আংশিক সংস্কার কতখানি বিপজ্জনক এবং কেন
“যদি শুধু রাজনীতি সংস্কার করা হয়, কিন্তু প্রশাসন না—তাতে সরকারের স্রোতই কর্মক্ষম হবে না, দেশ এক ধরনের ‘জিম্মি’ হয়ে পড়তে পারে।”
১. রাজনীতিতে সংস্কার হলো, কিন্তু প্রশাসনে না হলে:
যদি রাজনৈতিক সংষ্কারের পর নতুন সরকার আসে আর প্রশাসনিক সংষ্কার না হয়। তাহলে পুরো রাষ্ট্র ও সরকার অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এমনকি প্রশাসনের আগের আমলা–ব্যবস্থাই অবশিষ্ট থাকলে—তবে সেই আমলারা নতুন সরকারের নির্দেশ মানবে না, দায়িত্বশীল হবেনা, নিয়োগ–প্রমোশন তাদের স্বভাবতই নিজের মতোই হবে। ফলে নীতি গ্রহণ হলেও বাস্তবায়ন হবেনা। এক অর্থে, রাজনৈতিক সংস্কার শুধু খোলস নয়, কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কার না হলে সেই খোলস ভেতর থেকে ভেঙে পড়বে। এবং সরকার প্রশাসনের কাছে জিম্মি হয়ে যেতে পারে।
২. রাজনীতি ও প্রশাসনের সংস্কার, কিন্তু বিচার সংস্কার না হলে:
এটা বোঝার জন্য অতীতের অনেক ঘটনাই প্রমাণ রয়েছে। “৫ আগস্ট ২০২৫” সরকার পতিত হলো, “৮ আগস্ট ২০২৫” নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এই অল্প দিনের ফাঁকে—পুরনো, দূর্বল বিচারব্যবস্থার কারণে—শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিন হয়ে গেছে।। আপনি বলেছেন, এমন ঘটনা এক নয়, শতশত ঘটেছে। এই কথাই পরিষ্কার করে, বিচার সংস্কার ছাড়া—কোন প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সংস্কারই নিরাপদ নয়।
৩. কাঠামোগত সংস্কার হবে, কিন্তু নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতা না হলে:
এটা হবে খোলসি সংস্কার—রাস্তাটা সেজে উঠবে, কিন্তু পথে পাশবিকতা ও অপরাধ আবার হবে। “সিস্টেমের ভেতর থেকেই সুবিধা লুটবে, তার পর বিদেশে চলে যাবে”।
উদাহরণ: ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হলো—এই বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস হল সৎ মানুষ নয়, যারা কাঠামোর মধ্যে থেকে নিয়ম ভেঙে বিদেশে চলে যায়। কিন্তু নাগরিক উপস্থিতি ও জবাবদিহিতা না থাকলে—ব্যাক্তিগত লাভের দৌরাত্ম্য সিস্টেমকে মধুময় করে তুলে এবং অপরাধ কমবে না, বরং আরও বাড়ে।
৪. রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার হলো, কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা আগের মতোই থাকলে:
এতে “বিদেশ থেকে এক্সপার্ট আনা হবে, কারণ আমাদের শিক্ষক এই খেলা বুঝবে না”—এই অবস্থা তৈরি হতে পারে।দেশের তরুনরা যখন নতুন কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে মিশতে পারবে না, তখন শুধু শূন্যপদই থাকবেনা, বিদেশেী ভাড়া করে আনতে হবে। সরকার চালানোর জন্য। একদিকে নতুন কাঠামো, অন্যদিকে পুরনো শিক্ষার মানুষ—এই দ্বৈরথ দেশের জন্য কেবল সময়ের পরিকাঠামো বিপর্যয় নয়, বৃহত্তর সম্ভাবনার অপচয়ও।
৫. স্বাস্থ্যখাত সংস্কার না হলে অন্য সব খাতে সংস্কার ব্যর্থ হবে:
২০২২–এর হিসেব বলছে—প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য যেতে বাধ্য, আনুমানিক ৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করে।
অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে—এটা গ্রহণযোগ্য না। যদি স্বাস্থ্যখাত উন্নত না হয়, দেশ যেখানে মানুষ রোগ ভোগ করবে, মৃত্যুর ভয়ে দৃষ্টি ঝুঁকে থাকবেন, দেশের মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। অর্থনৈতিক ও সমাজকল্যাণ সত্যিই স্বাস্থ্যখাতের উপর ভিত্তি করে—যদি সেখানেই ফাঁক থেকে যায়, অন্য সকল পদক্ষেপের প্রাণ খসে যায়।
৬. প্রবাসীদের উন্নয়ন নীতি যদি করণীয় না হয়:
প্রবাসীরা “দেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”কিন্তু ঠিকভাবে প্রবাসী উন্নয়ন নীতি না থাকলে—অনেকে বিদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চাবে, আর “সম্পর্কহীন চ্যানেল” ধরে অর্থ পাঠাবে। সরকারের কাছে অর্থের প্রবাহ কমে যাবে। বড় সংস্কার থেকে দেশ প্রতিদিন একটু–আধটু আলগা হয়ে উঠবে, আর গোটা দেশ আগের সে চোর ভিত্তিক অবস্থায় ধাপে ধাপে ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে।
৭. রাজনীতি-সম্পর্কিত আইন, পদ্ধতি, নির্বাচন ও সংসদ কাঠামো পরিবর্তন না হলে:
এক্ষেত্রে “ভঙ্গুর অর্থণীতি ও লুটের রাজনীতি গভীর হতে থাকবে”। যতোই প্রতিবাদ আসুক, যত প্রতিশ্রুতি ঘোষণা হোক—শেষে ক্ষমতায় যারা আসবে তারা আবার লুটপাট চালাতে চাইবে। কারণ কাঠামোটাই অপরিষ্কার, সেখান থেকেই সুযোগ সৃষ্টি হয় লুটের রাজনীতির। তাই এই খাতে সংস্কার না হলে মহাকাল ধরে আমরা ‘ব্যর্থতার’ই পুনরাবৃত্তি করতে থাকবো।
৮. জনগণকে সম্পৃক্ত এবং জবাবদিহিতায় না আনলে:
জনগনকে সম্পৃক্ত ও জবাবদিহিতার মধ্যে না আনলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমবেনা।
আংশিক সংস্কারের আকর্ষণ যেমন হয়, হুমকি ততটাই প্রকট। “কি ক্ষতি ঢেকে আনতে পারে?”—এর উত্তর সরল: এই সংস্কার কেবল কাঠামোগত আবরণ। প্রথমে সব ঠিক মনে হতে পারে, কিন্তু পরেসিস্টেম, অধিকার, সুশাসন, নিরাপত্তা, জনগণ—সব ধ্বংস বা দুর্বল হয়ে যাবে একটি বিপর্যয়ের মূখে পড়বে দেশ।

