সুবাহ বাংলা: একটি বৃহত্তর রাষ্ট্র ব্যবস্থার উত্থান
১৬শ থেকে ১৭শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে বর্তমানের বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওড়িশা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর মধ্যে তৎকালীন এবং অনেকগুলো প্রাচীণ রাজ্য অন্তভূক্ত ছিল। যেমন মগধ, মিথিলাম, ঝাড়খন্ড, উত্তর কলিঙ্গ, মনিপুর, আসাম, আরাকান ত্রিপুরাও অন্তভূক্ত ছিল। এমনকি মধ্যপ্রদেশের কিছু অংশও নাকি এর মধ্যে ছিল। এই রাজ্যটি বিশাল ছিল না ধনে এবং জনে পরিপূর্ণ ছিল।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রদর্মশীতে সুবে বাংলার প্রাচীন মানচিত্র প্রদর্শণ করা হয়। কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দাসংস্থা তাদের সরকারের কাছে সে মানচিত্রের ছবি পাঠিয়ে জানায় যে, ঢাকায় পুরনো সুবে বাংলা প্রতিষ্ঠান ষড়যন্ত্র হচ্ছে মানে পুরনো রাজ্যগুলোকে নিয়ে আবার দেশ গঠনের পরিকল্পনা হচ্ছে। যেসব রাজ্যের বেশীরভাগ এখন ভারতের অংশ। এটা নিয়ে আবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সেদেশের রাজনীতিবিদদের সতর্ক করেছেন। রাজনীতি আর কি?
যাই হোক, এই ঘটনার পর আমি সুবে বাংলা নিয়ে একটু পড়াশোনা শুরু করি। আমার নোটগুলোকে এক করে একটি লেখা তৈরী করে দিলাম।
সুবে বাংলার আগে নাম ছিল। বাংলা সালতানাত যা বিশ্বের একটি প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা ছিল। এটি তার বিলুপ্তির পর এবং যখন এই অঞ্চল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন এই রাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখনো এই বাংলা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চল। মূলত ১৫৭৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই প্রদেশটি মুঘল সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এবং এর প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল ঢাকা বা রাজমহল।
সুবাহ বা সুবে ফার্সি শব্দ এর বাংলা ‘‘প্রতীবর্ণনা’’ বা অন্তবর্তী। পারিভাষিক অর্থ আসলে রাজ্য। যদিও সুবেহ নামে আরবি শব্দ রয়েছে। যার অর্থ সকাল। এমন একটি শব্দ বিভিন্ন ভাষায় থাকতে পারে। স্বভাবতই তার অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হবে।
মুগলরা সমস্ত সম্রাজ্য ১২টি ভাগে ভাগ করে। যেমন অন্যান্য রাজ্যগুলো ছিল কাবুল, লাহোর, মুলতান, দিল্লি, আগ্রা, অবধ, ইলাহাবাদ, বিহার, মালওয়া, আজমির ও গুজরাট। তখন এর প্রতিটি রাজ্যকে একেকটি সুবাহ বলা হতো। একজন মুঘল গভর্নর একটি রাজ্য শাসন করতেন। গভর্নরদের বলা হতো সুবেদার বা সুবাহদার। বাংলা মুঘল সার্বভৌমত্বের অধীনে বাংলার নবাবদের শাসনেও ছিল। সুবাহ বাংলাকে বিভিন্ন সময় “জাতিসমূহের স্বর্গরাজ্য” বলা হয়েছে ইতিহাসে। এশিয়া থেকে ডাচ আমদানির ৪০% হিস্যা ছিল বলে জানা যায়। বাংলার পূর্বাঞ্চল বস্ত্র উৎপাদন এবং জাহাজ নির্মাণের মতো শিল্পে বিশ্বব্যাপী প্রসিদ্ধ ছিল। এই ঐতিহ্য বাংলায় আজো বহমান। এবং এটি রেশম এবং সুতির বস্ত্র, ইস্পাত, সল্টপিটার এবং কৃষি ও শিল্পজাত পণ্যের একটি প্রধান রপ্তানিকারক রাজ্য ছিল। জাহাজ নির্মাণ ও শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল এখানকার আরেক বিখ্যাত দুটো বিষয়।
বাংলা একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। ঢাকায় সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে শহরটিকে তার নামে “জাহাঙ্গীরনগর” নামকরণ করা হয়। ঢাকা মুঘল সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হয়, জানা যায় সাম্রাজ্যের সর্ববৃহৎ রপ্তানি কেন্দ্র ছিল মসলিন বস্ত্রকে ঘিরে। সুবাহ বাংলাকে মুঘল সাম্রাজ্যের “রাজস্বের ভান্ডার” (Granary of Revenue) বলা হতো।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৫৭৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবর মূল বারো সুবাহর একটি হিসেবে বাংলার নাম ঘোষণা করেন। ১৫৮৬ সালের ২৪ নভেম্বর এক রাজকীয় সমন দিয়ে সম্রাট আকবর পুরো সাম্রাজ্যে একসাথে সুবাহ প্রশাসন চালু করেন। ১৫৭৬ থেকে ১৭১৭ সাল এই সময়টাতে বাংলা মুঘল সুবেদার দ্বারা শাসিত হয়। রাজপরিবারের সদস্যগণ প্রায়ই এই পদে নিযুক্ত হতেন। সুবেহদারের সঙ্গে থাকতো দিওয়ান (আর্থিক দপ্তরের প্রধান), বখ্শি (সেনাপতি), সদর–এ–সদুর (ধর্মীয় ও দানখয়রাত বিষয়ক কর্মকর্তা) তবে এলাকাগুলোতে তারা মসজিদ স্থাপন করতেন এবং ফকির ও ধর্মপ্রচারকদের সমীহ করতেন। আর সাম্প্রদায়িত সম্প্রীতি রক্ষা করতেন। সুবাহ বাংলার সুবেদাররাই পরবর্তীতে স্বাধীন নবাবি শাসন যা Murshid Quli Khan থেকে শুরু হয় এবং নবাব সিরাজ উদদৌলাকে দিয়ে শেষ হয়।
১৬১০ সালের ১৮ আগষ্ট মুঘলরা বাংলার ঢাকাকে সুবেহ বাংলার রাজধানী ঘোষণা করে এবং তারা ক্রমশ এখানে নান্দনিক বাগান, দুর্গ, সমাধি, প্রাসাদ ও মসজিদ নির্মাণের মধ্য দিয়ে নগর গড়ে তোলে। যদিও তার আগে রাজধানী ছিল রাজমহল (Rajmahal), এবং নবাবী আমলে তা মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হয়।
১৬৬৬ সালে চট্টগ্রামে মুঘলেরা যুদ্ধে জয় লাভ করে আরাকান রাজ্য দখল করে এবং বন্দর নগরীর নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নিয়ে নেয়, যার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল ইসলামাবাদ। বাংলাদেশে ঈদানিং এটা নিয়েও চর্চা হয়।
জোওো ডি ব্যারোসের মতে, ভালো গোলন্দাজ বাহিনী থাকার কারণে আরাকান ও ত্রিপুরার চেয়ে বাংলার সেনাবাহিনীর সামরিক আধিপত্য বেশি ছিল। বাংলার সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কামান ছিল। বাংলা ইউরোপে বারুদ এবং শোরার (সল্টপিটার) বড় রপ্তানিকারক ছিল। মুঘল সেনাবাহিনী ইদ্রাকপুর দুর্গ, সোনাকান্দা দুর্গ, হাজীগঞ্জ দুর্গ, লালবাগ দুর্গ এবং জঙ্গলবাড়ী দুর্গ সহ এই অঞ্চল জুড়ে অনেক দুর্গ তৈরি করে। মুঘলরা আরাকানি এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করে।
অধ্যাপক রিচার্ড ইটন জানান যে, বাংলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যগুলি এর মাটিকে এতটাই উর্বর এবং জলবায়ুকে অনুকূল করে তুলেছিল যে এটি মহাদেশব্যাপী তুর্কি-মঙ্গোল বিজয় ও অভিবাসন প্রক্রিয়ার একটি শেষ বিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।
সুবেহ বাংলা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ একটি রাজ্য, যা প্রশাসনিকভাবে সংগঠিত হয়ে অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। হয়তো নদীবাহিত হওয়ার কারণে একদিকে পলিগঠিত উর্ভরভূমি অন্যদিকে নদীপথে যোগাযোগের সুবিধা। আর একই কারণে এখানে জনসংখ্যাও ছিল প্রচুর।
আপনি এই অঞ্ছলের বাসিন্দা হয়ে থাকলে যদি এরকম এই অঞলটি আবার পুরো একটা স্বাধীন দেশ হয়ে তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এমন একটা স্বপ্ন সুখ কল্পনা কারো আসতে পারে। এমনটা হামেশাই হয়। কিছু মানুষ অখন্ড বাংলা স্বপ্ন দেখেন কিছু মানুষ অখন্ড ভারতের স্বপ্ন দেখেন। কিছু মানুষ রামরাজ্য পূণপ্রতিষ্ঠার কাল্পনিক সুখ লাভ করেন। কিছু আবার তুর্কি সালতানাতের সুখ স্বপ্ন দেখেন।
যদিও এগুলো হয়তো আর সম্ভব নয়। ভাঙ্গা গড়ার নতুন অনেক কিছু হতে পারে। কিন্তু পুরনোতে ফিরে যাওয়ার আশংকা সম্ভাবনা আর নেই বললেই চলে।
বলা বাহুল্য: ব্রিটিশ সরকারের বাংলা প্রেসিডেন্সীর ক্ষেত্রফল আরো বড় ছিল। এই বিষয়ে অন্য লেখায় আলোচনা করবো।
সূত্র: ইউপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, iiab.me
ছবি: ইন্টারনেট

