাজ করার মাধ্যমে অর্থ রোজগার করতে পারেন। ফ্রি ল্যান্সার একটি মাধ্যমে মূলত দক্ষতা থাকতে হবে বিভিন্ন কাজে।
কিন্তু আমাদের তরুনদের ফ্রিল্যান্সার শেখানোর নামে বিভিন্ন প্লাটফর্মে একাউন্ট তৈরী আর ডাটা এন্ট্রি শিখিয়ে ১/২ ডলার আয় দেখিয়ে তাকে দক্ষ ফ্রিল্যান্সার নাম দিয়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। আর কয়েকদিন পরেই সে তরুন হতাশ হয়ে পড়ছে। কারণ সে তার আয় বাড়াতে পারছেনা এবং যে আয় করছে অন্যান্য দেশের ফ্রিল্যান্সারদের তুলনায় তা নগন্য। তাই এই মিথ্যা ধারণা প্রচার থামাতে হবে।
সম্প্রতি ফ্রি ল্যান্সিং এর নামে জুয়া-গেম খেলা এবং এডাল্ট কনটেন্ট তৈরী করা শেখানো হচেছ। যা ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে।
তাই, ফ্রিল্যান্সিং না শিখিয়ে ফ্রিল্যান্সার হতে আইসিটি দক্ষতা অর্জনের কথা বলতে হবে। এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শেখাতে হবে। এই দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে আমাদের কোটি তরুদের শক্তি ও মেধাকে আমরা কাজে লাগাতে পারবনা। তাই এই বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪) কল সেন্টার
বিশাল সম্ভাবনা সত্বেও আমাদের দেশে কলসেন্টার ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা পায়নি। দুটো কারণে প্রথমত ভুল ধারণা কারণ ভাল ইংরেজী, পেশাগত দক্ষতা এবং সংশ্রিষ্ঠ পণ্য সেবা সম্পর্কে ধারণা না থাকলে কল সেন্টারে কাজ করা যায় না। অথচ এসব বিষয়ে কোনো কর্মসূচী বা কাজ না করে শুধু হুজুযে প্রচারণার মাধ্যমে কলসেন্টারের লাইন ধরে লাইসেন্স নিয়ে আজ দেশে লাখো বেকার সত্বেও এই ইন্ডাস্ট্রি কাংখিত সফলতা পায়নি।
৫) ডিজিটাল কমার্স নয় ই-কমার্স
বিগত সরকার তাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ স্লোগান এর মিল রাখতে ই-কমার্সকে ডিজিটাল কমার্স নাম দিয়েছে। যা বিভ্রান্তিকর কারণ সব ডিজিটাল কমার্স নয় কিন্তু সব ই-কমার্স ডিজিটাল কমার্স। তাই সংজ্ঞাটি সঠিক ও স্বচ্ছ হতে হবে। সেটি ই-কমার্স পলিসি ও নিদেশিকায় সংশোধন করতে হবে।
তাছাড়া সারাবিশ্বে ই-কমার্স ও ডিজিটাল কমার্সকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হলেও বাংলাদেশে ‘‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’’ স্লোগান এর সাথে রুপ দিয়ে ই-কমার্স ও ডিজিটাল কমার্সকে এক করে ভুল ধারণা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে নতুন আইন ও নীতি প্রণয়ন ও প্রয়োগে নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া অবৈধ অনলাইন ব্যবসাকে ই-কমার্স হিসেবে উপস্থাপন করার কারণে আজ জুয়া, বাজি, গেম, এমএলএম সবকিছু অনলাইনে করা হচ্ছে ই-কমার্স নামে। এমনকি প্রোডাক্টস সেলিং অপশন নেই এমন ফেসবুক পেইজকে ই-কমার্স হিসেবে গণ্য করে নানারকমভাবে তরুন সমাজকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। তাই ই-কমার্সের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ঠ্য সরকারী বিভিন্ন নথি ও বিধিতে পরিষ্কার করা দরকার।
৬। বাইক রাইডিং সেবা ও প্লাটফর্ম ইকোনমি
বাইক রাইডিং সেবা, ই-ডেলিভারী ও ফুড ডেলিভারী প্লাটফর্মগুলো বিগত ৫ বছরে যেভাবে বিকশিত হয়েছে। সরকারী নীতি ও প্রয়োগের ভুলের কারণে এগুলো নানা সমস্যার মধ্যে পড়ছে। বিশেষ করে বাইক রাইডিং সেবার ক্ষেত্রে বিধিবদ্ধ কোম্পানীগুলোর জন্য নানা বিধি বিধান জারি করলেও যারা খ্যাপ টানে তাদের জন্য কোনো নিয়মের বালাই নেই। ফলে অচীরেই এই ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। তাই ধ্বংসের আগে বাঁচাতে হবে তাদের।
বর্তমানে প্লাটফর্ম ইকোনমির অমিত সম্ভাবনা সত্বেও বিগত সরকারের কিছু নীতির কারণ এই খাতও অচীরেই পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারে। তাই এখনি নীতি-পলিসি সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।
৭) চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
এই দুটো বিষয়ে বিগত সময়ে ধারণাগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে পরিষ্কার করা হয়নি। তাদের কাছে বিষয়গুলো এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে যাতে আসলে নতুন প্রযুক্তির বাজারে বাংলাদেশ পরিণত হয় এসবের উদ্ভাবনের অংশীদার নয়। তাই বিদেশ থেকে রোবট এনে তার মুখে সরকারের প্রশংসা শুনিয়ে উন্নতি দেখানো হয়েছে। যা অত্যন্ত হাস্যকর। অথচ নিজেদের দেশে রোবট তৈরীর জন্য গবেষনা বরাদ্ধ, রোবট মেলা, প্রতিযোগিতা, সরকারী বেসরকারী কাজে রোবটের ব্যবহারের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এভাবে প্রতিটি বিষয়কে বায়বীয় করে তোলা হয়েছে। যা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। অন্তত কর্মসূচী বা প্রকল্পে হাতে নিতে যদি সময়ও লাগে অন্তত ধারণাগুলো পরিষ্কার করতে সেমিনার ও ওয়ার্কশপ এর আয়োজন করতে হবে।
৮) প্রশিক্ষন ও দক্ষতা অর্জন
প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনের নামে যে পরিমাণ অর্থ অপচয় করা হয়েছে তা যদি সঠিকভাবে ব্যয় করা হতো আজ কোনো তরুন বেকার থাকতো না। প্রথম প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শত বছরের পুরনো পদ্ধতির মধ্যে রেখে শুধু সময় আর অর্থ নষ্ট করা হয়েছে। কারিগরি বোর্ডের আইসিটি শিক্ষার মান এতই খারাপ একজন মানুষ ইউটিউব দেখেও তারচেয়ে বেশী শিখতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কাঠামোগত শিক্ষার বাইরে যেসব প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে সেখানে অদক্ষ প্রশিক্ষকসহ নানারকম অনিয়ম দ্বারা সকল অর্থ সাগরে ফেলে দেয়ার মতো হয়েছে। এখানে সিন্ডিকেট করে অর্থ হাতিয়ে নেয়া ছিল মূল উদ্দেশ্য।
তাই এ বিষয়ে গবেষণা করে দেখতে হবে কি ধরনের প্রশিক্ষণ দরকার এবং কাদের জন্য দরকার। প্রকৃত দক্ষদের যুক্ত করে প্রয়োজনীয় বিদেশী ও প্রবাসী বিশেষজ্ঞ দরকার। ব্লকচেইন ও আইওটিতে দক্ষদের যুক্ত করতে হবে। প্রশিক্ষন পরবর্তি মনিটরিং, মেন্টরিং এবং উচ্চতর দক্ষতার জন্য কাজ করতে হবে।
৯) ই-গর্ভনেন্স
ই-গর্ভনেন্স মানে হলো সকল নথি পিডিএফ করা। এটা বাংলাদেশ সংস্করণ। যেসব দেশে ডিজিটাল স্লোগান দেয়নি তাদের চেয়ে বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো ১০০ গুণ খারাপ। বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা বা সব তথ্য এক জায়গায় পাওয়া যাবে মেন একটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম নেই। সরকারী অফিসে কাগজের ছড়াছড়ি। শুধু কাগজের পাশাপাাশি একটা করে ওয়েবসাইট আছে আর আছে সকল নথির পিডিএফ ভার্সণ। এটুকু কাজ করে ডিজিটাল হওয়া যায় না।
তারপর সুরক্ষা এ্যাপ বছরে ৪ মাস বন্ধ থাকে, ডিবিআইডি বন্ধ থাকে ২ মাস, আরজেএসসি সাইটে নানা জটিলতা। সবক্ষেত্রে কোনো কোনো সমস্যা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি আর ৫০০ অ্যাপের নামে হরিলুটের কথা আর না বলি।
একইভাবে রোবটিক্স মানে যদি রোবট ব্যবহার করা বোঝায়। আইওটি মানে এর পণ্য ব্যবহার বোঝায় আর ৪র্থ শিল্প বিপ্লবের মানে যদি বোঝায় যে, এ সংক্রান্ত প্রযুক্তি অন্যরা আবিষ্কার করবে আর আমরা শুধু ব্যবহার করবো তাহলে এসব নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
