সিঙ্গাপুর উন্নত নগর রাষ্ট্র: আছে কিছু চ্যালেঞ্জ
স্বাধীনতার পর (১৯৬৫) লি কুয়ান ইউ দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশকে নেতৃত্ব দেন এবং সিঙ্গাপুরকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তোলেন। পিপলস অ্যাকশন পার্টি (PAP) ১৯৫৪ সালে লি কুয়ান ইউ, তান চেং লক, টো চিন চায়ে, এস রাজারত্নম এবং আরও কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও শ্রমিক নেতা দ্বারা গঠিত হয়।
দলটি মূলত সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় গঠিত হলেও পরে তারা বাজারভিত্তিক অর্থনীতি ও কঠোর প্রশাসনিক নীতির মাধ্যমে উন্নয়নকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় রূপ নেয়।
সিঙ্গাপুরে PAP প্রায় ৭০ বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে এবং বেশি কিছু কারণে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। যেমন-
অর্থনৈতিক সাফল্য ও স্থিতিশীলতা এর অন্যতম কারণ । PAP-এর উন্নয়নকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা দেশকে সফল করেছে, ফলে সাধারণ জনগণ স্থিতিশীলতার পক্ষে থাকে এবং পরিবর্তনের ঝুঁকি নিতে চায় না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য অনেকেই PAP-কে সমর্থন করে। তবে সেখানকার জনসংখ্যার ৭০% এর বেশী চীনা বংশোদ্ভুত। এই দলের মূল নেতৃত্ব তাদের দ্বারা পরিচালিত। চীনের ভাবধারাও বিদ্যমান। অনেকের ধারণা এই কারণে রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে আরো কিছু কারণ নিয়ে আলোচনা হয়। যেমন-
বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি ও নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বিধিনিষেধ। অভিযোগ রয়েছে যে, বিরোধী দলগুলোর নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা, মানহানির অভিযোগ ও আর্থিক জরিমানা করা হয়, যা তাদের রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, ওয়ার্কার্স পার্টি (WP) এবং সিঙ্গাপুর ডেমোক্রেটিক পার্টি (SDP)-এর বেশ কয়েকজন নেতা আইনি ঝামেলায় পড়েছেন। এবং নির্বাচনী সীমানা (constituency boundary) সরকারপন্থী সুবিধাজনকভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে PAP সবসময় সুবিধা পায়। তাছাড়া নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি স্বাধীন নয়; এটি সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যদিও রাষ্ট্রের উন্নতি সরকারের জনগণ বান্ধব নীতির কারণে জনগনের এসব নিয়ে তেমন মাথাব্যাথাও নেই।
তবে আমদানী নির্ভর দেশটিতে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে মানুষের মাঝে হতাশা আছে। বিশ্লেষকেরা বলেন গণমাধ্যম ও প্রচারের বাধার কারণে সেগুলো দেমন আলোচনা হয়না। কারণ, সরকার-বিরোধী দলগুলোর প্রচারণা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। অধিকাংশ প্রধান গণমাধ্যম (টিভি, রেডিও, পত্রিকা) PAP-এর বা সরকারের নিয়ন্ত্রণে।
অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক মাধ্যমে PAP-এর সমালোচনা করলে ‘ফেক নিউজ’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম’ অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সবচেয়ে বড় কথা হলো- অর্থনৈতিক সাফল্য ও স্থিতিশীলতার কারণে জনগন PAP-এর উন্নয়নকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা দেশকে সফল করেছে, ফলে সাধারণ জনগণ স্থিতিশীলতার পক্ষে থাকে এবং পরিবর্তনের ঝুঁকি নিতে চায় না। এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য অনেকেই PAP-কে সমর্থন করে।
বর্তমান সময়ের সমস্যার মধ্যে রয়েছে:
১. জনসংখ্যাগত সংকট ও জন্মহার হ্রাস
সিঙ্গাপুরের জন্মহার বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন (প্রায় ১.০৫ প্রতি মহিলার গড় সন্তান সংখ্যা, যা টেকসই জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় ২.১ থেকে অনেক কম)। দ্রুত বৃদ্ধিজনিত কারণে কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমছে এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে।
২. উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়
বাড়িভাড়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ পণ্যের মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গড় নাগরিকের জন্য আবাসন ক্রয় ও জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সমস্যা
সিঙ্গাপুরের মতো ছোট দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে, বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে।
বায়ু দূষণ (ইন্দোনেশিয়ার বন দাবানল থেকে আসা ধোঁয়া) এবং প্লাস্টিক বর্জ্য একটি বড় সমস্যা।
৪. ট্রাফিক জ্যাম ও গণপরিবহন চ্যালেঞ্জ
যদিও সিঙ্গাপুরের গণপরিবহন বিশ্বমানের, তবুও ব্যস্ত সময়ের ট্রাফিক জ্যাম ও যাত্রী চাপ বেড়েই চলেছে।
ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা হলেও পরিবহন চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে।
৫. সামাজিক বৈষম্য ও আয়-বৈষম্য
ধনী ও গরিবের মধ্যে আয়-বৈষম্য বাড়ছে।
নিম্ন আয়ের নাগরিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কম এবং সম্পদের অসম বণ্টন রয়েছে।
৬. প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও কর্মসংস্থান
এআই ও অটোমেশনের কারণে অনেক চাকরি হুমকির মুখে।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে সাথে শ্রমশক্তির দক্ষতা উন্নয়নে ঘাটতি রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের সমস্যাগুলো সমাধানযোগ্য, তবে এগুলোর জন্য কার্যকর নীতি ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। উন্নত অবকাঠামো ও সুশাসনের কারণে সিঙ্গাপুর ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম সেরা শহর-রাষ্ট্র, তবে ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়নের জন্য জন্মহার বৃদ্ধি, আয়বৈষম্য হ্রাস, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির সাথে তাল মেলানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সিঙ্গাপুরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আইনি ও প্রশাসনিক বিভিন্ন কারণ- আইনি বিধিনিষেধ। “Public Order Act” এবং “Protection from Online Falsehoods and Manipulation Act (POFMA)” আইন মত প্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে।
অনলাইনে বা জনসম্মুখে PAP-এর সমালোচনা করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণও একটা বিষয়।
সিঙ্গাপুরের অধিকাংশ গণমাধ্যম সরকারের মালিকানাধীন বা সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত। স্বাধীন সাংবাদিকতা কঠিন, কারণ সরকারের অনুমতি ছাড়া বড় ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা যায় না। সরকার দাবি করে যে বিতর্কিত ও চরমপন্থী বক্তব্য রোধ করা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। তাদের মতে, জাতিগত ও ধর্মীয় সংঘাত এড়ানোর নাম করে মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।
PAP মনে করে যে অত্যধিক গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা দিলে দেশে বিশৃঙ্খলা, উসকানি ও অস্থিরতা বাড়তে পারে।
PAP-এর শাসনব্যবস্থা একটি “গাইডেড ডেমোক্রেসি”, যেখানে উন্নয়নকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত রাখার কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে— প্রথমত, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কম থাকে, হরতাল বা বড় ধরনের আন্দোলন দেখা যায় না। উন্নয়ন ও বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ বজায় থাকে।
সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যায় চীনা, মালয় ও ভারতীয়দের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে কিন্তু উস্কানিমূলক বক্তব্য বা বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বন্ধ করার জন্য সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেয়।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ আসে এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত থাকে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত থাকলেও এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক বিকাশ ও স্বাধীন মতামতের সুযোগ সীমিত থাকলে জনগণের অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।

