সংষ্কার ও দাবী আদায়ে প্রয়োজন জোট গঠন
বাংলাদেশে কোনো দলের একক জনপ্রিয়তা নেই এবং এই মুহুর্তে তা হওযার সম্ভাবনাও নেই। তাই বেশীরভাগ মানুষের মতামতকে এক জায়গায় করতে হলে জোট গঠন অপরিহার্য। বাংলাদেশের অতীতের সকল নির্বাচনে জোট গঠন করা হয়েছে। কৌশলগত জোট নির্বাচনী জোট, সমর্থন কৌশল বিভিন্নভাবে জোটবদ্ধ নির্বাচন করা হয়েছে।
৭৩/৭৮ এর নির্বাচনে সমমনা দল ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে এক তরফা নির্বাচনের সমর্থন নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ৮৬ এরশাদ পাতানো নির্বাচন দিয়েছে তাও নির্বাচনে সমযোতার মাধ্যমে কয়েকটি বিরোধী দলকে আনতে হয়েছে। ৯১ সালে বিএনপি জামায়াত কৌশলগত ঐক্য ছিল। ৯৬ তে সরকার গঠনে আওয়ামী লীগকে জাপার সমর্থন নিতে হয়েছে। ২০০১ সালে জোটবদ্ধ নির্বাচন ছাড়া শরীক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না হওয়ার আশংকা ছিল। ২০০৮ সালে ১৪ দল গঠন করতে হয়েছিল। এরপরের নির্বাচনগুলো ডামি হওয়া সত্বেও ১৩টি দলকে জোর করে বা লোভ দেখিয়ে জোটবদ্ধ রাখতে হয়েছিল।
বর্তমানে (২০২৫/২৬) সালে নির্বাচন হলে কে ভোটে জিতবে সেটা পরের বিষয়। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে দাবী আদায়ের জন্য জোট অপরিহার্য। এখানে ৩ দফায় ৩ ধরনের জোট হতে পারে বা হবে বা হওয়া ভাল।
প্রথম দফা জোট:
ক) যারা সংষ্কার চায় তাদের জন্য ‘‘জাতীয় সংষ্কার জোট’’ এখানে তারা সংষ্কারপন্থী সব দলকে এক করে কোন কোন জায়গায় কি কি সংষ্কার চায় তা তুলে ধরতে হবে। তারা নিজেদের মধ্যে এই বিষয়ে লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হবে।
খ) ভোটাধিকার জোট: যারা সংষ্কার চায়না ভোট চায়। সেসব দলকে নিয়ে ভোটাধিকার জোট গঠন করতে হবে। তারা এই বিষয়ে এই মর্মে চুক্তিতে আবদ্ধ হবে যে, তারা যখনি নির্বাচনে দাড়াবে তখন জনগনকে ভোটে জিতে সংষ্কারের প্রতিশ্রুতি দেবে এবং সে অনুযায়ী রুপরেখা প্রকাশ করবে। এবং ভোটে জিতলে রুপরেখা অনুযায়ী সংষ্কার করবে।
দ্বিতীয় দফা জোট:
ভোটের হাওয়া বা তফসিল শুরু হলে নির্বাচনী জোট হতে পারে। তখন নতুন মেরুকরণ হতে পারে। তাতে কোনো দল যোগ ও বিয়োগ হতে পারে। এখানে চুক্তি হবে এবং জনগনকে ভোটে জিতে সংষ্কারের প্রতিশ্রুতি দেবে এবং সে অনুযায়ী রুপরেখা প্রকাশ করবে। এবং ভোটে জিতলে রুপরেখা অনুযায়ী সংষ্কার করবে।
তৃতীয় দফা জোট:
নির্বাচনের পরে বিজিত দলগুলো একটি জোট সরকার গঠন করতে পারে। এখানেও তারা চুক্তিবদ্ধ হয়ে প্রতিশ্রুত সংষ্কার বাস্তবায়ন করবে।
প্রথম দফা জোট না হলে কি হবে?
১) একে অন্যের বিরুদ্ধে মন্দ কথা বলবে। জাতীয় ঐক্য নষ্ট হবে। সন্ত্রাসী লুটেরা এটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে।
২) একজন আরেকজনের প্রতিপক্ষ হয়ে গেলে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গোপন শত্রুর সাথে হাত মেলাতে পারে।
৩) একতা না হলে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় মনোযোগ দিতে পারবে না। এতে করে রাষ্ট্র ঠিকভাবে চলবেনা। এবং সর্বত্র বিশৃংখলা দেখা দেবে।
৪) রেষারেষি চলতে থাকলে শত্রুতা কঠিন আকার ধারণ করতে পারে। সংঘর্ষ তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৫) সন্ত্রাসী গোষ্ঠি কোনো তৃতীয় পক্ষের ছদ্মবেশে মাঠ দখল করে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
জোট কেন প্রয়োজন
১) জোট ছাড়া একক ভাবে জনমত গঠন করা সম্ভব নয়।
২) জোট ছাড়া দাবী আদায় সম্ভব নয়।
৩) জোট ছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে দমন করা সম্ভব নয়।
৪) জোট না হলে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
৫) জোট না হলে ঝুলন্ত সরকার হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
সংষ্কারপন্থী বা ভোটাধিকার ভিত্তিক জোট হলে কি হবে?
১) একটি জাতীয় ঐক্য তৈরী হবে। সংষ্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরী হবে।
২) নিজেদের মধ্যে চুক্তি হবে। চুক্তি রক্ষার জন্য আচরণ দায়িত্বশীল হবে।
৩) চুক্তির কারণে মাঠ পর্যায়ে দলগুলোর কর্মীদের মধ্যে ঐক্য তৈরী হবে। রাজনৈতিক সংঘাত কমে আসবে।
৪) একটি সুস্থ্য ও সুন্দর রাজনৈতিক ঐক্য পতিতদের ফিরে আসা ঠেকাতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।
৫) ভবিষ্যত বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কিভাবে এই জোট গঠন করতে হবে?
১) কিছু গ্রহণযোগ্য ও ইতিবাচক মানুষ উদ্যোগ নিয়ে সাম্ভাব্য দলগুলোর প্রতিনিধিকে প্রস্তাব দিবে। এবং একটি খসড়া চুক্তিপত্রের কপি জমা দেবে।
২) প্রাথমিক আলোচনা শুরুর পর এক দল অন্য দলের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয়া বন্ধ করবে।
৩) বিভিন্ন দলের সব লোক মিডিয়াতে কথা না বলে এক বা একাধিক মূখপাত্র ঠিক করবে। তাদের বক্তব্য দলের অফিসিয়াল বক্তব্য হিসেবে ধরা হবে। অন্যদেরটা নয়।
৪) সবাই একমত হলে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা ঘোষনা করা হবে। একটি যৌথ কমিটি হবে যাতে সকল দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে। প্রয়োজনে দুটি কমিটি হতে পারে। একটি প্রতিনিধি কমিটি যাতে বড় দল থেকে বেশী লোক থাকতে পারে। আরেকটি নীতি নির্ধারনী কমিটি যাতে সব দল থেকে ১/২ জন করে থাকবে।
৫) মাঠ পর্যায়ে কিছু যৌথ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করবে। কিভাবে যৌথ কর্মসূচী বাস্তবায়ন হবে। তার একটি নীতিমালা যৌথ কমিটি তৈরী করেবে।
৬) তারা সংষ্কারের রুপরেখা তৈরী করবে এবং একমত হয়ে তা জনগনকে জানাবে। এতে করে বার বার মত বদলের ভয় থাকবেনা। পারষ্পরিক অবিশ্বাস কমে আসবে।
এই মুহুর্তে দেশের সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বদলীয় বৈঠকের চেয়ে জোট গঠন বেশী জরুরী।
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

