জীবন স্মৃতি

জীবন থেকে নেয়া

জীবন থেকে নেয়া

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

রচনাকাল : নভেম্বর ২০১৪

ভালো মন্দ মানুষেরা

আমার ধারণা একজন ভালো মানুষ রাতারাতি খারাপ হতে পারেনা। আবার একজন খারাপ মানুষ হুট করে ভালো হতে পারেনা। এজন্য আমার ক্ষতি করার চেস্টা করলেও আমি চুপচাপ তামাশা দেখতে পারি। কেউ যদি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা কোনো কিছু করতে চায় তাহলে তার বিরুদ্ধে আমি কিছু করিনা, আমি যদি তাই করি আমারটা সত্যি হলেও প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে। বরং অপেক্ষা করি তার কুচক্রি য়ড়যন্ত্র কখন মিথ্যা প্রমান হবে। তাহলে আমার আর কোনো কিছু করার প্রয়োজন হবেনা।

মানুষের মন নোংরা হলে সে সব কিছুতেই দোষ দেখে। মহৎপ্রাণ ব্যক্তিগণকে সবসময় ইতিবাচক মানষিকতা নিয়ে সব কিছুকে বিবেচনা করতে দেখেছি। আমি নিজে মহৎ নই কিন্তু মহৎ মানুষের কর্মকান্ড অনুসরণ করলে যদি কিছু গুণ অর্জণ করতে পারি সেজন্য এটা সবসময় প্রাকটিস করি।

 

শত্রুতার ধারাবাহিকতা

আমার সাথে কেউ হাজারবার শত্রুতা করলে আমি একবারও করার কথা ভাবিনা। আমার কাছে মনে হয় আমি যদি তার সাথে শত্রুতা করি সে যে ভুল ধারণা নিয়ে আমার পিছে লেগেছে সেটা আরো বাড়বে। আর যদি না করি তাহলে একসময় না একসময় তার ভুল ভাঙবে। এবং শত্রুতার অবসান হবে। জীবনে অনেকবার এই পদ্ধতি অবলম্বন কওে সফল হয়েছি।

 

যে যেমনি হোক, আমি আমার মতো

আমি মনে করি যে যেমন হোক আমাকে আমার মতো হতে হবে। আমি ছোটোদের শেখাতাম তুমি একটা লোককে শুধু এই জন্য সালাম দিবানা যে লোকটা তোমার চেয়ে বড় বরং এজন্য সালাম দিবে যে সালাম দেয়াই তোমার কাজ। আমি একটা লোককে শুধূ এজন্য উপকার করবোনা যে লোকটা গরিব, বরং এজন্যও উপকার করবো সমাজের উপকার করা আমার দায়িত্ব। কোনো লোক আমার ক্ষতি করলেও আমি করিনা, কারণ আমি কাজটা পারিনা। জীবনে কোনোদিন কারো বিন্দুমাত্র ক্ষতি করিনি। কারো ক্ষতি এজন্য করিনা যে লোকটা ক্ষতিগ্রস্থ হবে বরং এজন্য করিনা ক্ষতি না করাই আমার ধর্ম। আর আমি আমার খোলস ছেড়ে বের হতে পারবোনা। আমি যা জানি না তা করতে গেলে বরং নিজেই বিপদে পড়বো। আমার এই মানষিকতার জন্য সবাই আমাকে বোকা ভাবে আসলে কি তাই?

মানুষ চেনার সময়

দৈনিক৬ ঘন্টা সময় কাটালে ১ জন মানুষ চিনতে ১ মাস সময় লাগে, দিনের একটা সময় একসাথে কাটালে ৩ মাস, আর নিয়মিত দেখা হলে ৬ মাসে। তবে আমার অতীত জীবনের সব ধারণা বিশ্লেষণ করে আমি উপরের সময় বিন্যাস বের করেছি। এই সময় নিয়ে আমি যাদেও চিনেছি তাদের সম্পর্কে আমার ১% ধারণাও মিথ্যে হয়নি। আমি নিজেই এই পদ্ধতির ফল পেয়ে অবাক হয়েছি। এমন অনেক লোক আছে, যাদের বিষয়ে আমার ভবিষ্যৎবাণী তাদেরকেই অবাক করেছে।

 

দয়ার চেয়ে ইনসাফ গুরুত্বপূর্ণ

আমি দয়া বা করুণা পছন্দ করিনা। আমাকে কেউ করুক তাও না আমি কাউকে করি তাও না। আমার কাছে দয়ার মায়ার চেয়ে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়। আমরা আমাদেও নিকট আত্মীয়র প্রতি দয়া করতে গিয়ে অনেক সময় তার কথায় অন্যকে ভুল বুঝি, তার উপকারের জন্য অন্যের ক্ষতি করি। নিজের বৌ বাচ্চার সূখ শান্তির জন্য রাস্ট্রের অর্থ নস্ট করি, তাতে আমি ভালো বাবা হলেও ভালো মানুষ হতে পারিনা । অথচ আমরা যদি দয়া না বুঝে ইনসাফ বা ন্যায্যতা বা কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায় কোনটা করনীয় আর কোনটা করনীয় নয় তা বুঝতাম তাহলে এ সমস্যাটা থাকেইনা। আমি গরিবকে দান করবো এটা দয়া নয় এটা ইনসাফ।

বিশ্বাস অবিশ্বাস

কোনো মানুষের ভেতর খারাপ কিছু না দেখলে তাকে অবশ্যই বিশ্বাস করবেন। তবে সতর্ক থাকবেন। যদি শতকরা ১ জন মানুষও খারাপ হয় আর সে একজনের ভেতর এই লোকটি পড়ে তাহলে আপনার বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। একটি মাত্র দোষ দেখলে তাতেও একজন মানুষকে খারাপ ভাবিনা। ভুলেও এমনটা হতে পারে। তবে জিনিসটা মনে রেখে দিই। ২টি খারাপ দিক দেখলেও পজেটিভ ভাবার চেস্টা করি  কোনো দূর্বল মুহুর্তে মানুষ ভুল করতেই পারে। তিনটি দোষ দেখলেও একজন মানুষকে খারাপ ভাবিনা, আমাদেও সমাজ ব্যবস্থায় এমনটা হতেই পারে। তবে তৃতীয়বার তাকে খারাপ ভাবে দেখার পর সর্তক হই। চতুর্থবার দেখার পর নজর রাখি, পঞ্চমবার দেখার পর সন্দেহ করি, ৬ নং টাইমে নিজে নিজে একটা সিদ্ধান্ত নেই এবং ৭বার বা ৭ম বার যদি লোকটা সে ধরনের নোংরামী করে তাহলে তার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেই। বেশীর ভাহ সময় যা করি তা হচ্ছে আমি নিজে তার কাছ থেকে সরে আসি। তবে এ ধরনের সমস্যা যদি টাকা পয়সার ব্যাপারে হয় তাহলে প্রথম বারেই লোকটাকে ছোটো  করে দেখিনা । দ্বিতীয়বার দেখার চেষ্টা করিনা। তবে এই সমাজে মনে হয় সবার একটু সতর্ক আর দোষ দেখলে পুরো সতর্ক হওয়া ভাল।

কিছু না করেই শত্রুকে ক্লান্ত করে ফেলা।

আমি সবচে মজা পাই কেউ আমার বিরুদ্ধে নোংরা রাজনীতি করলে। আরো মজা পাই যখন সে বুঝতে পারে আমি জিনিসটা জানি, কারণ সে তখন মনে করে আমিও একই কাজ করছি বা করবো। কিন্তু আমি আসলে কিছই করছিনা। অথচ- আমি তাকে ঠেকানোর চেস্টা করছি অথবা তার বিরুদ্ধে তার মতো কিছু করছি,  এটা ভেবে সে ঘুম হারাম করছে। আর আমি যা কিছুর ধারে কাছে নাই সে সেটাও ভাবছে। ব্যাপারটা খুব এক্সাইটেড। আমি যুদ্ধেও মাঠে নাই আর আমার শত্রু মাঠে আমার কাল্পনিক রুপ কাল্পনিক কৌশল কল্পনা করে নিজে নিজে একা একা যুদ্ধ করছে। নিজেই জিতছে আবার হারছে। নিজেই বিভিন্ন কৌশল বদলাচ্ছে। আবার আমি কৌশল নিচ্ছি মনে করে নিজে নিজে ভয় পাচ্ছে। কি মজা তাইনা। আমি কোনেরাকম যুদ্ধ না করেই তাকে ক্লান্ত করে ফেলছি। বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং নয় কি?

প্রতিশোধ কেন?

আরো একটা মজার ব্যাপার আমার ভেতর প্রতিশোধের স্পৃহাটা কখনো জাগেনা। আমিও নিজেও অবাক হই। কেউ কোনো ইঙ্গিতপূর্ন কথা বললে প্রয়োজন না হলে শুধূ তর্ক করার জন্য তার কথার জবাব দিতে যাইনা। কখনো এমন হয় জীবনে আর জবাব দেবো না। অথবা ১০ বছর পরে দেবো, যদি প্রয়োজন হয়। প্রয়োজন না হলে কখনোই নয়।  কারণ আমি জানি আমি সেটা ভুলবোনা।

ক্ষতির বিনিময়ে ক্ষতি নয়

কেউ আমার ক্ষতি করলে আমি কখনো পাল্টা কিছু ভাবিনা। শত্রতার বদলে কারো সাথে শত্রতা করিনা। এজন্য কেউ আমার ক্ষতি খুব একটা করে না। সাময়িক ভাবে করলেও পরে ভুল বুঝতে পারে। শত্রতার ক্ষেত্রে একই কথা সত্য আমি এজন্য আমার কোনো শত্রু নাই। কারণ সব শত্রু একসময় হাল ছেড়ে বন্ধু হয়ে যায়। এজন্য জীবনে যত জায়গায় ছিলাম, সুনাম ও ভালোবাসা নিয়েই ছিলাম। তবে হ্যাঁ আত্মরক্ষার জন্য একটা কাজ করি। সে কাজটা দিয়ে দুস্কৃতিকারীকে বুঝিয়ে দিই, তুমি যা করছো তা আমিও পারি, আর আমি যদি করি তখন মোটেও বিষয়টা সুবিধার হবেনা। তবে এমনভাবে করি তাতে তার যেন বড়ো ক্ষতি না হয়। এরপরও যদি সে না বুঝে তাহলে তার জন্য আমার কি করার আছে। নেহায়েত বেশী সমস্যা হলে আগের কাজটাই করি। অর্থ্যাৎ আমি নিজেই সওে যাই।

একটি ভালো স্মৃতি

আমি তখন একটি হাই স্কুলে পড়াই, প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ভালো জানতেন সে সুবাদে প্রাথমিক শিক্ষকদের কাব স্কাউট ট্রেনিং-এ আমাকেও রাখলেন। ৭ দিনের ট্রেনিং প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধা ৭টা আবার ৯টা থেকে ১০ পযন্ত গ্রুমিং। প্রতিদিনের ছোট একটা পরীক্ষাও বলা যায়। ৪৫ জন এর মধ্যে সম্ভবত ৩০ জনই মহিলা ছিলেন। আমার এক ক্লাসমেট ‘‘পুতুল’’ও ছিলো সে গ্রুপে, সে প্রাইমারী টিচার, তো প্রাইমারী টিচাররা বিভিন্ন বয়সের ছিলেন ২৫- থেকে ৪০ হবে।

আমি  আবার আগেই স্কাউট লিডারশীফ ট্রেনিং করেছি। সে সুবাদে একটু বেশী পারতাম। তাই সবাই আমার কাছ থেকে শিখতে চাইতো। আমি আবার কোনো বিষয় ভালো বুঝিয়ে বলতে পারি। তো বিরতি টাইমে (৮-৯টা) মহিলা টিচাররা ৫/৭ জনের একটা দল গোল হয়ে আমাদের  মানে পুরুষ টিচারদের বারান্দায় আসতো আর গোল বৃত্তের মধ্যে আমাকে লুকিয়ে তাদের রুমে নিয়ে যেতো। তারা বেশীরভাগই আমার বড়ো বোনোর মতো। তখন আমি তাদেরকে অল্প সময়ে এমনভাবে সেদিনের ক্লাসের বিষয়গুলো বুঝাতাম তাতে তারা খুব সহজে বুঝতো। এটা একদম রুটিন হয়ে গিয়েছিলো।

যেহেতু ৭ দিনের প্রশিক্ষণ তো প্রাথমিক শিক্ষিকাদের বাড়ী থেকে আম, কাঠাল, পিঠা বিরানী, ও রান্না করা খাবার আসতো। নিশ্চই একজনের খাবার এতোজনকে খাওয়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু যার বাড়ী থেকে ্খাবার আসতো। আমারটা মিস হতো না। আমি একটা অংশ পেতামই। এটা সবার কাছে আমার অধিকার হয়ে গিয়েছিল। এবং আমি কাছাকাছি না থাকলে আমার জন্য লুকিয়ে রাখা হতো। অবস্থা এমন দাড়ালে যে আমি তিনবেলা রুটিন খাবারই খেতে পারছিলাম না। কারণ প্রতিদিন ৫/৬ জনের বাসা থেকে বিভিন্ন মুখরোচক খাবার আসতো আর আমাকে তা থেকে কিছু না কিছু খেতে হতো।

এক বড়বোনের কথা এখনো মনে পড়ে । সম্ভবত তার বাড়ী একটু দূরে হবে, কেন না তার বাড়ী থেকে কোনোদিন কোনো খাবার আসেনি। তো শেষদিন বিকেল বেলায় মানে তার পরদিন সকালে আমাদের বিদায়। তিনি আমাকে একপাশে ঢেকে নিয়ে গেলেন। বললেন ভাই আপনাকে সবাই খুব ভালোভাবে অনেক কিছু খাইয়েছে। আমি কিছু খাওয়াতে পারিনি। আমি একটা জিনিস দেবো আপনাকে নিতেই হবে। আপনি না করতে পারবেন না । আপনি আমাদের অনেক উপকার করেছেন।

কারন পড়া না পারলে প্রত্যেককে একটু বিব্রত হতে হতো, আমার কারণে হয়তো ততটা হতে হয়নি। আমি বুঝতে পারছিনা উনি কি দেবে অথবা আমি কি বলবো ? দেখলাম উনি ১০০ টাকার দুটো নোট আমার হাতের মধ্যে গুঁজে দিলেন। খুশিতে আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল, আমার কোনো বড়োবোন নেই। মনে হলো তিনি আমার বড়োবোন, সেদিন সামাজিক ভদ্রতার কারণে তার টাকাটা নিতে পারিনি। আজ মনে হয় নিলে ভালো হতো এক বড়োবোনের  স্নেহের উপহার যত্ন করে রেখে দিতে পারতাম। আজ উনার নামটাও মনে নেই। কোন স্কুলের টিচার ছিলেন তাও ভুলে গেছি, সেদিনের পর কোথাও দেখা হয়নি মোবাইল নাম্বারও নিয়ে রাখিনি। মনে মনে প্রার্থনা করি আপু তুমি যেখানেই থেকো ভালো থেকো।

সময় নিয়ে পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

ঘটনাটি ২০০৫ সালের আর লেখাটি ২০১৪ সালের আর পোস্ট করলাম ২০২৫ সালে।

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply