সামাজিক ও অলাভজনক সংগঠন: ব্যক্তিগত ও পেশাগত নেটওয়ার্ক তৈরী
সামাজিক বা অলাভজনক সংগঠন বলতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বোঝায় যারা মুনাফা অর্জনকে প্রধান লক্ষ্য না রেখে সামাজিক কল্যাণ, উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিবন্ধী সহায়তা, পরিবেশ রক্ষা বা কমিউনিটি সার্ভিসের মতো কাজগুলোকে প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য বানায়। এ ধরনের সংগঠনগুলোর মূল জিনিস হলো — আয় থাকলে সেটি পুনরায় কার্যক্রমে বিনিয়োগ করা হয়, প্রতিষ্ঠাতা বা সদস্যদের ব্যক্তিগত লভ্যাংশ দেয়া হয়না। কিন্তু আপনি কীভাবে এগুলোর মাধ্যমে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বাড়ানো যায়। সেটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
কেন সামাজিক সংগঠন গঠন করা হয়
অলাভজনক সংগঠন গঠনের মূল কারণগুলো সাধারণত: একটি সামাজিক সমস্যা সমাধান করা (শিক্ষা/স্বাস্থ্য/দারিদ্র্য), জায়গাভিত্তিক কমিউনিটি চাহিদা মেটানো, একটি পেশাজীবী বা শিল্পের স্বার্থ রক্ষা ও উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক/খেলার কার্যক্রম চালানো, জরুরি দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবামূলক সেবা দেওয়া, এবং নীতিনির্ধারণে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানো। কখনও কখনও নেতৃত্বেরা ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শন বাস্তবায়নের জন্যও সংগঠন গড়ে তোলেন—যার ফল সমাজে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসে।
কারা যুক্ত হয় এসব সংগঠনে সদস্য ও অংশীজন
এসব সংগঠনে যুক্ত হন: স্থানীয় বাসিন্দা ও জনগোষ্ঠী, স্বেচ্ছাসেবক তরুণ ও শিক্ষার্থী, পেশাজীবী (চিকিৎসক/শিক্ষক/ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি), সমাজকর্মী, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী যারা সিএসআর ও সমাজ সম্মান লাভে আগ্রহী, এবং অনুদানদাতা ও দাতা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরাও থাকেন। নেতৃত্বে থাকেন বোর্ড মেম্বার, নির্বাহী কমিটি ও ফিল্ড স্টাফ—কিন্তু কার্যকরীতায় স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ক্লাব, পেশাজীবি সংগঠন ও উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোতে তরুন ও নবীন পেশাজীবি উদ্যোক্তারা যুক্ত হলে তাদের সাথে নতুন নতুন দক্ষ ও সফল মানুষদের সাথে পরিচিতি ঘটে। তারা সেখান থেকে অনেকে চাকরী পায়, অনেকে কর্মী খুজে পায়। কেউ ক্রেতা পায় কেউ বিক্রেতা পায়। হয়তো একজন ভাল আইডিয়া খুজে পায় আরেকজন তার কাংখিত বিনিয়োগকারী খুজে পায়। আর কিছু না পেলেও তথ্য ও জ্ঞান সবাই সবার কাছ থেকে পায়।
কিভাবে কাজ করে — প্রধান কাঠামো ও অর্থায়ন
অধিকাংশ অলাভজনক সংগঠনের সাধারণ কাঠামো থাকে—সাধারণ সভা/জেনারেল বডি, পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ড, নির্বাহী/সমন্বয়কারী দল, আর মাঠে কাজ করার জন্য কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক। অর্থায়ন সূত্র: সদস্যতা শুল্ক, অনুদান (দাতার সংস্থা/আন্তর্জাতিক ফান্ড), কর্পোরেট সিএসআর, সরকারি গ্রান্ট, মার্কেট-বেজড আয় (ট্রেনিং ফী, সার্ভিস চার্জ), আয়োজন ও ফান্ডরেইজিং ইভেন্ট। কার্যক্রম পরিকল্পনা (project design), বাজেট, রিপোর্টিং, মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশন—এসব নিয়মকানুন মেনে চলা হয় যাতে ফান্ডিং/ট্রাস্ট বজায় থাকে।
বাংলাদেশে অলাভজনক সংগঠনের প্রধান প্রকারভেদ (সংক্ষেপে)
বাংলাদেশে সংগঠনগুলো ভিন্ন লক্ষ্য ও পরিধি অনুযায়ী ভাগ করা যায়—এগুলোর মধ্যে প্রধানগুলো:
-
কমিউনিটি ক্লাব (Community Clubs): স্থানীয়—পাড়া/মহল্লা ভিত্তিক; সাংস্কৃতিক, খেলাধুলা, শিক্ষা ক্লাস, গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প ইত্যাদি পরিচালনা করে। সাধারণত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক বা যুবক-তরুণেরা এগুলো চালায়।
-
সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন (Local NGOs / Volunteer Groups): গ্রামীণ উন্নয়ন, নারীশক্তিকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগসহায়তা ইত্যাদি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ট্রেনিং, কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও অনুদানভিত্তিক প্রকল্পে কাজ করে।
-
পেশাজীবী ও নেটওয়ার্ক-ভিত্তিক সংগঠন (Professional Society, Networks): নির্দিষ্ট পেশার (ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক) সংগঠন; ক্রেডেনশিয়ালিং, পেশাগত নীতি, সেমিনার, বিএলডি ইত্যাদি করে। সদস্যরা পেশাগত নেটওয়ার্ক ও সিআরপি পায়।
-
বাণিজ্য সংগঠন/ট্রেড বডি (Trade Bodies / Chambers): বাণিজ্যিক প্রতিনিধিত্ব ও লবিং, বাজার তথ্য, ট্রেড ফেলোশিপ—ব্যবসায়ীদের দ্বারা পরিচালিত এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করে।
-
আন্তর্জাতিক ক্লাব ও সার্ভিস ক্লাব (Rotary, Lions ইত্যাদি): আন্তর্জাতিক ফ্র্যাঞ্চাইজ—স্থানীয় ক্লাবগুলো আন্তর্জাতিক প্রজেক্টে অংশ নেয়, নেটওয়ার্ক ও রিসোর্স শেয়ার করে।
-
ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন ও ফিলানথ্রপি সংগঠন: বড় অনুদানদাতা/টেকঅ্যাবলস; দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ও গবেষণা সমর্থন করে।
-
সমবায় ও কো-অপারেটিভ: সদস্য-ভিত্তিক আর্থ-সামাজিক উদ্যোগ; মাইক্রোফাইন্যান্স/কৃষি/বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে।
- থিংক ট্যাংক ও সিভিলি সোসাইটি সংস্থা: সরকার, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে এই সংস্থাগুলো নানারকম গবেষণা, জরিপ চালায় এবং সরকারকে পরামর্শ দেয়। কখনো কখনো সমালোচনাও করে।
- অন্যান্য: এছাড়া রয়েছে মানবাধিকার ও আইনি সেবা সংস্থা, ট্যুরিজম ও পরিবেশ বাদী সংগঠন, ফটোগ্রাফি ও ডিবেট ক্লাব, স্পোর্টস ও শারিরীক সযত্ন ক্লাব ইত্যাদি। সকল সংগঠনের পরিচালনা ও সদস্যতা ভিন্ন—কমিউনিটি ক্লাব বেশি সামাজিক/ঐতিহ্যগতভাবে চালু থাকে; পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সদস্যরা যাচাইপ্রাপ্ত পেশাজীবী; ট্রেড বডি ও ফাউন্ডেশনগুলোর লিডারশিপে ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট থাকে।
এসব সংগঠনের মাধ্যমে কী সুফল পাওয়া যায়?
যারা মানুষের সাথে মিশতে পারে এবং সঠিক ক্রেতা বিক্রেতা আইডিয়া বা বিনিয়োগকারীকে খুজে তার সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারে। তাদের জন্য এসব সংগঠন দারুন কাজের।
সংগঠনের মাধ্যমে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই সুবিধা পেতে পারে। সামাজিকভাবে মানুষের মাঝে বিশ্বাস ও সামাজিক পুঁজি (social capital) গড়ে ওঠে; ব্যক্তিগতভাবে—নেতৃত্বের দক্ষতা, পাবলিক স্পিকিং, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, রিসোর্স আনয়ে অভিজ্ঞতা লাভ হয়; পেশাগতভাবে—ক্যারিয়ার লিংক, ক্লায়েন্ট রেফারেল, প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট, অংশীদারিত্বে কাজের সুযোগ আসে; সংস্থার জন্য—ব্র্যান্ড ভ্যালু, অনুদান/গ্র্যান্ট জেতার ক্ষমতা ও নীতিগত প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
কিভাবে এসব সংগঠনে নেটওয়ার্ক তৈরি করে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা ও নেটওয়ার্ক বিস্তার করবেন?
১) লক্ষ্য নির্ধারণ: আপনার উদ্দেশ্য স্পষ্ট রাখুন—জ্ঞান বাড়ানো, ক্লায়েন্ট খোঁজা, বা নেতৃত্বে আসা?
২) স্ট্র্যাটেজিক সিলেকশন: আপনার লক্ষ্য অনুযায়ী ২–৩ টাইপ সংগঠন চয়েস করুন (উদাহরণ: পেশাজীবী অ্যাসোসিয়েশন + স্থানীয় কমিউনিটি ক্লাব)।
৩) নিয়মিত উপস্থিতি: মিটিং, ওয়ার্কশপ ও ইভেন্টে নিয়মিত যান—প্রতিটি ইভেন্টে কল্পিত “১টি স্পষ্ট উদ্দেশ্য” নিয়ে অংশগ্রহণ করুন (নতুন ২জনের সাথে পরিচয়, কোনো সদস্যকে সাহায্য করা ইত্যাদি)।
৪) ভলান্টিয়ারিং ও কাজ করে দেখান: ছোট প্রজেক্টে সক্রিয় অবদান দিন — এই কাজই আপনার দক্ষতার সরাসরি প্রমাণ।
৫) প্রদর্শনমূলক মূল্য যোগ করুন: মিনি-ট্রেনিং, রিপোর্ট, কেস-স্টাডি প্রকাশ করুন—মানুষ যেটা পায় পছন্দ করে।
৬) অনলাইন প্রোফাইল ও ফলো-আপ: ইভেন্টের পরে ব্যক্তিগত কাস্টমাইজড মেসেজ পাঠান; লিংকডইন ও ফেসবুক গ্রুপে আপডেট দিন।
৭) নেতৃত্বগ্রহণ: সময় হলে কমিটি/পজিশনে দাঁড়ান—ট্রাস্ট বিল্ডিং দ্রুত ঘটে।
৮) পরিমাপ ও রেকর্ড: আপনার নেটওয়ার্কিং কার্যকলাপ ট্র্যাক করুন—কতজন নতুন পরিচিতি, কতজনকে আপনি সাহায্য করেছেন, কতজন পরে সুযোগ দিয়েছে ইত্যাদি।
এসব থেকে পরোক্ষভাবে ব্যবসা বের করার উপায় (নৈতিকভাবে ও কার্যকরভাবে)
-
রেফারেল ও লোকাল ট্রাস্ট থেকে ক্লায়েন্ট আসে—কাউকে কখনো সরাসরি চাপ দিবেন না; সম্পর্ক গড়তে সময় দিন।
-
প্রজেক্ট-বেজড পেমেন্ট: এনজিও/ট্রেড বডি প্রায়ই কনসাল্ট্যান্ট, প্রশিক্ষক বা সার্ভিস প্রোভাইডার চান—প্রস্তাব দিয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন।
-
CSR বা যুগ্ম উদ্যোগ: কর্পোরেট-এনজিও পার্টনারশিপে সেবা বা পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন।
-
মার্কেট রিসার্চ ও ক্রায়েন্ট ইনসাইট: কমিউনিটি-ভিত্তিক কার্যক্রমে রিয়েল-ওয়ার্ল্ড ডাটা মেলে—এটা নতুন সার্ভিস/প্রডাক্ট তৈরি করতে কাজে লাগে।
-
ব্র্যান্ডিং ও পাবলিসিটি: সমাজসেবা করে পাবলিকিটি মেলে—পরবর্তীতে গ্রাহক-বিশ্বাস বাড়ায়।
বিঃদ্রঃ সবসময় সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখুন—সংগঠনের নৈতিকতা লঙ্ঘন করে ব্যবসা করা বিপজ্জনক ও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
সংক্ষিপ্ত কাজের পরিকল্পনা (৩ ধাপ) — শুরু করার জন্য
১) ম্যাপিং: আপনার এলাকায় বা আপনার সেক্টরে অনলাইনে ৫টি উপযুক্ত সংগঠন তালিকাভুক্ত করুন।
২) একাউন্টেবিলিটি: ৩ মাসের জন্য স্বেচ্ছাসেবক/ইভেন্টে অংশ নিন এবং নিজের ৩টি অর্জন লিপিবদ্ধ করুন।
৩) প্রপোজাল: ৬ মাসে একটি ছোট পেইড সার্ভিস বা কর্মশালা প্রস্তাব করুন—এর রেজাল্ট রিপোর্ট করে অনুকূল রেফারেল নিন।
সামাজিক ও অলাভজনক সংগঠনগুলো সম্পর্কে আমাদের দেশের ধারণা এরা শুধু ঋণ দেবে আর নানা সামাজিক কাজ করবে। বিদেশ থেকে টাকা এনে গরিবদের ঋণ দেবে। আসলে তা নয়। যেসব দেশে এসব সমস্যা নেই। সেসব দেশে সামাজিক আরো অনেক বেশী। বিশেষ করে নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং অন্তমূখী স্বভাব দেখে মিশুক স্বভাবে রুপান্তরের জন্য এগুলো কোটি টাকার ওষধের চেয়ে বেশী কার্যকর।
এগুলো জ্ঞান অর্জন, দক্ষতা উন্নয়ন, নেটওয়ার্ক গঠন এবং পরোক্ষভাবে পেশাগত/বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করার শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। নৈতিকতা ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে, সুবিধাভোগীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে, পরিকল্পিতভাবে অংশগ্রহণ করলে এগুলো আপনার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন দুটোই সমৃদ্ধ করতে পারে।
