মব জাস্টিস:  গণ-ন্যায়বিচার নাকি অনাচার

মব জাস্টিস: গণ-ন্যায়বিচার নাকি অনাচার

মব জাস্টিস: ইতিহাসের পাতায় দেশে দেশে গণ-ন্যায়বিচারের উত্থান, কারণ ও পরিণতি

মব জাস্টিস (Mob Justice) বলতে বুঝায় জনতার তাড়নায়, ক্ষোভে অথবা উত্তেজনায় কোনো ব্যক্তিকে (বা গোষ্ঠীকে) বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই শাস্তি দেওয়া। এটি প্রায়শই হয় আইনের বাইরে গিয়ে, জনতা নিজ হাতে আইন তুলে নেয়। মব জাস্টিসকে লিঞ্চিং (lynching) নামেও ডাকা হয়। ইতিহাসে মব জাস্টিস বিভিন্ন সমাজের সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইন শৃঙ্খলার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা যায়।

মব জাস্টিসের সূচনা ও প্রাচীন দৃষ্টান্ত

মব জাস্টিস একেবারে নতুন কোনো বিষয় নয়। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই যখন প্রাতিষ্ঠানিক আইন ব্যবস্থা দুর্বল বা অনুপস্থিত ছিল, তখনই মানুষ নিজেরাই বিচার করতো। প্রাচীন গ্রীস ও রোমেও গণরোষে মানুষকে শাস্তি দেওয়ার নজির রয়েছে। তবে “মব জাস্টিস” শব্দটি এবং আধুনিক অর্থে এর ধারণা বিশেষভাবে ১৮ শতকের শেষ থেকে ১৯ শতকে প্রসারিত হয়।

লিঞ্চ শব্দের উৎপত্তি

“লিঞ্চ” শব্দটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার বিচারক চার্লস লিঞ্চের (Charles Lynch) নাম থেকে। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের (১৭৭৫-১৭৮৩) সময় তিনি আদালতের বাইরে স্বেচ্ছা বিচার কার্য চালাতেন, যা থেকে “lynch law” ও “lynching” শব্দের উৎপত্তি হয়। (তথ্যসূত্র: Philip Dray, At the Hands of Persons Unknown: The Lynching of Black America, 2002)

ইতিহাসের পাতায় মব জাস্টিসের বড় বড় ঘটনা

১. যুক্তরাষ্ট্রে লিঞ্চিং

১৯ শতক ও ২০ শতকের প্রথম ভাগে যুক্তরাষ্ট্রে মব জাস্টিস ব্যাপক আকার ধারণ করে। আফ্রিকান-আমেরিকানদের ওপর বর্ণবৈষম্যের কারণে শ্বেতাঙ্গ জনতা প্রায়ই তাদের ‘চোর’, ‘ধর্ষক’ বা ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করতো।

  • ১৮৮২-১৯৬৮ সময়কালে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত প্রায় ৪,৭৪৩টি লিঞ্চিং হয়, যার প্রায় ৭৩% ছিল কৃষ্ণাঙ্গ। (তথ্যসূত্র: Equal Justice Initiative, Lynching in America Report, 2015)

২. দক্ষিণ আফ্রিকায় নেকলেসিং

সাউথ আফ্রিকার টাউনশিপগুলোতে ১৯৮০-৯০ দশকে “নেকলেসিং” (necklacing) প্রথা চালু হয়, যেখানে সন্দেহভাজন খুনিদের গলায় টায়ার পরিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতো। এটি ছিল স্থানীয় সম্প্রদায়ের “সামাজিক শুদ্ধি”র একটি নির্মম পদ্ধতি।
(তথ্যসূত্র: Truth and Reconciliation Commission of South Africa Report)

৩. ভারতের গরু সংক্রান্ত লিঞ্চিং

ভারতে ২০১৪ সালের পর থেকে বহু গরু পাচার বা গরু হত্যা সন্দেহে মুসলিম ও দলিতদের গণপিটুনির শিকার হতে দেখা গেছে। যেমন, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মহম্মদ আখলাক নামের এক মুসলিম ব্যক্তিকে গরুর মাংস খাওয়ার সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এমন আরো নানা ঘটনা আছে।

  • (তথ্যসূত্র: The Wire, NDTV, Amnesty International Reports)

৪. বাংলাদেশে চোর-ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনি

বাংলাদেশেও প্রায়ই চুরি-ডাকাতির অভিযোগে মব জাস্টিসের শিকার হতে দেখা যায়।

  • যেমন, ২০১৯ সালের জুলাইয়ে কুমিল্লায় সন্দেহভাজন শিশু চোর সন্দেহে এক নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
    (তথ্যসূত্র: Daily Star, 23 July 2019)

মব জাস্টিসের কারণ

১. আইনের শাসনের দুর্বলতা: বিচার বিলম্ব বা ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা জনতাকে নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিতে উসকে দেয়।
২. সামাজিক গুজব ও উস্কানি: হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের মতো মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে মব উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
৩. নিয়ন্ত্রক শক্তির অনুপস্থিতি: কোনো ঘটনাস্থলে পুলিশ না থাকলে জনতা নিজেরাই ব্যবস্থা নেয়।
৪. সামাজিক প্রতিহিংসা: কখনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে গুজব ছড়িয়ে প্রতিপক্ষকে গণপিটুনির শিকার করা হয়।
৫. সাংস্কৃতিক মানসিকতা: বহু সমাজে এখনো “চোর ধরা পড়লে সাথে সাথে শাস্তি” ধারণা প্রোথিত রয়েছে।

মব জাস্টিসের ভালো-মন্দ

মন্দ দিক

  • এটি প্রায়শই নিরপরাধ ব্যক্তিকেও হত্যা করে।

  • সমাজে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা নষ্ট হয়।

  • বিচার ব্যবস্থার পরিবর্তে হিংসার সংস্কৃতি চালু হয়।

কথিত ভালো দিক

সাদাচোখে এটা ভাল দিক নয়। তবে কোনো দেশে যদি অন্যায় ও অপরাধের বিচার না হয়। তখন জনতা আইন হাতে তুলে নেয়। এটা বছরের পর বছর চললে এমন হয়। মনে রাখতে হবে সভ্য সমাজ ও দেশে বিচারহীনতার সংষ্কৃতি চলতে পারে না। আবার মবজাস্টিসও কাম্য নয়। কোনো দেশে সমাজে দুটো কারণে মব জাস্টিস হয়। একটি হলো বিচারহীনতা অন্যটি হলো বিচারের কাউকে শাস্তি দেয়া সম্ভব না হলে তাকে সামাজিকভাবে দোষী বানিয়ে মব করা।

তবে যেখানে সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর লাঞ্চিত আর গোষ্টির কয়েকজন মাত্র লুটেরা খুনি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে মানুষকে নির্যাতন করে তখন তাদেরতো একটা শাস্তি পাওয়া উচিৎ। কোনো কোনো নো স্থানে মানুষ মনে করে এতে অপরাধীরা ‘দ্রুত শাস্তি’ পায়, যা অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এর কোনো বিচার হয়না। তবে এটি ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রতিহিংসাকে উৎসাহ দেয় এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।

তাই যখনি মব হবে তখনি আইন শৃংখলা উন্নত করে দোষীদের কাঠগড়ায় নিয়ে জনগনকে আস্থায় আনতে হবে। তা না হলে এটা ঠেকানো যায় না। কারণ মানুষের মনে বছরের পর বছর ধরে নিপীড়নের স্মৃতি ও কষ্ট থাকে।

বাংলাদেশে মব জাস্টিস

স্বাধীনতার পর বিহারী জনগোষ্ঠি প্রথম এর শিকার হয়। তারপর শিকার হয় বিএনপি জামায়াতের লোকেরা। সর্বশেষ যারা এটাকে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছে এবং পরোক্ষভাবে একটি চেতনার যুদ্ধ বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। এবং এটা করতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষ খুন আর লুটের রেকড গড়ে জনতার রোষানলে বিধায় নেয়ার পর তাদের উপর এখন এটা হচ্ছে।

কিন্তু এটা এখনি থামা উচিৎ।

মব জাস্টিস কোনো সভ্য সমাজের জন্য কাম্য নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ইতিহাসে দেখা যায়, মব জাস্টিস বরাবরই সমাজে বিভাজন, আতঙ্ক ও অবিচারের বীজ বপন করেছে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আইনের সঠিক প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

নির্বাচিত তথ্যসূত্র

  • Equal Justice Initiative. Lynching in America, 2015.

  • Philip Dray, At the Hands of Persons Unknown: The Lynching of Black America, 2002.

  • South Africa Truth and Reconciliation Commission Final Report, 1998.

  • Amnesty International Annual Reports on India & Bangladesh.

  • The Daily Star, NDTV, The Wire archive articles.