socail

রাজনৈতিক দলে সাংগঠনিক সংস্কার চাই

রাজনৈতিক দলে সাংগঠনিক সংস্কার: সময়ের অনিবার্য দাবি

রাজনৈতিক দল জনগনের প্রতিনিধি হিসেবে দল একসময় সরকারে পরিণত হয় আর নেতা পরিণত হয় মন্ত্রী বা এমপিতে। গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র হলো রাজনৈতিক দল। একটি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা, নীতি-নির্ধারণ, নেতৃত্ব সৃষ্টি এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে মূলত রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল আজ তীব্র সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্ব সংকট ও অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে জর্জরিত। এর ফলে দলগুলো ধীরে ধীরে জনগণের আস্থা হারাচ্ছে এবং সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলে গভীর ও বাস্তবসম্মত সাংগঠনিক সংস্কার চালু করা সময়ের এক জরুরি ও অনিবার্য দাবিতে পরিণত হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক সংকট: প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
১. কর্মী বাছাইয়ে মানদণ্ডের অভাব: অধিকাংশ দলে আদর্শ, নৈতিকতা বা দক্ষতার ভিত্তিতে কর্মী বাছাইয়ের সুস্পষ্ট নীতিমালা অনুপস্থিত। অনেকক্ষেত্রে অর্থ, পেশিশক্তি বা ব্যক্তিগত আনুগত্যই মুখ্য বিচার্য হয়ে দাঁড়ায়, যার ফলে সৎ ও মেধাবী কর্মীরা প্রান্তিক হয়ে পড়েন।

২. নেতৃত্ব নির্বাচনে যোগ্যতার মানদণ্ডহীনতা: নেতা নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক শিক্ষা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নৈতিক সততা বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যাচাইয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সাধারণত নেই। ফলে অযোগ্য ব্যক্তিও গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন, যা দল ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।

৩. গণতান্ত্রিক কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি: দলীয় কমিটি গঠনে প্রায়ই নির্বাচনের পরিবর্তে উপর থেকে নিয়োগ বা চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি বিদ্যমান। এর ফলে তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়।

৪. এককেন্দ্রিক ও ঊর্ধ্বতন-নিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্তগ্রহণ: দলের প্রধান নেতা বা একটি ছোট গোষ্ঠীর হাতে সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকায় দলীয় গণতন্ত্র পর্যুদস্ত হয়। ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হয় এবং দমনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

৫. নিচ থেকে উপর (বটম-আপ) মতপ্রকাশের ব্যবস্থার অভাব: দলীয় কাঠামো সাধারণত উপর থেকে নিচের দিকে সিদ্ধান্ত প্রবাহের (টপ-ডাউন) ধাঁচে পরিচালিত হয়, যেখানে তৃণমূল সদস্যদরের মতামতের কোনো সুষ্ঠু মূল্যায়ন থাকে না। এতে নেতৃত্ব বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

৬. দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির ঘাটতি: দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডের ব্যর্থতার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পর্যায়কে জবাবদিহি করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে দলীয় শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ দ্রুত ভেঙে পড়ে।

৭. সেকেলে ও অকার্যকর গঠনতন্ত্র: বহু দলের গঠনতন্ত্রই সময়ের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এতে নেতৃত্ব নির্বাচন, ক্ষমতা বণ্টন, তহবিল ব্যবস্থাপনা ও সদস্যদের অধিকার সম্পর্কিত সুস্পষ্ট বিধানের অভাব রয়েছে।

৮. তরুণ ও মেধাবীদের জন্য সুযোগের সংকট: দলগুলোতে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ক্ষমতার বলয়ে অবস্থান করেন, ফলে নতুন ও তরুণ প্রজন্মের উত্থানের পথ রুদ্ধ থাকে।

৯. নিয়মিত কাউন্সিল ও সভা-সমাবেশের অনুশীলনের অভাব: দলীয় সিদ্ধান্তগ্রহণে সর্বোচ্চ ফোরাম হিসেবে কাউন্সিলের ভূমিকা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা নিয়মিত ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয় না।

সাংগঠনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও সমাধানের উপায়
১. আধুনিক ও সময়োপযোগী গঠনতন্ত্র প্রণয়ন: একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপযোগী, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র তৈরি বা সংস্কার করতে হবে, যেখানে নেতৃত্ব নির্বাচন, ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহি ও শৃঙ্খলার ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে।

২. অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা জোরদার করা: দলের সকল স্তরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। ভিন্নমতকে দলীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে আলোচনা ও সমঝোতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

৩. কর্মী ও নেতা নির্বাচনে সুস্পষ্ট মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা: যোগ্যতা, নৈতিকতা, আদর্শিক নিষ্ঠা ও জনসেবার মনোভাবের ভিত্তিতে কর্মী বাছাই এবং নেতা নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি চালু করতে হবে। নেতৃত্বের জন্য শিক্ষাগত ও নৈতিক ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

৪. নির্বাচিত কমিটি ও নিয়মিত কাউন্সিল ব্যবস্থা চালু: দলের সকল স্তরের কমিটি সদস্যদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়মিত সময়ান্তরে কাউন্সিলের মাধ্যমে তৃণমূলের কণ্ঠস্বর শীর্ষে পৌঁছানোর পথ সুগম করতে হবে।

৫. স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক তহবিল ব্যবস্থাপনা: দলের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব রাখা এবং তা প্রকাশের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। অবৈধ অর্থায়ন রাজনীতিকে কলুষিত করে, তাই নৈতিক তহবিল গঠনের নীতি গ্রহণ করতে হবে।

৬. তরুণ ও নারী নেতৃত্বের বিকাশে বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি: দলের বিভিন্ন পর্যায়ে তরুণ ও নারীদের জন্য কোটা সংরক্ষণ, বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং দায়িত্বপূর্ণ পদে তাদের অভিষেকের মাধ্যমে নেতৃত্বে গতিশীলতা আনতে হবে।

৭. জনকল্যাণমুখী ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতির পুনরুজ্জীবন: ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বদলে নীতি, আদর্শ ও জনসেবাকে মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দলের কর্মসূচি ও লক্ষ্য হবে জনগণের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান।

৮. দলীয় শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ নিশ্চিতকরণ: দলীয় সিদ্ধান্ত ও নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং কৃতিত্বের জন্য পুরস্কারের একটি সুষ্ঠু কাঠামো তৈরি করতে হবে।

 একটি দল যদি অভ্যন্তরীণভাবে অগণতান্ত্রিক, স্বচ্ছতাহীন ও জবাবদিহির বাইরে থাকে, তবে সেই দল রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। তাই ক্ষমতা দখলের রাজনীতির পাশাপাশি দল গঠন ও দলীয় গণতন্ত্রের রাজনীতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কেবলমাত্র সংস্কারবান, জবাবদিহিমূলক, আদর্শনিষ্ঠ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলই পারে একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও গণমুখী রাষ্ট্র গঠনের নেতৃত্ব দিতে।

দেশে সামাজিক সংগঠন ওবাণিজ্য সংগঠনের জন্য একাধিক আইন থাকলেও রাজনৈতিক সংগঠন এর জন্য কোনো আইন ও বিধি নেই। ফলে কারা রাজনৈতিক সংগঠন করবে কারা করবে না তার কোনো বালাই নেই। অথচ একটি সাামজিক সংগঠন বা ক্লাব এর জন্য তা আছে। কারা দলের নেতা হবে তাদের মানদন্ড কি হবে সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই। যারা দেশ চালাবে তাদের বেলায়| যাচাই বাছাইয়ের বালাই নেই অথচ একটি পিয়ন নিয়োগ দিতে চলে হাজার রকম যাচােই বাছাই।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply