ঢাকা দিবস হোক ১৮ আগস্ট বা ১৬ জুলাই বা ১৬ অক্টোবর
বিশ্বের বহু শহরের নামে বিশেষ দিন বা ‘‘সিটি ডে’’ (City Day) পালিত হয়। এগুলো মূলত সেই শহরের জন্ম, প্রতিষ্ঠা, কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা, বিজয়, মুক্তি বা শহরটির বিশেষ কোনো কীর্তির স্মরণে উদযাপিত হয়। অনেক দেশে স্থানীয় সরকার ও নাগরিকরা এই দিনটিকে উৎসব, প্যারেড, কনসার্ট, আতশবাজি, ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করে। এটি সেই শহরের নাগরিকদের জন্য গর্বের ও ঐক্যের একটি দিন।
৮শ বছরের পুরনো শহর, ঢাকা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কতনা ইতিহাস আর গৌরব। ঢাকাবাসীরও রয়েছে নানা নিজস্ব সংস্কৃতি আর গৌরবগাঁথা এসববে স্মরণ করতে ঢাকা দিবস। পালন করা যায় খুব সহজে। কোন দিন হতে পারে সে আলোচনায় যাওয়ার আগে বিশ্বজুড়ে সিটি ডে পালনের যে ঐতিহ্য সেটা নিয়ে আমরা একট আলোচনা করে নিই।
কবে থেকে শুরু?
শহরের নামে দিবস পালনের ধারণাটি ইউরোপ থেকে ব্যাপকভাবে শুরু হয়।
বিশেষ করে রাশিয়ায় ১৯ শতকের দিকে কিছু শহর নিজেদের প্রতিষ্ঠার বার্ষিকী উদযাপন শুরু করে। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের আমলে এটি জনপ্রিয়তা পায় এবং প্রায় প্রতিটি বড় শহর তাদের ‘‘দিন’’ নির্ধারণ করে।
তবে এরও অনেক আগে থেকে, মধ্যযুগীয় ইউরোপে (প্রায় ১৩-১৪ শতক থেকে) শহরগুলোর বিভিন্ন গিল্ড বা চার্টার ডে (Charter Day) উদযাপন হতো, যা আসলে শহরকে রাজা বা ডিউক থেকে প্রাপ্ত বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের দলিল উদযাপন ছিল।
বিশ্বের কতগুলো শহরের নিজস্ব দিবস আছে?
সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন, কারণ এটি প্রতিটি দেশের স্থানীয় সরকার বা পৌরসভা কর্তৃক আলাদাভাবে পালিত হয়। তবুও ধারণা করা হয় —
-
রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলে প্রায় ৫০০-৬০০ শহরের নিজস্ব সিটি ডে আছে।
-
ইউরোপের অন্যান্য দেশে যেমন ইতালি, জার্মানি, স্পেন, যুক্তরাজ্যেও শতাধিক শহর তাদের প্রতিষ্ঠা দিবস বা স্বায়ত্তশাসন দিবস পালন করে।
-
যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি ডে কম দেখা যায়, তবে অনেক শহর তাদের “founder’s day” পালন করে।
-
ভারতেও কয়েকটি শহরের দিবস রয়েছে (যেমন মুম্বাই ডে)।
সব মিলিয়ে ধারণা করা যায়, বিশ্বে প্রায় ১,০০০ এর বেশি শহর তাদের নিজস্ব ‘‘সিটি ডে’’ বা শহর দিবস পালন করে থাকে।
উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ও নেপথ্য কাহিনী
মস্কো ডে (Russia)
সেপ্টেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় শনিবার-রবিবার মস্কো দিবস পালন করা হয়। কারণ ৮৫১ সালে মস্কো শহরের প্রথম লিখিত উল্লেখ (ইপাটিয়েভ ক্রনিকলস)। এই দিবস প্রথম পালিত হয় ১৯৮৭ সালে মিখাইল গর্বাচভের সময়। মূলত, মস্কোর ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নাগরিক গর্ব বাড়ানোর জন্য এই দিন শুরু করা হয়। বিশাল কনসার্ট, আতশবাজি, বিনামূল্যে মিউজিয়াম খোলা হয়।
সেন্ট পিটার্সবার্গ ডে (Russia)
রাশিয়ান শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ এ সিটি ডে বা সেন্ট পিটার্সবার্গ দিবস পালন হয় হয়- ২৭ মে। কারণ, পিটার দ্য গ্রেট ১৭০৩ সালে নেভা নদীর তীরে এই শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রথম এই দিবস পালিতয় সোভিয়েত পরবর্তী সময়ে। ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় আকারে পালন করা শুরু হয়।
এটি ঐতিহাসিকভাবে রাজধানীও ছিল; শহরের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও স্থাপত্যের জন্য এই দিনটি পালনের সিদ্ধান্ত নেন নগরবাসী।
মুম্বাই ডে (India)
প্রতিবছর ১ মে ভারতের বোম্বে তথা মুম্বাই শহরের বাসিন্দারা মুম্বাই দিবস পালন করে। কারণ, ১৯৬০ সালে বোম্বে রাজ্য বিভক্ত হয়ে মহারাষ্ট্র ও গুজরাট হয়, এবং মুম্বাই মহারাষ্ট্রের রাজধানী হয়। যদিও এটি মূলত ‘‘মহারাষ্ট্র দিবস’’, তবু মুম্বাইতে আলাদাভাবে শহরের মর্যাদা উদযাপন করা হয়।
বার্সেলোনা লা মার্সে (Spain)
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ স্পেনের শহর বার্সেলোনা লা মার্সে দিবস পালন করে। বার্সেলোনার পৃষ্ঠপোষক সন্ত ‘‘লা মার্সে’’র নামানুসারে শহর দিবস উদযাপন করা হয়। শুরুতে এটা ধর্মীয় উৎসবের মতোই ছিল বর্তমানে এটা শহর কেন্দ্রিক সংস্কৃতি উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে।
প্রথম শহর দিবস কখন?
ঐতিহাসিকভাবে প্রথম শহর দিবস সম্ভবত মধ্যযুগীয় জার্মানি বা ইতালির চার্টার ডে, যেখানে শহর নিজস্ব আইন বা বাজার বসানোর অনুমতি পেত এবং সেটি বার্ষিক উৎসবে পালন করত। আধুনিক অর্থে ‘‘সিটি ডে’’ (নাগরিক দিবস হিসেবে, মিউজিক শো, আতশবাজি) রাশিয়াতেই সবচেয়ে সুসংগঠিত আকারে শুরু হয়। ১৯৮০-র দশকে মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ, এবং কিয়েভ সিটি ডে’কে বড় নাগরিক উৎসব হিসেবে প্রবর্তন করে।
ঢাকা দিবসের জন্য প্রাচীণ কিছু তারিখ
| তারিখ | ঘটনা | মন্তব্য |
| ১৮ আগস্ট, বা ১৬ জুলাই ১৬১০ | ইসলাম খান চিশ্তী ঢাকাকে (তখন ঢাক্কা) সুবাহ বাংলা’র রাজধানী করেন | ঢাকার আনুষ্ঠানিক রাজধানী হওয়ার দিন |
| ১৭ জানুয়ারি, ১৯০৫ | ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ঢাকা কে নবগঠিত পূর্ব বঙ্গের রাজধানী ঘোষণা করে | আধুনিক প্রশাসনিক ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ |
| ৯ জুন, ১৯৭৬ | ঢাকা সিটি কর্পোরেশন গঠনের আইন পাশ হয় | আধুনিক সিটি প্রশাসনের সূচনা |
১৬ অক্টোবর:
এছাড়া ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর: প্রথম বঙ্গভঙ্গ ও ঢাকার রাজধানীকরণ
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকাকে পূর্ব বাংলা ও আসামের রাজধানী করা হয় । ব্রিটিশ আমলে এটি ঢাকার পুনরুজ্জীবনের সূচনা। যদিও ১৯১১ সালে রাজধানী পুনরায় কলকাতায় সরিয়ে নেওয়া হয়, এই সময়টি ঢাকার আধুনিক নগরায়ণের ভিত গড়ে দেয়।
বিশ্বের হাজারো শহর তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রতিষ্ঠার দিনটিকে নাগরিক দিবস বা ‘‘সিটি ডে’’ হিসেবে পালন করে। এটি শুধু একদিনের আনন্দ নয়, বরং একটি শহরের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গড়ে ওঠা আত্মপরিচয় ও ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ।
যদি ঢাকা দিবস ঘোষণার কথা ভাবি, তাহলে সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক তারিখ হতে পারে: ১৮ আগস্টকারণ ১৬১০ সালের এই দিনে ইসলাম খান চিশ্তী ঢাকা শহরকে মুঘল বাংলার রাজধানী ঘোষণা করেন। এটি থেকে ঢাকার শহররূপে আনুষ্ঠানিক শুরু। তখন থেকে নগররূপে ঢাকা গড়ে ওঠে, দুর্গ, খাজাঞ্চি, সেনাপতি, মসজিদ, বাজার, খাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা পায়। এই তারিখটি ঢাকার রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও নগররূপে জন্মদিন হিসেবে ধরা যায়।
অনেক ইতিহাসবিদও এটিকে ঢাকার “Foundation Day” বলে থাকেন।
এই দিনে যেহেতু ঢাকাকে মুঘল রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এই দিন থেকে ঢাকা আসল শহররূপে বিবর্তিত হতে শুরু করে। ঢাকাবাসী নানা আয়োজনে এই দিন পালন করতে পারে।

