একটি জাতির জন্ম (প্রথম পর্ব)
মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান
“১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। লেখক ও কবি Mujtoba Ahmed Murshed ফেসবুক প্রোফাইলে ১ টি পৃষ্ঠা ও লেখার প্রথম খন্ড পেলাম একজনের ফেসবুক প্রোফাইলে। লেখাটি হবুহু সংকল করা হলো। এবং লেখার শেষে লিংকটিও দেয়া হলো’’ কারো কাছে পুরো তথ্য থাকলে দিতে পারেন।’’
একাডেমির ক্লাসগুলোতেও সব সময় বোঝানো হতো, আওয়ামী লীগ হচ্ছে ভারতের দালাল। পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্ট করতেই আওয়ামী লীগ সচেষ্ট। এমনকি উদ্দেশ্য- প্রণোদিতভাবেই ক্যাডেটদের শেখানো হতো——- আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন ওদের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্ৰু ।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে মি. জিন্না যে দিন ঘোষণা করলেন, উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা— আমার মতে, ঠিক সে দিনই বাঙালি হৃদয়ে অংকুরিত হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। জন্ম হয়েছিল বাঙালি জাতির। পাকিস্তানের স্রষ্টা নিজেই ঠিক সেদিনই অস্বাভাবিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের ধ্বংসের বীজটাও বপন করে গিয়েছিলেন—— এই ঢাকার ময়দানেই।
এই ঐতিহাসিক নগরী ঢাকাতেই মি: জিন্না অত্যন্ত নগ্নভাবে পদদলিত করেছিলেন আমাদের জনগণের জন্মগত অধিকার। আর এই ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতেই চূড়ান্তভাবে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেলো তার সাধের পাকিস্তান । ঢাকা নগরী প্রতিশোধ নিল জিন্না ও তার অনুসারীদের নষ্টামীর। প্রতিশোধ নিল যোগ্যতমভাবেই। মহান নগরী ঢাকা চিরদিন ছিল মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবিক মুক্তি সাধনের পীঠস্থান। সে এবারও হয়েছে মুক্তির উৎস রূপে – সুপ্রতিষ্ঠিত। সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবার বিশ্বের নির্যাতিত জনতার গর্বের শহর, আশার নগরীরূপে ।
অতিপ্রিয় মাতৃভূমির মুক্তির আশায় ঢাকা নগরীর বীর জনতা সংগ্রাম করেছে বীরত্বের সাথে। সংগ্রাম করেছে হানাদার, দখলদার; দস্যু বাহিনীর বিরুদ্ধে। দস্যু বাহিনীর নৃশংসতা আর হত্যার বিরুদ্ধে শির উঁচু করে রুখে দাঁড়িয়েছে ঢাকার মানুষ। সংগ্রাম করেছে দৃঢ়তার সাথে। বর্বর পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছে এই ঢাকা নরগীতেই। এই বীর নগরীর পবিত্র ভূমিতে ফিরে এসেছি আমি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিনকয়েকের মধ্যেই। বীর নগরীর পবিত্র মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রথমেই আমি এই সংগ্রামী ঢাকা ও ঢাকাবাসীর উদ্দেশে শির নত করেছি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধায়।
পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সপ্তাহ খানেক পরে একজন সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন, সেই দুঃস্বপ্নে ভরা দিনগুলো সম্পর্কে কিছু স্মৃতিকথা লিখতে । আমি একজন সৈনিক। আর লেখা একটি ঈশ্বর প্রদত্ত শিল্প। সৈনিকরা স্বভাবতই সেই বিরল শিক্ষক্ষমতার অধিকারী হয় না। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ছিল এমনই আবেগধর্মী যে, আমাকেও তখন কিছু লিখতে হয়েছিল। কলম তুলে নিতে হয়েছিল হাতে।
ভারত ভেঙে দু’ভাগ হয়ে সৃষ্টি হয়েছিল- অস্বাভাবিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের। আর তার অব্যবহিত পরেই আমরা চলে গিয়েছিলাম করাচি। সেখানে ১৯৫২ সালে আমি পাস করি ম্যাট্রিক। যোগদান করি পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে। অফিসার ক্যাডেটরূপে। সেই থেকে অধিকাংশ সময়ই বিভিন্ন স্থানে আমি কাজ করেছি পাকিস্তানি বাহিনীতে } স্কুল জীবন থেকে পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতা আমার মনকে পীড়া দিতো। আমি জানতাম, অন্তর দিয়ে ওরা আমাদের ঘৃণা করে। স্কুল জীবনেই বহুদিনই শুনেছি আমার স্কুল- বন্ধুদের আলোচনা। তাদের অভিভাবকরা বাড়িতে যা বলতো তাই, তারা রোমন্থন করতো স্কুল প্রাঙ্গণে।
আমি শুনতাম মাঝে মাঝেই, শুনতাম তাদের আলোচনার প্রধান বিষয়: হতো বাংলাদেশ আর বাংলাদেশকে শোষণ করার বিষয় । পাকিস্তানি তরুণ সমাজেই শেখানো হতো বাঙালিদের ঘৃণা করতে। বাঙালিদের বিরুদ্ধে একটা ঘৃণার বীজ উপ্ত করে দেয়া হতো স্কুল ছাত্রদের শিশু মনেই। শিক্ষা দেয়া হতো তাদের বাঙালিকে নিকৃষ্টতর মানব জাতিরূপে বিবেচনা করতে। অনেক সময়ই আমি থাকতাম নীরব শ্রোতা। আবার মাঝে মধ্যে প্রত্যাঘাত হানতাম আমিও। সেই স্কুল ‘জীবন থেকেই -মনে মনে আমার একটা আকাংক্ষাই লালিত হতো, যদি কখনো দিন আসে, তা হলে এই পাকিস্তানবাদের অস্তিত্বেই আমি আঘাত হানবো। সযত্বে এই ভাবনাটাকে আমি লালন করতাম। আমি বড় হলাম। সময়ের সাথে সাথে আমার সেই কিশোর মনের ভাবনাটাও পরিণত হলো। জোরদার হলো। পাকিস্তানি পশুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার দুর্বারতম আকাংক্ষা দুর্বার হয়ে উঠতো মাঝে মাঝেই। উদগ্র, কামনা জাগতো পাকিস্তানের ভিত্তিভূমিটাকে তছনছ করে দিতে। কিন্তু উপযুক্ত সময় আর উপযুক্ত স্থানের অপেক্ষায় দমন করতাম সেই আকাংক্ষাকে।
১৯৫২ সালে মশাল জ্বললো আন্দোলনের। ভাষা, আন্দোলনে আমি তখন করাচিতে। দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন। – পাকিস্তানি সংবাদপত্র, প্রচার মাধ্যম, পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী, সরকারি কর্মচারি, সেনাবাহিনী আর জনগণ সবাই সমানভাবে তখন নিন্দা করেছিল বাংলাভাষার। নিন্দা – করেছিল বাঙালিদের। তারা এটাকে বলতো “বাঙালি জাতীয়তাবাদ। তাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তারা এটাকে মনে করেছিল এক চক্রান্ত বলে। এক সুরে তাই তারা চেয়েছিল -একে ধ্বংস করে দিতে। আহ্বান জানিয়েছিল এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের। কেউ বলতো—- “বাঙালি জাতির মাথা গুঁড়িয়ে দাও। কেউ বলতো— ভেঙে দাও এর শিরদাঁড়া। এর থেকেই আমার তখন ধারণা হয়েছিল, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের পায়ের তলায় দাবিয়ে রাখতে চায়। জীবনের সর্বক্ষেত্রে তারা চায় বাঙালিদের উপর ছড়ি ঘুরাতে। কেড়ে নিতে চায় বাঙালিদের সব অধিকার। একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক রূপে বাঙালিদের মেনে নিতে তারা কুণ্ঠিত |
১৯৫৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলো নির্বাচন। যুক্তফন্টের বিজয় রথের চাকার নিচে পিষ্ট হলো মুসলিম ‘লীগ। বাঙালিদের আশা-আকাংক্ষার মূর্ত প্রতীক যুক্তফ্রন্টের বিজয় কেতন ওড়লো বাংলায়। আমি তখন দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্যাডেট। আমাদের মনেও জাগলো তখন পুলকের শিহরণ। যুক্তফ্রন্টের বিরাট সাফল্যে আনন্দে উদ্বেলিত হলাম আমরা সবাই। পর্বতে ঘেরা অ্যাবোটাবাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমরা বাঙালি ক্যাডেটরা ‘আনন্দে হলাম আত্মহারা। “খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করলাম সেই বাঁধভাঙা আনন্দের তরঙ্গমালা। একাডেমি কাফেটারিয়াল নির্বাচনী বিজয় উৎসব করলাম আমরা। এ ছিল আমাদের বাংলা ভাষার জয়। এ ছিল আমাদের আশা-আকাংক্ষার জয়, এ ছিল আমাদের জনগণের, আমাদের দেশের এক বিরাট সাফল্য।
লিংক: https://www.facebook.com/mujtoba.a.murshed/posts/pfbid02NQ9NQdPUwKoeRPbd7v99u4eHZs1pgBR3zdJtVsSoX7TTopHALS5wt77wrfbRWZKvl

