প্রশ্ন থাকলো

মব জাস্টিস: ইতিহাস, রূপ, কারণ

মব জাস্টিস: ইতিহাস, রূপ, কারণ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

‘মব জাস্টিস’ বলতে আমরা সাধারণত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে জনগণের একাংশের হাতে আইনবহির্ভূতভাবে শাস্তি দেয়াকে বুঝি। এটি ব্যক্তিগত প্রতিশোধ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত ‘গণ-আদালত’ বা ‘সাংবাদিক-বিচার’ পর্যন্ত বিস্তৃত। ইতিহাসে মব জাস্টিস কখনো ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে, আবার কখনো ভয়ংকর নিপীড়নের চিত্র হয়ে উঠে এসেছে।

 মব জাস্টিসের সূচনা

ইতিহাসে মব জাস্টিসের নিদর্শন প্রাচীন রোম ও গ্রীসেও পাওয়া যায়। তবে আধুনিক অর্থে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে আমেরিকার ১৮০০-এর দশকে ‘lynching’ (লিঞ্চিং) নামের এক প্রথার মাধ্যমে। সেখানে আদালতের পরিবর্তে জনগণ মিলিত হয়ে অপরাধী বা সন্দেহভাজনদের গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করত।

 মব জাস্টিসের কারণ

১. বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা
২. ধৈর্যের অভাব ও আবেগপ্রবণতা
৩. রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণ
৪. মিডিয়া বা উসকানিদাতার ভূমিকা
৫. ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা
৬. আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যর্থতা বা পক্ষপাতিত্ব

 ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য কিছু মব জাস্টিসের ঘটনা (বাংলাদেশসহ)

  ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও ১৯৯২ সালের গণআদালত

১৯৯১-৯৬ মেয়াদে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। ১৯৯২ সালে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তারা ‘গণআদালত’ বসিয়ে একাধিক পাকিস্তানপন্থী নেতার প্রতীকী বিচার করে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। যদিও এটি বাস্তব আদালত ছিল না, তবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং কিছু জায়গায় সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী রাজাকার ও বিহারী নিধনের পর সবচেয়ে বড় দুটো মব জাস্টিস এর ঘটনা হলো গণ আদালত ও গণ জাগরণমঞ্চ।

  ২০০৮ সালের লগি-বৈঠা হত্যাকাণ্ড ও   ২০০৯ সালে পিলখানা বিডিআর হত্যাকাণ্ড

২০০৬ সালের নির্বাচনপূর্ব সংকটকালীন সময়ে ঢাকা শহরে আওয়ামী লীগ তাদের কর্মীদের ‘লগি-বৈঠা’ নিয়ে রাস্তায় নামায়। এতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের (বিএনপি) উপর প্রকাশ্যভাবে আক্রমণ ও হত্যা করা হয়। ২৮ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে ঢাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে, যদিও এটা সরাসরি সন্ত্রাসী হামলা এটাকে মবজাস্টিস বলা যায় না সে অর্থে। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে একটি দলের মদদে হয়েছে এবং তারা ক্ষমতায় এসে হত্যাকারীদের নানাভাবে পুরষ্কৃতও করেছে।

বিডিআর সদরদপ্তরে বিদ্রোহের সময় একদল সৈনিক ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে, যার মধ্যে ছিল সেনাপতি পর্যায়ের কর্মকর্তাও। আদালত এটিকে গণহত্যা এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে বিচার করে বহুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে এটিকে অনেকে রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার ফল হিসেবে দেখেন।

এই দটো  ঘটনা যেকোনো দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম। তাই এগুলোও মবজাস্টিস এর মধ্যে পড়ে না। তবে ১৯৯৬ সাল থেকে সরকার পতনের পর সরকার দলের লোকদের উপর দমন নিপীড়ন যেটি পরে ২০০১ ও ২০০৬ সালেও দেখা গেছে। এ ধরনের ঘটনা মবজাস্টিস এর মধ্যে পড়ে।

 ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চ ও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দাবি

জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে দেওয়া আপিলযোগ্য যাবজ্জীবন সাজার বিরুদ্ধে শাহবাগে একদল তরুণ অবস্থান নেয়। এ অবস্থান থেকেই গঠিত হয় “গণজাগরণ মঞ্চ”, যারা ফাঁসির দাবি জানায়। সরকারি মদদে এই আন্দোলনে খাবার, প্রটেকশন, আর্থিক সহযোগিতা পর্যন্ত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকরা এটিকে “সরকার নিয়ন্ত্রিত জনবিচার” বা “পেইড প্রপাগান্ডা” হিসেবে অভিহিত করেন।

এটি একেবারে নগ্ন ধরনের মব জাস্টিস বা মেইড মব জাস্টিসও বলা যেতে পারে। এ সময় সারাদেশে নানা ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

 কাদের মোল্লা ও মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির প্রতিবাদ ও দমন

২০১৩ সালে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা ও মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে সারাদেশে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালীতে  ছাত্রলীগ কর্মীরা জামায়াত মিছিলের উপর গুলি চালিয়ে ৮ জনকে হত্যা করে। বগুড়ায় থানায় ঘেরাওয়ের প্রেক্ষিতে পুলিশ গুলি চালায়, অভিযোগ আছে প্রায় ৬০ জন নিহত হয়। সাতক্ষীরায় মাসের পর মাস ধরে জামায়াত পরিবারের পুরুষদের আটক, নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এখানে প্রথম ঘটনাটি সরাসরি সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরের দুটি আসলে মবকে ছাড়িয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।

হেফাজতে ইসলাম ও শাপলা চত্বর (২০১৩)

হেফাজতে ইসলাম ৫ মে ২০১৩ শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। যদিও তারা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের দাবি করেছিল, সরকার তা “জঙ্গি সমাবেশ” বলে দমন করে।  গভীর রাতে ‘অপারেশন’ চালিয়ে শতাধিক নিহত হয় বলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে অভিযোগ ওঠে। সরকার দাবি করে তারা “হতাহতের তথ্য জানে না।” যদিও হেফাজতের পক্ষ থেকে আক্রমণের অভিযোগ নেই, তবে কিছু মিডিয়া ও সরকারপন্থীরা তাদের “মব” হিসেবে অভিহিত করে। অধিকারের তথ্যমতে হতাহতের সংখ্যা ৬১। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা ৫শ এর বেশী হবে। এটাও মব এর চেয়ে সন্ত্রাসী হামলা বলাই ভাল। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের একটি যথার্থ নমূনা।

পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু ও ‘আয়নাঘর’

২০০৮-২০২4 পর্যন্ত বহু বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়। “আয়নাঘর” নামে একটি গোপন টর্চার সেল-এর কথা উঠে আসে, যেখানে মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর নির্যাতিত হতো। মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন মিডিয়ায় ১০০০+ গুমের তথ্য প্রমাণ উঠে এসেছে।

  শহিদুল আলম ও সামাজিক মাধ্যমে মতপ্রকাশ

২০১৮ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় ছবি ও মতামতের কারণে আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ আছে। একইভাবে অভিনেত্রী কাজী নাভিলা ও সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানও নির্যাতনের শিকার হন, শুধু মতপ্রকাশের কারণে। এটাও সে অর্থে মব নয়। বরং রাষ্ট্র কতৃক নির্যাতন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা কি অভ্যুত্থান ছিল নাকি নিছক জঘণ্য হত্যাকান্ড ছিল। এটা নিয়ে বিতর্ক থেকে যাবে। একই ভাবে ২১ আগষ্ট বোমা হামলাও গ্রহণযোগ্য সুরাহা না হলে এটা নিয়ে বিতর্ক থাকবে।

দেশের প্রেক্ষাপটে মব জাস্টিস কখনো জনবিচারের মুখোশ পরে, কখনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেসব ঘটনা বাস্তবে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ ছিল, সেগুলোকেও অনেক সময় জনরোষ বা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে।

 মব জাস্টিস কোনো রাষ্ট্রের জন্যই শুভ নয়। এটা বিচারবিভাগ, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের ঘাতক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মত প্রকাশ, প্রতিবাদ, বিচার— সবকিছুর জন্য রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামো থাকা উচিত। মব জাস্টিসের সংস্কৃতি কখনো দীর্ঘমেয়াদে শান্তি বা সমাধান বয়ে আনেনা; বরং নতুন সহিংসতার জন্ম দেয়।

সর্বশেষ

২০২৪ এর জাগরণ এর ফ্যাসিবাদের পতন হলে ফ্যাসিবাদের দোষরারা সারাদেশে মবজাস্টিস এর শিকার হয়। তারপর থেকে এটি সবচেয়ে বেশী আলোচিত হয়।

প্রস্তাবনা

১. স্বাধীন বিচার বিভাগ শক্তিশালী করতে হবে
২. আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে
৩. রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বদলে ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে
4. সকল মত ও পক্ষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে

নোট:

* অন্যান্য মব আলাদা লেখায় রয়েছে।

* ২০২৪ এর পরের মব নিয়ে আলাদা লেখা রয়েছে।

 তথ্যসূত্র (সামগ্রিকভাবে)

  • Amnesty International Reports

  • Odhikar.org মানবাধিকার প্রতিবেদন

  • Human Rights Watch

  • আল জাজিরা, বিবিসি, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো

  • ICT Tribunal Bangladesh verdicts

  • “আমার অভিজ্ঞতা”, শহিদুল আলম

  • জনতা ব্যাংক রিপোর্ট (জামাতিদের ব্যাংক জব্দ সংক্রান্ত)

  • মায়ের ডাক – আয়নাঘর রিপোর্ট

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply