ই-কমার্স ও ই-কমার্স লজিস্টিকস এর কিছু সমস্যা ও সমাধান
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে লজিস্টিকস পলিসি ২০২৩ ঘোষণা করেছে। প্রায় ২১ উপখাতের দপ্তরসমূহের সমন্বয়ে এই পলিসি বিস্তারিতভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। বিগত দিনের অন্যান্য পলিসির সাথে এই পলিসি বাস্তবায়নে কয়েকটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। তবুও এই পলিসি বাস্তবায়নের জন্য কিছু ঘাটতি রয়েছে সেটা নীতি ও অবকাঠামো দুই ক্ষেত্রে। বিশেষ করে ই-কমার্স খাতে লজিস্টিকস ঘাটতিসমূহ তুলে ধরা হলো।
ই-কমার্স খাতে সংগঠিত আর্থিক সমস্যার সমাধানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরের সমন্বয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি গেটওয়েতে আটকে থাকা গ্রাহকের ৪০৭ কোটি টাকা ফেরত দিতে সক্ষম হয়েছে। কারিগরি কমিটি গঠনের বিষয়টি ২০১৮ সালের ডিজিটাল কমার্স নীতিমালায় অন্তভূক্ত ছিল। একটি নীতিমালা বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ঠ খাতকে সহায়তা করতে পারে এটা হলো তার প্রমাণ।
প্লাটফর্ম ইকোনমি
বর্তমান বিশ্বে রাইড শেয়ার ও স্বাধীন পণ্য ডেলিভারী সেবার মতো প্লাটফর্ম সেবা বিকাশ ও কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের ব্যাপক তরুন জনসংখ্যা এবং চাহিদা থাকা সত্বেও আশানুরুপ বিকশিত হয়নি। বিশেষ প্রান্তিক পর্যায়ে সেবার বিকাশের জন্য যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত হওয়া সত্বেও ক্ষুদ্র সহযোগিতার অভাবে তরুনরা এর সাথে যুক্ত হতে পারছেনা।
ডেলিভারী বাইক
বর্তমানে দেশে ডেলিভারী বাইক বা পেছনে ১৬/১৬/১৬ সাইজের বক্সযুক্ত মোটরবাইক উৎপাদন, আমদানী ও চালনা অনুমোদিত নয়। এতে ই-কমার্স ডেলিভারী সেবা বিগ্নিত হচ্ছে। প্রথমত, রাস্তায় ডেলিভারী খরচ বেড়ে যাচ্ছে দ্বিতীয়ত এখাতে সেবা ও কর্মসংস্থান বিকশিত হচ্ছে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই বাইকটি ই-কমার্স ডেলিভারীর জন্য উৎপাদন, ব্যবহার, আমদানি ও ক্রয় বিক্রয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও এটি দরকার। ই-কমার্স ডেলিভারী খাতে প্লাটকর্মীদের কর্মংস্থান হচ্ছে। এবং এই খাতে ব্যাপক সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রান্তিক পর্যায়
গ্রামীণ সর্ব পর্যায়ের তরুনদের আত্ম কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ঋণের মাধ্যমে বাই-সাইকেল, মোটর সাইকেল, ল্যাপটপ, রিক্সাভ্যান ও ডেলিভারী ভ্যান প্রদান করা গেলে। একদিকে এই পণ্যগুলো দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি হয়ে শিল্পের উন্নয়ন হবে, অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যকর ক্ষুদ্রঋণ দিতে পারবে। এবং আত্ম কর্মসংস্ধান ছাড়াও ই-কমার্স সেবার বিকাশ সাধিত হবে। এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।
ফুলফিলমেন্ট সেন্টার
প্রান্তিক ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যেমন সর্টিং সেন্টার ও ফুলফিলমেন্ট সেন্টার না থাকার করণে ডেলিভারী ব্যয় বাড়ছে এবং লাস্ট মাইল ডেলিভারী মসৃন হচ্ছে না। ডাক বিভাগ, সমূদ্র বন্দর, নৌ-বন্দর, বিমানবন্দরের অবকাঠামো ব্যবহার করে পিপি মডেলে সর্টিং সেন্টার ও ফুলফিলমেন্ট সেন্টার ও পিকিং সেন্টার নির্মানের মাধ্যমে সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রচলিত ডেলিভারী চেইন
দেশের বর্তমান ডেলিভারী চেইন সেকেলে হওয়ার কারণে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সেবার মান নিয়ে গ্রাহক সন্তুষ্ঠ নয়। যেমন পণ্য হারিয়ে যাওয়া, নষ্ট হওয়া, সময়মতো ডেলিভারী না হওয়া এসব সমস্যা খুব নিয়মিত হয়ে পড়েছে। একটি সেন্ট্রাল ট্রেকিং সিস্টেম দ্বারা ডেলিভারী বাহন তথ্য, বাহক বা চালক তথ্য, কোম্পানী ব্রান্ড তথ্য, পণ্য ও সেবার পরিমাণ ও মান তথ্য, ক্রেতা ও বিক্রেতার তথ্য, সময় ও দাম তথ্য ইত্যাদি বিগডেটা ও এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষণ বিশ্লেষণ ও প্রকাশ করার মাধ্যমে। পণ্যের চাহিদা ও যোগান নিশ্চিত করা যাবে। উৎপাদন ও আমদানী লক্ষ্যমাত্র ঠিক করা যাবে।
শিক্ষাক্রম
লজিস্টিক, সাপ্লাই চেইন ইত্যাদি বিষয়ের উপর প্রয়োজণীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে চাহিদা থাকা সত্বেও সেবার মান বাড়ছেনা। তাই জাতীয় শিক্ষাক্রমে এই বিষয়ক শিক্ষা অন্তভূক্ত করা দরকার। দরকার প্রয়োজণীয় প্রশিক্ষণ।
লজিস্টিকস খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার
দেশের লজিস্টিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার আশানুরুপ নয়। ফলে সন্তোষজনক এবং সময়োপোযোগী সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তির মাধ্যমে লজিস্টিক সেবা দিয়ে থাকে। তাদের জন্য প্রণোদনা, কররেয়াত ও পুরষ্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ
লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ ও ঋণ পেতে বর্তমান নীতি যথেস্ঠ সহায়ক নয়। লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ এর জন্য বিনিয়োগ ও ঋণনীতি সংশোধন করা দরকার। লজিস্টিক খাতে সেবা দেয়ার জন্য যন্ত্রপাতি ও পরিবহন আমদানীতে অন্যান্য পরিবহনের মতো করহার অধিক থাকায়। উপকরণ ও বাহনের দাম বেড়ে যায় এবং যার প্রভাব দ্রব্যমূল্যের উপর পড়ে। তাই, লজিস্টিক পরিবহন বা গাড়িসমূহ আমদানীর ক্ষেত্রে করহার সহনীয় করা প্রয়োজন। এতে করে এই খাতের বিকাশ সাধিত হবে।
সড়ক অবকাঠামো
লজিস্টিক চেইন উপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা না থাকায়। লজিস্টিক সেবা সময় ও ব্যয় সাপেক্ষ হয়ে পড়ছে। যেমন কোনো পরিবহন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার এবং আসার একটিমাত্র রাস্তা। যদি একরাস্তায় গিয়ে অন্য রাস্তায় আসা যেত তাহলে সেবা আরো সহজ ও সমন্বিত হতো।
শ্রমিকের নিরাপত্তা
প্রতিবছর লজিস্টিক সেবা দিতে গিয়ে প্রচুর শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এবং অনেক শ্রমিক আহত হয়। এই শ্রমিকদের জন্য ভাতা এবং পরিবারের জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন। বর্তমান শ্রমআইনে বেশকিছু অসঙ্গতি রয়েছে যা সংশোধন প্রয়োজন।
শেষ কথা
বিগত করোনা পরবর্তী সময়ে কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম মূল্য গ্রহণ করে পরবর্তীতে পণ্য সরবরাহ করেনি কিংবা মূল্য ফেরত দেয়নি। ি এই সমস্যার সমাধানে ইতোমধ্যে এসক্রো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এটি গতিশীল নয়। এছাড়া আইসিটি বিভাগের সহায়তায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সেন্ট্রাল লজিস্টিক ট্রকিং প্লাটফর্ম (সিএলটিপি) তৈরীর কাজে হাত দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এসক্রো বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করেছে। এবং এসক্রো নীতিমালা প্রকাশ করেছে। সিএলটিপি বাস্তবায়নে প্রাথমিক প্লাটফর্ম তৈরী করেছে আইসিটি বিভাগ। এটি নিয়ে একটি কনসালটেশন ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে লজিস্টিকস পলিসি ২০২৩ ঘোষণা করেছে। প্রায় ২১ উপখাতের দপ্তরসমূহের সমন্বয়ে এই পলিসি বিস্তারিতভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। বিগত দিনের অন্যান্য পলিসির সাথে এই পলিসি বাস্তবায়নে কয়েকটি কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। তবুও এই পলিসি বাস্তবায়নের জন্য কিছু ঘাটতি রয়েছে সেটা নীতি ও অবকাঠামো দুই ক্ষেত্রে। বিশেষ করে ই-কমার্স খাতে লজিস্টিকস ঘাটতিসমূহ তুলে ধরা হলো।

