মহান স্বাধীনতা দিবসের ভাবনা: পঞ্চাশ বছরের বিভ্রান্তি ও এক অন্বেষা
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস একটি বহুমাত্রিক ও সংগ্রামময় অধ্যায়। এটি শুধু ১৯৭১ সালের নয় বরং ১৯৪৭ সালের দ্বিজাতিতত্ত্ব, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান পর্যন্ত বিস্তৃত একটানা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা। ‘মহান স্বাধীনতা দিবসের ভাবসা’—এই কনসেপ্টটি মূলত আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের প্রক্রিয়া, সেই স্বাধীনতার অর্থ, এবং পরবর্তী ৫৫ বছরে এই স্বাধীনতাকে ঘিরে সৃষ্ট বিভ্রান্তি, রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয় পরিচয় সংকটের গভীর বিশ্লেষণ দাবি করে।
স্বাধীনতা অর্জন আর স্বাধীনতা ধারণের যুদ্ধ
বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাধীনতা একটি আবেগের নাম, একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমরা একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্ত হই। কিন্তু স্বাধীনতা ঘোষনার দিন ২৬ মার্চকে আমরা স্বাধীনতা দিবস হিসেবে গণ্য করি। স্বাধীনতার পেছনে একটি গভীর ভাবনা, একটি বৃহত্তর বাস্তবতা আছে যা আমাদের অনেকেই হয়তো বিস্মৃত হই। গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে স্বাধীনতা, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে একটি সুক্ষ্ম, দীর্ঘমেয়াদী ও নির্মম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। এই বিভ্রান্তি শেষ পর্যন্ত বহু মানুষের প্রাণহানি, গণহত্যার ন্যায্যতা প্রদান এবং এক অস্বাস্থ্যকর রাজনৈতিক ও বর্ণবাদী সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধপরিস্থিতিতে অনেক নৃশংসতা ঘটেছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো যুদ্ধ পরিস্থিতি ব্যতিত বেসামরিক লোকদের হত্যা করে তাকে ‘জাস্টিফাই’ করা, এমনকি সেই হত্যাকাণ্ডকে উৎসবের মতো উদযাপন করার উদাহরণ বিরল। আজ এটা নিয়ে বিতর্ক হবে। কিছু মানুষ নিজেদেরকে নিরপেক্ষ প্রমাণের জন্য সব দল সমান বলে রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের ৯০% যাদের দখলে, যাদের দলের শীর্ষনেতা এদেশের মানুষকে বার বার হত্যা করার নির্দেশ দিয়ে ঘৃণিত হয়েছে, যে দলের সকল শীর্ষ নেতা এসবের সহকারী, যে দলের বেশীরভাগ সমর্থক এসবের জন্য দলের পক্ষ নেয় এবং প্রায় সবাই নিরবে সমর্থন দেয়, যে দলের ভেতর থেকে এসবের জন্য কখনো কোনো প্রতিবাদ- প্রতিকার চাওয়া হয়নি সে দলকে অন্যদের সমতুল্য বলে মিডিয়া এবং সংস্কৃতিকর্মীদের একটি অংশ সবাই সমান এমন একটা কথা প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে তাদেরকে ক্ষমতায় আসার রাস্তা করে দেয়। সে দেশ জাতি ও দল নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুখ লুকাবে।
আর তারা মুলত বিভক্তি সৃষ্টিকারীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে, কেউ বুঝে কেউ না বুঝে।
বাংলাদেশে স্বাধীনতা ভাবনার বিবর্তন, স্বাধীনতার পক্ষে-বিপক্ষের বিভাজন, এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ হয়ে ২০২৪ পর্যন্ত ধারাবাহিক সংগ্রামের অনিবার্যতা বিশ্লেষণ এর পাশাপাশি দেখবো, কেন এই তিনটি আন্দোলনকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানো দেশের স্বার্থে নয়, বরং দেশের শত্রুদের স্বার্থে কাজ করা।
প্রথম ভাবনা: ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪—একটি অনিবার্য ধারাবাহিকতা
ইতিহাসের সুতো ধরে এগোতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৪৭ সালে। ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। এই পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে সর্বোচ্চ অবদান ছিল বাঙালি মুসলমানদের। ‘স্বদেশী আন্দোলন’ থেকে শুরু করে লাহোর প্রস্তাব পর্যন্ত—বাঙালিরা একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর শীঘ্রই দেখা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি সেখানে পরাধীন হয়ে পড়ে। ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি—সবখানেই বৈষম্যের শিকার হয় তারা।
সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে জন্ম নেয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি (৫৭% বাঙালি) একটি সংখ্যালঘু শাসকগোষ্ঠীর (৪৩%) বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করে। এটা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল একটি দৃষ্টান্ত, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠরা নিজেদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান স্বাধীনতার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে তৈরি হওয়া গাফিলতি, স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও গণতান্ত্রিক পতনের বিরুদ্ধে ছিল। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে যে পরিমাণ মানুষ খুন হয়েছে, পাকিস্তানের বিদেশি সরকার (মূলত সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো সরকার) ততটা লুট করেনি, পাক হানাদার বাহিনী যুদ্ধকালীন সময় ছাড়া এত মানুষ হত্যা করেনি। তাই ৪১ (১৯৪৭), ৭১ (১৯৭১) এবং ২৪ (২০২৪) কে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানো ইতিহাসের অপব্যাখ্যা। বরং এরা একে অপরের পরিপূরক। তাই ২৪ এর জুলাই ছিল এক অনিবার্য বাস্তবতা।
মানুষ ৪৭ জীবন দিয়ে মুক্তি পায়নি তাই ৭১ এ আবার লড়াই করে জীবন দিতে হয়েছে। ৭১ এ জীবন দিয়ে যখন অধিকার পায়নি তখন আবার লুটে যাওয়া স্বাধীনতা ফিরে পেতে দিতে হয়েছে হাজারো জীবন। এ হচ্ছে ধারাবাহিকতা। বার বার যদি পরাধীনতা আসে। বার বার স্বাধীনতা আনতে হতে পারে। সবগুলো যুদ্ধ এক সারিতে গাঁথা।
একই যুদ্ধের যোদ্ধাদের মাঝে মতের অমিল থাকতে পারে। সেটা সবযুদ্ধে ছিল। এমনকি ৪৭, ৭১ এবং ২৪ এর যোদ্ধাদের মাঝেও ভিন্ন ভিন্ন মত ও দল ছিল। আবার প্রতিটি যুদ্ধের দলগুলোর মধ্যে কোনো বিষয়ে একে অপরের বিপরীতে অবস্থান করতে পারে। এটা খুব স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ৪৭ এর যোদ্ধারা ৭১ কে মানুবেনা, ৭১ এর যোদ্ধারা ২৪কে মানবেনা। এটা বুঝতে হবে। এবং সতর্ক থাকতে হবে। বিভিন্ন তত্ব দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হবে একটা আরেকটার বিপরীত। শুধু তাই যারা এটা বোঝানোর চেষ্টা করবে তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এরা হয়তো কারো ‘‘নৈতিক গুপ্তচর’’ হয়ে চেতনা বিক্রির নামে তাদের পণ্য বিক্রি করে দেশকে বিভক্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।
৫৫ বছরের বিভ্রান্তি: স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক কেন সৃষ্টি হলো?
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই একটি অপতৎপরতা শুরু হয়। সেই তৎপরতার মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার চেতনাকে বিকৃত করা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিতর্কিত করা এবং স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা। এর ফলাফল ভয়াবহ।
১. স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক: কে কবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন, করলেন কি না—এই বিতর্কের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বকে খণ্ডিত করা। এমনকি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী যখন নিরীহ ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তার আগে স্বাধীনতার ঘোষণা আসেনি, বরং গণহত্যার পর তা আসে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি এক অনন্য উদাহরণ: আগে নারকীয় গণহত্যা, পরে স্বাধীনতার ঘোষণা। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে যারা বিতর্ক তৈরি করেছে, তারা আসলে গণহত্যার বীভৎসতাকে ঢেকে দিতে চেয়েছে।
২. রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধার পালাবদল: এক সময় যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিল, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাদের কেউ কেউ ‘রাজাকার’ হিসেবে চিহ্নিত হলো। আবার যারা সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, তারা বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে দাবি করলো। ৫৪ বছরের পালাবদলে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের এই বিনিময় এক বিশাল মানসিক বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
অথচ যারা ৪৭ সালে ব্রিটিশবিরোধী ও স্বদেশী ছিল তারা যেমন মুক্তিযোদ্ধা তেমনি যারা ব্রিটিশ শাসন চালু রাখতে চেয়েছিল তারা ব্রিটিশের দালাল বা রাজাকার ছিল। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে মনে রাখতে হবে স্বাধীনতাকামীদের ৩ ধরনের মত ছিল। এবং তারা সবাই স্বাধীনতার পক্ষেই ছিল।
প্রথমত: যারা ব্রিটিশ ভারত থেকে মুক্তি নিয়ে অখন্ড ভারত চেয়েছিল তারা স্বাধীনতাকামী ছিল।
দ্বিতীয়ত: যারা ব্রিটিশ থেকে বের হয়ে পাকিস্তান ও ভারত দুটো রাষ্ট্র চেয়েছিল, তারাও স্বাধীনতাকামী ছিল।
তৃতীয়ত: যারা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলা নামে ৩ টি রাষ্ট্র কিংবা পাঞ্চাব ও কাম্মীর নামে আরো রাষ্ট্র চেয়েছিল তারাও স্বাধীনতাকামী ছিলো।
আজকের বাস্তবতায় কেউ যদি অখন্ড ভারত চায়, তাকে ৩ দেশেই দেশবিরোধী হিসেবে দেখবে। আবার কেউ অখন্ড পাকিস্তান চাইলে তাকে বাংলাদেশী দেশবিরোধী হিসেবে দেখা হবে। কেউ অখন্ড বাংলা চাইলেও তাকে বাংলাদেশের স্বাধীরতার পক্ষের হিসেবে বিবেচনা নাও করা হতে পারে।
সহজ কথা হলো, স্বাধীনতার মূল ধারণা সব সময় এক, তবে স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ এক নয়।
আর সে কারণে, ৪৭ এর যোদ্ধারা যখন ৭১ সালে এসে একই পক্ষে থাকলো বা পাকিস্তানের পক্ষ নিলো তখন তারা আর স্বদেশী থাকলো না তারা হলো হানাদারের দোষর ও রাজাকার।
ঠিক একই ভাবে ২৪ সালে অথবা স্বাধীনতার একটা সময়ের যখন, স্বাধীনতার শক্তি অন্য বিদেশী শক্তির কাছে বিক্রি হয়ে গেল, স্বাধীনতার নামে খুন, গুম, হামলা, মামলা, লুট, বাকস্বাধীনতাহরণ সকল কিছুই হলো এবং তা স্বাভাবিকের মাত্রা থেকে বেশী হয়ে গেল। তখন যখন একটা দল আবার নতুন করে মুক্তির ডাক দিলো।
৩. দলবাজি, চুরি, ডাকাতি ও স্বাধীনতা বিক্রি:
মনে রাখতে হবে, তখনো স্বাধীনতার চেতনা এক থাকবে। পক্ষ বিপক্ষ ভিন্ন হবে। এখন যে ৭১ বাংলাদেশের পক্ষে ছিল কিন্তু বাংলাদেশের ত্যাগ করে লুটেরা, বিদেশী এজেন্ট এবং হত্যাকারীদের পক্ষ নিলো সে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলো।
আর যে, দেশের পক্ষে দেশের মানুষের পক্ষে দাড়ালো সে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করলো। তাই বিতর্ক না করে। এক যুদ্ধের যোদ্ধাকে অন্য যুদ্ধের যোদ্ধার সামনে দাড় না করিয়ে প্রত্যেকের আলাদা আলাদা সম্মান দেখাতে হবে। আর যে আগে দেশের পক্ষে থেকে পরে দেশের বিপক্ষে চলে গেছে। তাকে প্রথমে ইগনোর করতে হবে। তাতেও সে যদি বেশী বেশী দেশবিরোধী কাজ করে তাকে বলতে হবে, মনে করিয়ে দিতে হবে। তারপরও সে যদি একই কাজ অব্যাহত রাখে। সামাজিক ভাবে তার পাওনা উপাধি তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। আর যে নিজেই এক সময়ের মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিকামী পরে দেশবিরোধী হয় খুন, গুম ও লুটের সাথে জড়িত থাকে তাহলে তাকে তার অপরাদের পাওনা বুঝিয়ে দিকে হবে।
স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই দেশের সম্পদ লুট করা, বিদেশে পাচার করা, এবং সেই টাকায় দেশের অভ্যন্তরে বিভক্তি সৃষ্টি করা একটি সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতে করা হয়েছে। যারা স্বাধীনতা বিক্রি করেছে, তারা আজ বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, কিন্তু দেশে রেখে গেছে তাদের ‘চামচারা’—যারা এখনো ৭১ বেচে দেশকে বিদেশের দখলে রাখার স্বপ্নে রাজাকারি করে চলেছে।
স্বাধীনতার মূল্য: যারা পায়নি তারা জানে
ভারতীয় বাঙালিরা ভারতকে নিজের দেশ হিসেবে ভালোবাসে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সিএএ-এনআরসি বিতর্কে তারা আজ ‘অতিথি’ হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। যদি ভারতের বাঙালিরা বাংলাদেশের মতো একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হতো, হয়তো তাদের ক্রিকেটে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া হতো না, পরমাণু শক্তিধর দেশ হতে হতো না, মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাতে হতো না। কিন্তু তারা একটি আত্মমর্যাদাশীল, স্বাধীন জাতি হিসেবে টিকে থাকতে পারত। এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
পাকিস্তানের দিকে তাকালে দেখা যায়, যদিও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সূচক বা দুর্নীতির মাত্রা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে ‘ভালো’ ছিল, তারপরও সেখানে বাঙালি ছিল দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাই ১৯৭১ আমাদের কেবল একটি মানচিত্র দেয়নি, দিয়েছে মর্যাদা, আত্মপরিচয় ও আত্মনির্ধারণের অধিকার।
আমাদের ৭১ এর আগে পরে আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। সে ১৯৪৭ এর পর থেকে হয়েছে নানা বিদ্রোহ বিপর্যয়। কিন্তু তারমধ্যে সবচেয়ে মহীয়ান হলো ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ। কারণ আমরা নিজেরা নিজেদের জন্য একটা দেশ পেয়েছি। দেশ পেয়ে আমরা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। সে দোষ স্বাধীনতার নয়।
বিষয়টি আরো ভালভাবে বুঝতে হলে মানে স্বাধীনতার মূল্য বুঝতে হলে আমাদেরকে ফিলিস্তিনের দিকে তাকাতে হবে। একটি স্বাধীনতার জন্য সেখানে মানবতা কিভাবে দুমড়ে মুচড়ে কাঁদছে। কাশ্মীর পরিস্থিতি কিংবা পথে প্রান্তরে ভারতের মুসলমানের প্রতি যে অবহেলা অবজ্ঞা ও অধিকারহীনতা চলছে সেটা দেখেও বুঝতে পারি আমাদের স্বাধীনতা কতটা মূল্যবান।
বলাবাহুল্য ৭২ থেকে ৭৫ এবং ২০০৯ থেকে ২৪ এই সময়ের উদাহরণ ৪৭ থেকে ৭১ এর চেয়ে খারাপ বা কাশ্মীর কিংবা অনেক পরাধীন দেশের চেয়ে খারাপ হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে। ০৯ মাসের যুদ্ধে একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি বলে ৩৬ দিনের যুদ্ধে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করা গেছে। ৭১ না হলে ২৪ পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়া অতো সহজ ছিলো না। কেউ হয়তো বলবে ৭১ না হলেতো ২৪ এর দরকার হতো না। মনে রাখতে হবে ৪৭ থেকে ৭১ আমাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখা হয়েছিল একইভাবে স্বাধীন দেশেও যারা চেতনার খরিদ্ধার ছিলো না তাদেরকে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখা হয়েছিল। আর সেজন্য ২৪র লড়াইও গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতা পরবর্তী আন্দোলন: জুলাই অভ্যুত্থান ও ভবিষ্যৎ
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বহু আন্দোলন, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান। এটি ছিল স্বাধীনতার চেতনার পুনর্জাগরণ, ছিল সেই ‘বেহাত বিপ্লব’কে হাত করার প্রচেষ্টা। এই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সফলতা বা ব্যর্থতা যাই হোক না কেন, জুলাই চেতনা, জুলাইয়ের শহীদদের ত্যাগ—এই আলোচনা চিরকাল যতটা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে তারচেয়ে এই সময় বিশেষ করে যতদিন এর উদ্দেশ্য সাধিত না হবে ততদিন এটা বেশী গুরুত্ব পাবে। আর শতবছর কিংবা হাজার ব
