বিয়ের পরে মেয়েদের বাপের বাড়ির অতিথি বানাবেন না।
আমাদের পুরুষপ্রধান সমাজ-ব্যবস্থায় বিয়ের পর মেয়েদেরকে স্বামীর সাথে বসবাস করার জন্য তার বাড়িতে যেতে হয়। কারণ এখানে স্বামীকে স্ত্রীর সব ধরনের দায়িত্ব নিতে হয়। হাজার বছরের প্রথায় এটা গড়ে উঠেছে। ধর্মীয়ভাবেও প্রচলনটি একই হলেও ধর্মে বিশেষ করে ইসলামে েএর কোনো বাধ্য বাধকতা নেই। আর হিন্দুধর্মের কথা বলতে গেলে সারা ভারতবর্ষে হিন্দু ধর্মে শাস্ত্রীয় বিধি যাই থাকুক সামাজিক বিধি নানারকম রয়েছে। দেখাগেল দক্ষিণ ভারতে যা নিষিদ্ধ উত্তর ভারতে তাই সিদ্ধ।
কেন নারীকে বাপের ভিটে ত্যাগ করতে হয়।
প্রাণী জগতে কিঞ্চিত বুদ্ধিমান প্রাণীরা যুগল একসাথে বসবাস করে এছাড়া সন্তান উৎপাদন, পরিবার গঠন ও পরিবারের নানা সমস্যা সমাধানে মনুষ্যযুগলদেরও একসাথে বসতি স্থাপন করতে হয়। যেহেতু আমাদের সমাজে সাধারণত রোজগারের দায়িত্ব পুরুষের সে জন্য পুরুষের সুবিধা বিবেচনায় হয়তো নারীকে তার নিজের গৃহত্যাগ করতে হয়।
আরেকটি কারণ কাজ করতে পারে সেটা হলো হাজার বছর ধরে যেহেতু আমাদের দেশে সনাতন ধর্ম বজায় ছিল যেখানে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নেই। বাপের বাড়ির সম্পত্তিতে নারীর অধিকার না থাকলে বাপের বাড়িতে সারা জীবন কাটানোর প্রথাও থাকবে না, সমাজ হয়তো বিষয়টি েএভাবে রপ্ত করে নিয়েছে।
আবার ইসলাম আসার পর বাপের সম্পতিতে নারীরা অধিকার পেয়েছে অর্ধেক আবার সেটাও তাকে দেয়ার চর্চা নেই। অন্যদিকে সন্তান জন্মের পর নারীদের সবচেয়ে আপন হয় তার নাড়ীছেড়া ধন। তাদের আবার অধিকার হলো তাদের পৈত্রিক সম্পতিতে। ফলে নারী গাড়ছড়া ওই স্বামীর ভিটেতেই হয়।
যদিও কতজন নারী স্বামীর ভিটেয় নিজেকে শেষ পর্যন্ত শেকড়বন্ধী করতে পারে আর কত জনইবা তার প্রাপ্য অধিকার কিংবা রমনীয় আর মাতৃত্বের রাজত্ব পায় সেটা ভিন্ন একটা প্রসঙগ।
বিয়ের পর মেয়েরা কি বাপের বাড়ির অতিথি?
আজকের বিষয়টা হলো, মেয়েদের যখন বিয়ে হয়ে যায় তখন সে বাপের বাড়ির মেহমান হয়ে যায়। যে মেয়েটি বাবার রাজকন্যা ছিল মায়ের সারাদিনের অবলম্বন ছিল। ঘরে তার রাজত্ব ছিল। খুশিমতো চলতো ফিরতো, ঘুমুতো, ঘরের সব জায়গায় নিজের কাজ, জিনিস আর যত্নের ছোঁয়া থাকতো।
বিয়ের পর প্রথমে সে হারায় নিজের জিনিস সব জায়গায় রাখার অধিকার। যদি সম্ভ্রান্ত হয় তাহলে বড়োজোর বছর কয়েক তার জন্য একটা রুম থাকে। সে বেড়াতে আসলে সেখানে থাকে তার জিনিসপত্রও থাকতে পারে। আর যদি সেটা সম্ভব না হয় বা কিছুদিন পর তার মাত্র একটা আলমারি বা ওয়ারড্রোব থাকে। ভাইদের বিয়ে হয়ে গেলে তাদের বৌরা রাজত্ব কায়েম করে।
কিছুদিন বা বছর কয়েক পর মেয়েটির বাচ্চারা স্কুলে যায় তখন সে আগের মতো বাপের বাড়ি আসে না। তার জিনিসপত্রের পরিমাণ আসলে জিনিস পত্র বলতে তখন তার থাকে বাপের বাড়ি এসে পরার জন্য কিছু জামা কাপড়। বেশী হলো বড়োজোর ছাত্রজীবনের একটি ডায়রী, কিংবা অ্যালবাম আর স্মৃতি। স্মৃতি রাখার জন্য হয়তো কোনো আলমারি সিন্দুক লাগে না। কিন্তু ঘর পুরনো জিনিসের বিদায়ের সাথে সাথে অনেক স্মৃতিও মুছে যায়।
সে আলমারি কয়েকদিন পর মাত্র একটি তাক বা ড্রয়ারে নেমে আসে। আর কোনো কারণে সেটি বদলে গেলে বিশেষ করে বাবা মা মারা যাওয়ার পর আর কিছুটি থাকে না। বাড়ির মালিক বিনা নোটিশে বহিরাগত হয়ে যায়।
এই কষ্টটা মেয়েদের মনে দক্ষিনাসমীরনের মতো শন শন করে বাজে। কিন্তু আমরা তা দেখিনা বা শুনি না। সুখী রমনীরা নিজেরা হয়তো সব সময় নিজের মনের সে সমীরণ টের পান না কিন্তু যারা স্বামীর সংসারে সুখ পাননি তাদের কাছে এই কষ্টটা ব্যথা হয়ে বাজে হয়তো বা কখনো আপন মনে সুখের স্মৃতি হয়ে হিমেল পরশ দিয়ে যেতেও পারে তারপরও সে সুখ হারানোর কষ্ট দীর্ঘশ্বাস হয়ে হৃদয় ঝলসে দিয়ে যায়।
যে বাড়ি তার ছিল সেটি কেন তার নয়?
আমার এই লেখাটি হলো বাপের বাড়ির লোকদের জন্য তারা যেন বিয়ে হয়ে যাওযা, মেয়ে, বোন, ফুফুকে কিছুটা অধিকার ভালবাসা আনন্দ দিয়ে সুখের ভাগীদার করে নেয়। কি কি হতে পারে সে আনন্দের মাধ্যম।
* বিয়ে হওয়ার পরই বাপের বাড়ির সবকিছু তার জন্য বদলে দিবে না। যতদিন সমভব আগের মতোই রাখুন। হয়তো যাদের ভাই নেই তাদেরকে থাকে। আর যাদের ভাই আছে তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত বদলে যায়। ভাবী থাকলে আরো দ্রুত। আর মা বাবা না থাকলেতো বলাই বাহুল্য। তবুও যতদিন সম্ভব রাখুন। বিশেষ করে যদি মেয়েটির ভাল আর যাওয়া থাকে। আর যদি না থাকে। তাহলে নিচের বিষয়গুলোর মাধ্যমে মেয়েটিকে কিছুটা তার রাজত্বের স্বাদ দেয়া যেতে পারে।
• বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েদের জন্য বাড়িতে একটি কামরা রাখুন। যেখানে তারা বা সে আসলে থাকবে। সে কামরায় তার কিছু জিনিসপত্র তার নিজের মতো করে রাখুন। যাতে সে মনে করে বাপের বাড়িতে এখনো তার কিছু আছে। সম্ভব হলে সে কামরাটির নামও তার নামে রাখুন।
• যতদিন সম্ভব হয় তার একটি জিনিস আলমিরা, ওয়ার্ডরোব রাখুন। এটাও যেন সে নিজের মতো করে রাখতে পারে। সম্ভব হলে তার লাগানো গাছ রাখুন। সেটির যত্ন নিন। ফল ধরলে তাকে পাঠান এবং তার জন্য রেখে দিন।
• তার বানানো কোনো শিল্প থাকলে সেটিকে ঘরে সংরক্ষণ করুন বা ভাল জায়গায় প্রদর্শণ করুন।
নিয়মিত তার সাথে যোগাযোগ রাখুন। দরকারী কথার বাইরে তার গাছের ফল, পুকুরের মাছ এসবের গল্প করুন।
• যতদিন সম্ভব হয় তার ভাইদের জন্য কিছু কিনলে বা তার বৌদিদের জন্য কিছ কিনলে তাকেও সে তালিকায় রাখুন।
• খুব খুবে ছোট ছোট পারিবারিক প্রোগ্রামেও তাকে বাদ দেবেন না।
• কথা বলার সময় তুমিতো এখন নাই। এখানে তোমার কিছু নেই। এসব না বলে বলুন। এটাইতো তোমার বাড়ি। এখানেতো তোমার সব। এটা বললেই তাকে সব দিয়ে দিতে হবে না। সব মেয়ে হয়তো এক রকম নয়। এভাবে বলার পর কোনো মেয়ে যদি ভাইয়ের সংসারে অযাচিত নাক গলায় সেটাও তাকে বুঝিয়ে বলুন। তিরষ্কার করে নয়।
• মেয়ে বেড়াতে আসলে তাকে বাড়ি থেকে কোনো উপহার দেয়ার চেষ্টা করুন, গাছের ফল পুকুরের মাছ কিংবা কারো বানানো কোনো জিনিস।
মেয়েদের সাথে আচরণ, সম্পত্তি, সম্পর্ক এগুলো নিয়ে অনেক লেখা রয়েছে। তাই এই লেথায় সেসব বিষয় আনা হলো না।
মেয়েদের কষ্টকে লাঘব করার জন্য এই লেখাটি। কোনো কারণে দূর্ভাগ্যের ফেরে পড়ে কোনো মেয়ে যদি বাপের বাড়ি ফিরে আসে। তাদের বিষয়টি নিয়ে অন্য একদিন লিখব।
ধন্যবাদ
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ছবি: Pixabay

