লেখকের সাথে চলে পাঠকের মনো:ভ্রমণ
বই: ভ্রমি বিষ্ময়ে
লেখক: রাসেল আহমেদ
ইবনে বতুতা বা মার্কো পোলোর ভ্রমণকাহিনি পড়ার সময় আমরা সে সময়টাকে বোঝার এবং ধারণ করার চেষ্টা করি। হয়তো ভাবুক আপন মনে বলে, ‘ইশ্- আমি যদি তখন ওখানে থাকতাম।’ কিন্তু সমসাময়িক ভ্রমণপাঠে আমরা হয়তো অন্য কিছু খুঁজি। রাজা-রানি আর হাতি-ঘোড়ার যুদ্ধ কিংবা মণিমুক্তা ও দাসী ক্রয়ের গল্প নয়। এমনকি তথ্যগুলোতেও আমরা হয়তো কেবল চোখ বুলিয়ে যাই। ভাবি, গুগল থেকে আরো দেখে নেওয়া যাবে। আর সৌন্দর্য দেখার জন্য ছবি কিংবা ভিডিও কোনোটারই তো কমতি নেই আন্তজালে।
ভ্রমণপিয়াসী পাঠক আর পাঠবিলাসী ঘুরুয়া তবু কেন ভ্রমণসাহিত্যে মুখ গুঁজে খুঁজে বেড়ায় : নেদারল্যান্ডসের গ্রামে এখনো কৃষক উইন্ডমিল চালায় কীভাবে? এখনো প্যারিসের রাস্তায় সুন্দরীরা শিল্প সমঝদারীর মানে খুঁজে বেড়ায় কি? স্পেনের ষাঁড়ের লড়াইয়ে উপস্থিত থাকতে পারলে কেমন হতো? পর্তুগালে বাংলাদেশিরা কেমন আছে? আসলে লোকেরা বাস্তব অভিজ্ঞতা শুনতে চায়, আমরা যাকে বলি ‘সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত’। সুন্দরের পিয়াসী আর জ্ঞানবিলাসী ভ্রমকের কলম সব সময় সত্যের কথা বলে। যদিও তাতে ভাষার রং মিশে থাকে ভালোবাসার পরশে। চোখের দেখার বাইরের কিছু দৃশ্যপটে না এলে ভ্রমণসাহিত্যের পাতায় আঁকা বাস্তবতার চেয়ে বাস্তব আর কিছু নয়। তাই তো আজো পৃথিবীর মানুষ ইতিহাসের সারবস্তু গ্রহণ করে মধ্যযুগের ভ্রমণকাহিনি থেকে।
আর যখন তাজা ইতিহাস চোখের সামনে দাঁড়িয়ে, তখন ভ্রমণের গল্প আমাদের দেয় একগুচ্ছ অভিজ্ঞতার ঝুলি। রাসেল আহম্মেদের ‘ভ্রমি বিস্ময়ে’ বিচিত্র অভিজ্ঞতার রস আস্বাদন করতে কখনো পাঠককে নিয়ে যাবে মাধবকুÐ, রাঙামাটি কিংবা মহেশখালীতে। নেপালের পাহাড়ের ধার, কলকাতার ফুটপাত, থাইল্যান্ডের রেস্টুরেন্টÑআসলে অভিজ্ঞতার গল্পই এখানে প্রধান। বেলজিয়ামের শীত কিংবা ইউরোপে ইউরো বাঁচানোর গল্প পাঠকের অভিজ্ঞতাকে করবে সমৃদ্ধ। বাতাসে ভেসে নেদারল্যান্ডস কিংবা প্যারিস ভ্রমণের ধারাবর্ণনা পাঠককে নিয়ে যাবে সেই দলের সাথে ঘুরে বেড়ানো স্মৃতির স্বাদ দিতে সময়ের অন্দরে। এভাবে স্পেন, পোল্যান্ড ও ভ্যাটিকানের গল্পও এসেছে।
রাসেল আহম্মেদের লেখার মূল শক্তি গল্পময় ধারাবাহিক উপস্থাপন আর অভিজ্ঞতার আস্বাদন। সময়ের জন্য উপযোগীও বটে। কারণ এখন আর সমসাময়িক গল্প আমরা ইতিহাস জানার জন্য হয়তো পড়ি নাÑঅভিজ্ঞতা নেওয়ার একটা মাধ্যম। ভ্রমণের গল্পগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরিয়ে দেওয়াÑএ-ও এক মুনশিয়ানা বটে। এলাকা আর খাবারের স্বাদের সাথে নতুন নতুন বন্ধু বানানোর মজার অভিজ্ঞতা, সেই সাথে প্রবাসী ভাইদের সাথে পরিচয় পাঠকের মনে থাকবে বইপাঠের শেষে। কেবল ভ্যানিস, আমিরাত, লিসবন, আল বুফেরা নয়; মায়াবী দ্বীপ বেরলিঙ্গাও পাঠকের সামনে সাদাকালো অক্ষরে তুলে ধরবে রূপ-সৌন্দর্য ও জীবন-জীবিকার ঢালি।
শুধু ভ্রমণের গল্প নয়, আছে যোগাযোগব্যবস্থার বিশ্লেষণ, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযুদ্ধের কথা, প্রবাসে বাংলা ভাষা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার নানা দিক নিয়ে আলোচনা। তাই এই গ্রন্থ অভিজ্ঞতারই দলিল। আমরা যখন কোথাও ঘুরতে যাই, হয়তো সন্ধ্যায় কয়টায় সূর্য কীভাবে অস্ত গিয়েছে তার সাথে এটাও গুরুত্বপূর্ণ বটে, পথের বাঁকে আমাদের গাড়ি কীভাবে পাহাড়ের সাথে ধাক্কা খেয়েছে। তাই অভিজ্ঞতা সিঞ্চনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে রাসেল আহম্মেদের বই ‘ভ্রমি বিস্ময়ে’। সাবলীল উপস্থাপনা, তরতর করে এগিয়ে চলা ভ্রমণগল্প পাঠককে লেখক ও পর্যটকের পাঠময় ভ্রমণসঙ্গী হতে সাহায্য করবে। নিরাবরণ লেখনী এবং লেখকের আন্তরিক অনুভ‚তি দুটোই এক হয়ে স্পর্শময় করে তুলেছে প্রতিটি ভ্রমণকে, যেন হাতের তালুতে তুলে পরীক্ষা করার মতো বালুকণা।
বইটি প্রকাশে বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশনের হাত আছে। এই এসোসিয়েশন বিগত বছরগুলোতে বই, ভিউকার্ড, ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে। দলীয় ভ্রমণের মাধ্যমে দেশকে তুলে এনেছে, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও নানাবিদ কর্মশালার মাধ্যমে পর্যটক ও পাঠকের দেখার চোখ আর লেখার হাতকে করেছে শাণিত। ভবিষ্যতে দেশ ও পৃথিবীর সৌন্দর্য আর বিচিত্র অভিজ্ঞতার বন্দরে নোঙর করবে এসোসিয়েশনের জ্ঞানবান্ধব তরী। এর বিকাশকে প্রকাশে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন সবার সহযোগিতা।
ভালো থাকার ও ভালো রাখার অনবদ্য প্রত্যয়ে
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
নির্বাহী সদস্য
বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স এসোসিয়েশন

