Landless

ভূমির অধিকার ও আশ্রয়হীনতা

ভূমির অধিকার ও আশ্রয়হীনতা: এক বৈশ্বিক মানবিক সংকট

সারাবিশ্বের ভূমিহীন (Landless) এবং আশ্রয়হীন (Homeless) মানুষের সংখ্যা এক গভীর ও বিস্তৃত মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এই মানুষগুলো কেবল মাথার ওপর ছাদ হারায়নি, তারা হারিয়েছে সমাজের মূল ভিত্তি — নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশে নানাবিধ কারণে মানুষ ভূমিহীন হয়। এই ভূমিহীণ হওয়ার হার নানা কারণে বেড়ে চলেছে।

জাতিসংঘের হ্যাবিট্যাট (UN-Habitat) এবং অন্যান্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৩০ মিলিয়ন মানুষ বর্তমানে চরম বা নিরঙ্কুশ আশ্রয়হীনতার শিকার। এর অর্থ হলো কোটি কোটি মানুষ কোনো প্রকারের স্থায়ী বা নিরাপদ আশ্রয় ছাড়াই জীবনযাপন করছে। তবে, আশ্রয়হীনতার এই চিত্রটি বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়—কেউ রাস্তায় ঘুমায়, কেউ বা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে থাকে, আবার অনেকে বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে (Informal Settlements) মানবেবতর জীবন কাটায়। বাসস্থান সংকট আরও ব্যাপক: প্রায় ২.৮ বিলিয়ন মানুষ, যা বিশ্বের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি, পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই ২.৮ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে ১.১ বিলিয়ন মানুষই অনানুষ্ঠানিক বসতি বা বস্তিতে বাস করে, যার ৯০ শতাংশ কেন্দ্রীভূত আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশে। অথচ বিশ্বের অনেক দেশে এমনকি আফ্রিকাতেও কোনো কোনো এলাকায় প্রচুর খালি জায়গা রয়েছে। কোথাও জায়গার সংকট কোথাও আবার সামগ্রীর অপ্রতুলতা।

প্রতি বছর ঠিক কী পরিমাণ মানুষ নতুন করে ভূমিহীন বা আশ্রয়হীন হচ্ছে, তার সঠিক বৈশ্বিক পরিসংখ্যান নির্ণয় করা কঠিন। তবে, অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয় এবং সংঘাতের কারণে এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতি বছর গৃহহীন হচ্ছে বিভিন্ন কারণে।

মানুষ কেন ভূমিহীন বা আশ্রয়হীন হয়?

মানুষের ভূমিহীন বা আশ্রয়হীন হওয়ার কারণগুলো বহুস্তরীয় এবং পরস্পর সংযুক্ত:

  • অর্থনৈতিক কারণ:

    • স্বল্প মজুরি ও বেকারত্ব: জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও মজুরি না বাড়ার ফলে মানুষ বাড়ি ভাড়া বা কিস্তি মেটাতে পারে না।

    • সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব: বিশ্বব্যাপী আবাসন খরচ আকাশছোঁয়া। বেশিরভাগ শহরে মধ্যম আয়ের মানুষের পক্ষে সাশ্রয়ী বাসস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন।

    • চরম দারিদ্র্য: বিশ্বজুড়ে আশ্রয়হীনতার সবচেয়ে বড় মূল কারণ হলো দারিদ্র্য।

  • কাঠামোগত ও সামাজিক কারণ:

    • স্বাস্থ্যসেবার অভাব: একটি গুরুতর অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা একটি পরিবারকে ঋণের জালে ফেলে দিতে পারে এবং তাদের গৃহহীনতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

    • মানসিক স্বাস্থ্য ও আসক্তি: মানসিক অসুস্থতা বা মাদকের আসক্তি মানুষকে কর্মসংস্থান ও স্থিতিশীল জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

    • বৈষম্য ও জাতিগত অসমতা: অনেক সমাজে জাতিগত বা গোষ্ঠীগত বৈষম্যের কারণে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষ আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।

    • ব্যক্তিগত সংকট: বিবাহবিচ্ছেদ, পারিবারিক সহিংসতা, চাকরি হারানো, বা জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কোনো আশ্রয় না থাকা।

    • নীতিগত ব্যর্থতা: আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকারের অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ।

  • ভূমিহীনতার নির্দিষ্ট কারণ:

    • দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি: বিশেষত কৃষিপ্রধান উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, জমির স্বল্পতা ও বংশ পরম্পরায় জমি ভাগ হতে হতে অনেকেই ভূমিহীন হয়ে পড়ে।

    • ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার: পুরোনো ভূমি বণ্টন ব্যবস্থা বা নীতির কারণে ভূমির অসম বন্টন।

    • কার্যকর ভূমি নীতির অভাব: ভূমিহীনদের জন্য আয়বর্ধক কর্মসূচির অনুপস্থিতি।

এছাড়া প্রাকৃতিক কারণ তথা নদীভাঙ্গন ও ঘূর্নিঝড়েও মানুষ ভূমিহীন এবং আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের মতো দেশে সবলের অত্যাচার তথা জবর দখল, চিকিৎসাব্যয়ে মেটাতে ভূমি বিক্রি, মেয়ের বিয়ে, ছেলের বিদেশযাত্রা এবং সামাজিক চিটারদের প্রতারণার কারণেও লক্ষ মানুষ ভূমিহীন হচ্ছে।

কোন কোন দেশ ও মহাদেশে এই সংখ্যা বেশি?

আশ্রয়হীন মানুষের মোট সংখ্যা এবং জনসংখ্যার অনুপাতে আশ্রয়হীনতার হার বিভিন্ন দেশে ভিন্ন।

আশ্রয়হীনতার হার (প্রতি ১০০,০০০ জনসংখ্যায়)

  • উচ্চ হার দেখা যায়: সিরিয়া (সংঘাতের কারণে), আর্জেন্টিনা, ইউক্রেন (সংঘাতের কারণে), এবং ইংল্যান্ড (২০২৩ সালের তথ্যানুসারে প্রতি ১,০০,০০০ পরিবারের মধ্যে ৪২৬টি গৃহহীনতার সংকটে রয়েছে।) তার মানে প্রতি ১০ হাজারে ৪২.৬টি পরিবার এবং প্রতি হাজারে ৪.২৬টি পরিবার। এখানে একটি উন্নত দেশের কথা চিন্তা করলে এই সংখ্যা মোটেই কম নয়।

  • মোট সংখ্যার হিসাবে: নাইজেরিয়ায় এক রাতের হিসাবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ গৃহহীন থাকে বলে অনুমান করা হয়। এছাড়া, মোট গৃহহীন জনসংখ্যার বিচারে ভারত, বাংলাদেশ, মিশর এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশ, যেমন – উগান্ডা, সুদান, ডিআর কঙ্গো-তে সংখ্যা অনেক বেশি।

মহাদেশভিত্তিক চিত্র

  • এশিয়া ও আফ্রিকা: এই দুটি মহাদেশে আশ্রয়হীন ও ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা সর্বাধিক। কারণ দ্রুত নগরায়ণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, এবং সংঘাত এই অঞ্চলের মূল সমস্যা। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বের বস্তিবাসী মানুষের ৯০ শতাংশ এই দুই মহাদেশে কেন্দ্রীভূত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বস্তিবাসীরাও গৃহহীণ।

  • প্রথমত তারা সরকারী বা অন্যকোনো খালি জমিতে বস্তি তৈরী করে। অথবা নিজের জমি হলেও সেখানে তারা আসলে পারতপক্ষে অন্যন্য উপায় না থাকার কারণে থাকে। কারনে সেটি আসলে বসবাসের উপযোগী নয়। বসবাসের অনুপোযোগী বাড়ি বা জমি থাকাও এক ধরনের ভূমিহীনতা।
  • যেমন বাংলাদেশে যখন মানুষ নদীভাঙন ও জবরদখলের কারণে ভূমিহীণ হয় তখন তার নামে কাগজে পত্রে জমি থাকলেও সে ব্যক্তি আসলে ভূমিহীন। কিংবা অনেকের চরে আবাদী জমি থাকে যাতে শুকনো মৌসুমে ১ ফসল চাষ করা যায় কিন্তু বসবাসের উপযোগী নয়। তাই সে পরিবারটি আক্ষরিক অর্থে হোমলেস।

জনসংখ্যা বৃদ্ধিজনিত সমস্যায় জর্জরিত দেশ

দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সীমিত সম্পদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারার কারণে অনেক দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশে ভূমিহীনতা ও গৃহহীনতা বাড়ছে। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • বাংলাদেশ: গ্রামীণ জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ভূমিহীন বা প্রায়-ভূমিহীন। কৃষি ও অ-কৃষি উভয় ক্ষেত্রেই বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব তীব্র। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুসারে যদি পৃথিবীর সকল মানুষকে আমেরিকায় পূণবাসন করা হয়। তাহলে সেখানে আরো ৩৬% শতাংশ ভূমি খালি থাকবে। এমনকি যদি আলাস্কা বাদ দিয়ে করা হয় তাহলে খালি ভূমির পরিমাণ থাকবে ২২%।

  • উগান্ডা: প্রচুর আবাদযোগ্য জমি থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্যের কারণে অনেকেই ভূমিহীন। এখানে মানুষ চাষাবাদ জানে না। নতুন কিছু গ্রহণ করতে চায় না। এখন যদি বাংলাদেশ থেকে কিছু মানুষকে সেখানে স্থানান্তর করা যায় কিছু সমন্বয় সাধিত হতে পারে পাশাপাশি কিছু বিনিয়োগসহ।

  • নাইজেরিয়া, মিশর, ইথিওপিয়া: দ্রুত নগরায়ন, অপর্যাপ্ত আবাসন এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে এই দেশগুলোতে বস্তি ও গৃহহীনতা বাড়ছে।

ভবিষ্যতে আশ্রয়হীনতা কোথায় বাড়বে এবং কেন?

ভবিষ্যতে গৃহহীনতা ও ভূমিহীনতার সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য নিম্নলিখিত কারণগুলো প্রধান ভূমিকা পালন করবে:

  • জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change): এটি গৃহহীনতার একটি প্রধান কারণ হয়ে উঠবে। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে এবং স্থায়ী আশ্রয় হারাবে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া (বাংলাদেশ, ভারত), আফ্রিকা এবং ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে।

  • আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি: বিশেষত উন্নত বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে সাশ্রয়ী আবাসন নীতির অভাবে নিম্ন আয়ের মানুষরা ক্রমাগতভাবে গৃহহীন হয়ে পড়বে।

  • অর্থনৈতিক মন্দা ও বৈষম্য: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ধনীদের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে দরিদ্র মানুষের ওপর চাপ বাড়বে।

মানবিক সংকটসমূহ

ভূমিহীন ও আশ্রয়হীন মানুষরা প্রতিদিন ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়, যা তাদের জীবনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে:

  • স্বাস্থ্য ঝুঁকি: অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, পরিষ্কার জলের অভাব এবং চরম আবহাওয়ার কারণে তারা সহজেই রোগাক্রান্ত হয়। তাদের গড় আয়ু সাধারণ মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

  • নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতা: রাস্তায় বা বস্তিতে বসবাসকারী ব্যক্তিরা শারীরিক আক্রমণ, যৌন হয়রানি এবং অপরাধের শিকার হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।

  • মানবাধিকার লঙ্ঘন: আশ্রয়হীনতাকে প্রায়শই অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, যা তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং পুলিশি হয়রানির জন্ম দেয়। বাসস্থানহীনতা মৌলিক মানবাধিকারের (যেমন – জীবন, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা) লঙ্ঘন।

  • শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যাহত: গৃহহীন শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না, এবং প্রাপ্তবয়স্করা চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, যা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রকে স্থায়ী করে।

  • খাদ্য সংকট: খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়, যা অপুষ্টি ও অনাহারে জীবনযাপনের ঝুঁকি বাড়ায়।

ভূমিহীনতা ও আশ্রয়হীনতা কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি মানবাধিকারের প্রশ্ন এবং নৈতিক দায়িত্বের বিষয়। এই বৈশ্বিক সংকটের সমাধান করতে হলে কেবল জরুরি আশ্রয় প্রদান করলেই হবে না, বরং সাশ্রয়ী আবাসন, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা জাল, ভূমি সংস্কার এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ করতে হবে।

লেখা: এই আই থেকে তথ্য অবলম্বনে জাহাঙ্গীর আলম শোভন সম্পাদনায় লেখাটি তৈরী করা হয়েছে।

ছবি: েইন্টারনেট