বায়তুল হিকমাহ: বাগদাদের ঐতিহাসিক লাইব্রেরি ও জ্ঞানের উৎসমুখ
আব্বাসীয় খেলাফতের সময়কালে বাগদাদ হয়ে উঠেছিল বুদ্ধিবৃত্তিক এবং অর্থনৈতিক উৎকর্ষের কেন্দ্রস্থল। জ্ঞানের এই ঐতিহাসিক যাত্রায় এক অনন্য উদাহরণ হলো বাগদাদের বিখ্যাত লাইব্রেরি বায়তুল হিকমাহ বা “হাউজ অব উইজডম”। এটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ গ্রন্থাগার এবং বিজ্ঞান, দর্শন ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সমৃদ্ধ কেন্দ্র।
প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের গল্প
বায়তুল হিকমাহর ধারণা আসে আব্বাসীয় খেলাফতের দ্বিতীয় খলিফা আল-মনসুরের সময়। তিনি বাগদাদকে উমাইয়া খলিফাতের রাজধানী দামেস্কের প্রতিস্থাপন হিসেবে গড়ে তোলেন। আল-মনসুর সাসানিদ সাম্রাজ্যের জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে বাগদাদে একটি “খিজানাত আল-হিকমাহ” (Library of Wisdom) গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন।
এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন খলিফা হারুন আল-রশিদ। ৭৮৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি রাজকীয় গ্রন্থাগারের একাংশ সবার জন্য উন্মুক্ত করেন। তার উজির ইয়াহইয়া আল-বারমাকির উদ্যোগে এই লাইব্রেরি পরিণত হয় বিশাল আকারের একটি জ্ঞানকেন্দ্রে।
চূড়ান্ত উৎকর্ষের সময়
৮১৩ থেকে ৮৩৩ সালের মধ্যে খলিফা আল-মামুনের শাসনকালে বায়তুল হিকমাহ তার চূড়ান্ত উৎকর্ষে পৌঁছে। আল-মামুন কেবল গ্রন্থাগারের আকার বৃদ্ধি করেননি, এখানে স্থাপন করেন একটি মানমন্দির। এছাড়া, তিনি সিসিলি ও অন্যান্য অঞ্চলের লাইব্রেরি থেকে গ্রন্থ সংগ্রহ করে আনার নির্দেশ দেন।
একটি কিংবদন্তি সংগ্রহ
বলা হয়, সিসিলি থেকে বই আনতে তিনি ৪০০ উট ব্যবহার করেছিলেন। এ লাইব্রেরিতে গ্রীক, সংস্কৃত, ল্যাটিন এবং অন্যান্য ভাষার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহ অনুবাদ করা হতো। অনুবাদকদের অনুপ্রাণিত করতে তিনি প্রতিটি অনূদিত গ্রন্থের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ পুরস্কার হিসেবে দিতেন।
জ্ঞানের ধারা ও বিজ্ঞানীদের ভূমিকা
বায়তুল হিকমাহর সাথে জড়িত ছিলেন বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানী ও দার্শনিকেরা।
মুসা আল-খাওয়ারিজমি: বীজগণিতের জনক এবং আধুনিক অঙ্কশাস্ত্রের প্রবক্তা।
বনু মুসা ভ্রাতৃত্রয়: যন্ত্র প্রকৌশল এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রেখেছেন।
হুনায়ন ইবন ইশহাক: খ্রিষ্টান চিকিৎসক এবং অনুবাদক, যিনি গ্রীক পাণ্ডুলিপিগুলো আরবিতে অনুবাদ করেছিলেন।
লাইব্রেরি ছিল বহুভাষিক, যেখানে আরবি, ফারসি, হিব্রু, গ্রীক এবং অন্যান্য ভাষার সমন্বয়ে কাজ হতো। এতে জ্ঞানের কোনো জাতি বা ধর্মীয় বিভাজন ছিল না।
ধ্বংসের পথে যাত্রা
আল-মামুনের মৃত্যুর পর বাইতুল হিকমাহর গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যায়। ১২৫৮ সালে মোঙ্গল সেনারা বাগদাদ ধ্বংস করে এবং বাইতুল হিকমাহ পুড়িয়ে দেয়। টাইগ্রিস নদীতে গ্রন্থাগারের অমূল্য পাণ্ডুলিপি ফেলে দেওয়া হয়, যা নদীর পানি কালো হয়ে যায় বলে কথিত আছে।
উত্তরাধিকার
বায়তুল হিকমাহ কেবল একটি লাইব্রেরি ছিল না, এটি ছিল জ্ঞানচর্চার একটি প্রতীক। এর ধ্বংস সত্ত্বেও এর প্রভাব অমলিন। পরবর্তীতে কায়রো, কর্ডোবা এবং আন্দালুসিয়ায় বিশাল লাইব্রেরি স্থাপিত হয়, যা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা অব্যাহত রাখে।
বায়তুল হিকমাহ কেবল আব্বাসীয় খেলাফতের নয়, পুরো মানব সভ্যতার একটি গৌরবময় অধ্যায়। এটি দেখিয়েছে, জ্ঞানের কোনো সীমানা নেই এবং একে ছড়িয়ে দিতে উদারতা ও পৃষ্ঠপোষকতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আজকের পৃথিবীতে শিক্ষা ও গবেষণায় এর ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
খলিফা হারুন আল-রশিদ রাজকীয় লাইব্রেরির সংগ্রহের একাংশ উন্মুক্ত করে দেন; Image Source: ancient-origins.net
সূত্র: রোয়ার বাংলা

