Class, pitch, speech, Training, Motivation

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার

আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে নিয়মিত হাসাহাসি হয়। কারণ এর ব্যবহার শুরু করেছে শিক্ষার্থীরা কারণ তারা এসাইনমেন্ট তৈরীর কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কামাল দেখাচ্ছিল। যদিও একসময় শিক্ষকেরাও সচেতন হয়ে যায়। কিন্তু তাতে কী? শিক্ষার্থীরাও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহযোগিতায় তৈরী কনটেন্ট সম্পাদনা করতে শিখে গিয়েছে এখন।

বিতর্ক হলো তারা চ্যাট জিপিটি বা এআই টুল ব্যবহার করে হোমওয়ার্ক করতে পারে কিনা? এই বিতর্ক চলতে থাকলো। আমরা সেখানে আটকে আছি। আর বিশ্বের অন্যান্য দেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্তগ্রণ, মান উন্নয়ন ও গবেষণার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করছে এবং প্রতিনিয়ত এর পরিধি বাড়িয়ে চলেছে।

আমি যখন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এআই বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেই। তখন তাদের প্রথমে নানা কনফিউশন থাকে কিন্তু নিজেদের ব্যাপারে সন্দেহ দূর হওয়ার পর তারা শংকায় পড়ে যায় যে, এভাবে সবকাজ এআই দিয়ে করলেতো বাচ্চারা লেখাপড়া শিখবেনা। যাই হোক এটি ভিন্ন আলোচনা।  আমরা আজকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এআই এর ১০টি উচ্চ ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করবো।

 ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা এবং অ্যাডাপ্টিভ লার্নিং (Personalized Learning)

শিক্ষার্থীদের শেখার গতি এবং বোঝার ক্ষমতা এক নয়। এআই টুলগুলো শিক্ষার্থীদের ডাটা বিশ্লেষণ করে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পড়াশোনার কনটেন্ট বা লেকচার সাজিয়ে দেয়।

উদাহরণ: যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি (ASU) এবং ক্যান্টন কলেজ এআই-চালিত লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে। এর ফলে গণিত বা বিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ফেল করার হার প্রায় ৫০% কমে গেছে।

এআই-চালিত ভার্চুয়াল টিউটর এবং ২৪/৭ অ্যাসিস্ট্যান্ট

শিক্ষক বা টিএ (Teaching Assistant)-দের ওপর চাপ কমাতে এবং শিক্ষার্থীদের যেকোনো সময় প্রশ্নের উত্তর দিতে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করা হচ্ছে।

উদাহরণ: জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (Georgia Tech) প্রফেসর অশোক গোয়েল “Jill Watson” নামে একটি এআই টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরি করেন। এটি শিক্ষার্থীদের ইমেইল ও ফোরামের প্রশ্নের উত্তর এতটাই নিখুঁতভাবে দিত যে, শিক্ষার্থীরা বুঝতেই পারেনি জিল কোনো মানুষ নয়, বরং একটি এআই।

অটোমেটেড গ্রেডিং এবং মূল্যায়ন (Automated Grading)

শিক্ষকদের খাতা দেখা বা অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়নের সময় বাঁচাতে এআই স্ক্রিপ্ট রিডার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বহুনির্বাচনী প্রশ্নের পাশাপাশি বর্ণনামূলক উত্তরও যাচাই করতে পারে।

উদাহরণ: চীনের বেশ কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন এবং প্লেজিয়ারিজম (লেখা চুরি) সনাক্ত করতে উন্নত এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করছে।

 ড্রপআউট পূর্বাভাস ও শিক্ষার্থী ধরে রাখা (Predictive Analytics)

কোন শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে বা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যেতে পারে, এআই ডাটা বিশ্লেষণ করে তা আগেভাগেই শিক্ষকদের সতর্ক করে দেয়।

উদাহরণ: অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টুয়ার্ট বিশ্ববিদ্যালয় (CSU) শিক্ষার্থীদের অনলাইন পোর্টাল ব্যবহারের প্যাটার্ন এবং গ্রেড বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে এবং তাদের বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করে।

উন্নত চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা (Medical & Scientific Research)

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ল্যাবরেটরিতে নতুন ওষুধ আবিষ্কার, ক্যানসার কোষ শনাক্তকরণ বা জলবায়ু পরিবর্তনের মডেল তৈরিতে এআই-এর ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে।

উদাহরণ: যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) এআই মডেল ব্যবহার করে কোটি কোটি রাসায়নিক যৌগ স্ক্রিনিং করে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেছে, যা মানুষের করতে কয়েক বছর সময় লাগত।

প্রশাসনিক ও ভর্তি প্রক্রিয়া সহজীকরণ (Smart Administration)

ভর্তি পরীক্ষার আবেদন যাচাই, আসন বরাদ্দ এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রশ্নের উত্তর দিতে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।

উদাহরণ: সিঙ্গাপুরের নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি (NTU) তাদের প্রশাসনিক কাজে এবং ক্যাম্পাস গাইড হিসেবে এআই-চালিত ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করে, যা ভর্তি প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করেছে।

মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সাপোর্ট (Mental Health Support)

শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা বা পরীক্ষার ভীতি দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন এআই থেরাপিস্ট বা চ্যাটবট ব্যবহার করছে।

উদাহরণ: যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেশ কিছু ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় “Woebot” বা এই জাতীয় এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ২৪ ঘণ্টা মানসিক স্বাস্থ্যের প্রাথমিক সাপোর্ট প্রদান করে।

 লাইব্রেরি ও তথ্য ব্যবস্থাপনা (Smart Libraries)

লাইব্রেরিতে লাখ লাখ বই ও গবেষণাপত্রের মধ্য থেকে শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় তথ্যটি মুহূর্তের মধ্যে খুঁজে দিতে এআই কাজ করছে।

উদাহরণ: দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (SNU)-এর লাইব্রেরিতে এআই সার্চ অপ্টিমাইজেশন এবং রোবোটিক বুক-শর্টিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের রিচার্স পেপার খোঁজার সময় বাঁচিয়ে দেয়।

 ক্যাম্পাস নিরাপত্তা ও স্মার্ট নেভিগেশন (Campus Security)

বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ট্রাফিক বা পার্কিং নিয়ন্ত্রণে এআই ক্যামেরা ও সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে।

উদাহরণ: সৌদি আরবের কিং আবদুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (KAUST) তাদের পুরো ক্যাম্পাসকে একটি ‘স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলেছে, যেখানে এআই ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং স্বয়ংক্রিয় শাটল বাস চলাচল করে।

ক্যারিয়ার গাইডেন্স ও চাকরি প্রাপ্তিতে সহায়তা (Career Services)

শিক্ষার্থীদের সিভি (CV) মূল্যায়ন করা এবং তাদের স্কিল অনুযায়ী কোন চাকরিটি উপযুক্ত হবে তা নির্ধারণে এআই সাহায্য করছে।

উদাহরণ: কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল এমন কিছু এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যা শিক্ষার্থীদের মক ইন্টারভিউ নেয় এবং তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও কথা বলার ধরন উন্নত করার পরামর্শ দেয়।

সংক্ষেপে: উন্নত বিশ্বের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত বড় আকারের গবেষণা এবং নীতিনির্ধারণী এআই তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে, অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের একাডেমিক সেবার মান বাড়াতে এবং শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে কাস্টমার সার্ভিস ও লার্নিং ম্যানেজমেন্টে এআই বেশি ব্যবহার করছে।

এখন আমরা চিন্তা করতে পারি আমাদের দেশের সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিভাবে ব্যবহার করে এর সুফল ঘরে তুলতে পারি।

– জাহাঙ্গীর আলম শোভন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply