বাংলাদেশে বসবাস

বাংলার লোক সাহিত্য ও আজকের প্রেক্ষাপট

বাংলার লোক সাহিত্য ও আজকের প্রেক্ষাপট

– Jahangir Alam Shovon

লোকজ ঐতিত্যের বিষয়গুলোকে যদি আমরা আলাদা আলাদা ভাবে দেখতে চাই তাহলে বিষয়গুলো হবে এমন লোকসাহিত্য, লোকশিল্প, লোকসংস্কৃতি আরো গভীরে গেলে বেরিয়ে আসবে, লোক ক্রীড়া, লোকজ আচার অনুষ্ঠান, লোকজ বিনোদন। এগুলোর মধ্য হতে বেরিয়ে আসবে লোকগান, লোকজগল্প, ছড়া, নৃত্য ইত্যাদি। আচরণ ও জীবন-জীবিকাও হয়ে আসতে পারে লোকসাহিত্যের মূলসূত্র হিসেবে। কিছু বিষয় আমাদের আধুনিক জীবনের বিনোদনের অন্যান্য অনুসঙ্গ হিসেবে ফুটে উঠেছে, এর মধ্যে অন্যতম হলো- গান ও নাচ, পাশাপাশি কিছু অনুষ্ঠান, শিল্প-সংস্কৃতি তো আছেই আর আচারের ক্ষেত্রে বলতে গেলে বাঙালি তার নিজস্বতা অনেকখানি ধরে রেখেছে, অনেক নতুন কিছু গ্রহণ করার পরও।

লোকসাহিত্যে একটা সুন্দর ব্যাপার হলো, লোকসাহিত্য প্রাচীন হয়েও আধুনিক। লোক সাহিত্য প্রাচীন কারণ তা আমাদের আবহমান বাংলার রুপ প্রকাশ করে এবং শেকড়ের কথা বলে। এবং কোনো কোনো লোক সাহিত্য শত বছর আগের সৃষ্টি আধুনিক এ জন্য যে এর আবেদন চিরন্তন। সংস্কৃতি পরায়ণ জাতি তার লোকজ সংস্কৃতি থেকে যুগে যুগে তুলে আনে নবতর সাহিত্যের অনুষঙ্গ। আমরা আজো আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি দিয়েই প্রমাণ করি আমরা কতটা সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক। রমনার বটমূলে আমরা নবান্নের গান গাই। শিল্পকলা একাডেমীতে হাসুলির জীবন দেখি। মুক্তাঙ্গনে ফাগুনের রং মাখি। ইট, কাঠ দেয়ালের খাঁচায় বসে পান্তা ইলিশ করি বৈশাখে লাল সাদায় টেলিভিশনের পর্দায় হরদম নাচি। আর এভাবেই আমাদের লৌকিক জীবনের অনুসঙ্গগুলো ও প্রাচীন জীবনের গল্প গাঁথাগুলো আধুনিক শিল্পের অংশ হয়ে বিনোদনের ক্ষেত্র আর গৌরবের উপকরণ হয়ে আছে।

জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যাপক মিশ্রণ ঘটেছে। বৈদেশিক চিন্তা-ভাবনার আমদানি, ধর্মীয় শিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতার প্রভাবে এমনটা সারা পৃথিবী জুড়েই ঘটছে। লোকগানের যে চর্চা বর্তমানে টিকে আছে তার বিভিন্ন ক্ষেত্র আছে। শহরে জীবনে নিছক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে তাকে মনে রাখার চেষ্টা। কতিপয় আধুনিক গায়ক ও গানওয়ালা কতৃক তাকে নগরবাউল বানানোর কসরত। তবে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে লোকগানের কথা তাদের প্রাণের কথা। মাটির কাছে থাকা মানুষদের কাছে তা এখনো জীবনের বচন। বাউল সাধকদের কাছে তাদের গান সাধন-ভজন। নৃত্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

লোকজ সেইসব অনুষ্ঠানের কথা বলতে গেলে বলতে হয় তা ক্রমশ পিছু হটছে। যাত্রাপালা হয়ে পড়েছে মফস্বল কেন্দ্রিক তাও নগন্য প্রয়াস, কবিগান পালা গান, পুঁথি পাঠ, গীতিকা এসবের খবর কদাচিৎ শোনা যায়। আধুনিক বিনোদনের উপাদান এসবকে হটিয়ে দিচ্ছে ক্রমশ। পুতুল নাচও তাই, নবান্ন উৎসবে আগের সেই প্রাণ পাওয়া যায় না। পিঠাপুলির সেই আমেজ নেই। নেই উৎসব মুখরতা। জন্ম, বিবাহ ইত্যাদি অনুষ্ঠানের আদল ভেঙ্গে কেবল ভোজ অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতিতে স্মরণে রাখতে নগর জীবনের মাঝে মধ্যে আধুনিক গণমাধ্যমে নানা আয়োজন চোখে পড়ে। তবে জীবন ঘনিষ্ঠ আচারসমূহ সেভাবে ফুটে উঠেছিলো সে আকারে তা আর সংরক্ষণ করা হচ্ছে না।

লোক সঙ্গীতের ছক পরিবর্তন করা হচ্ছে। গায়কী, সুর ভেঙ্গে আধুনিক উপকরণ নির্ভর করে তোলার যে প্রয়াস তাকে থামানোর কায়দা মুক্ত সংস্কৃতির যুগে নেই বললেই চলে। সেটা খুব জরুরীও নয়। জরুরী হলো নতুনের সাথে পুরাতনকেও বাঁচিয়ে রাখা। তবে আমরা যদি নতুনত্ব পাশাপাশি মৌলিক ও আসল রুপটাও ধরে রাখতে পারি করতে পারি সে ধ্রুপদী চর্চা আমাদের অতীতকে ধরে রাখতে সাহায্য করবে। তবেই আমাদের সংস্কৃতির পেছনের শেকড় বাঁচিয়ে রাখা যাবে।
লোক সংস্কৃতির কয়েকটা শাখা এখনও চরম অবহেলিত। নিছক আনুষ্ঠানিকতা বা লোক দেখানো দরদ নিয়েও এসবের প্রতি আজ অবধি কেউ এগিয়ে আসেনি বা আসছে না। তার একটি শাখা হচ্ছে লোকজ খেলাধুলা। শাইখ সিরাজের কৃষকের ঈদ আনন্দ ফোকলেইন বাংলাদেশের লোকখেলা প্রদর্শনী ব্যতীত এ বিষয়ে আজ অবধি কোনো কর্মসূচি চোখে পড়েনি। সম্প্রতি নেত্রকোনায় কতিপয় শিক্ষার্থীরা কিছু হারিয়ে যাওয়া লোকখেলা সংগ্রহ করেছে বলে শুনেছি। আমার নিজের কিছু সংগ্রহ আছে যদিও সেটা খুব বড়ো নয়। স্থানীয় ভাবে অবশ্য কবুতর দৌড়, ঘুড়ি উৎসব ও নৌকাবইচের কিছূ উদ্যোগ চোখে পড়ে।
অথচ আমাদের গ্রামীণ খেলাসমূহ যেমনি মনোমুগ্ধকর তেমনি আনন্দদায়ক। শরীর ও মনের স্বত:স্ফূর্ততার জন্য বাঙালির গ্রামীণ জীবনে এসবের প্রভাবের কখনোই ঘাটতি ছিলো না। অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা যায় লোকজ আচার-অনুষ্ঠানের অনেকগুলোই এখন অন্তরাল হয়ে গেছে।অত্যাবশ্যকীয় অনুষ্ঠানগুলোর লোকজ রুপ বদলে যাচ্ছে দ্রুত। যদি শুধু বিয়ের কথাই বলি। মূল অনুষ্ঠান পর্ব ছাড়া সবই বদলে গেছে। বাঙালির বিয়ের আগের ও পরের আনুষ্ঠানিকতা বদলে গিয়ে আধুনিকায়িত হওয়ার পরও কিছু পর্ব রয়ে গেছে। যেমন গায়ে হলুদ, প্রীতিভোজ, ফিরানী, ফর্দ ইত্যাদি। এগুলোতে হিন্দি ভাষার টিভি চ্যানেলে দেখানো অনুষ্ঠানের অনুকরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। অঞ্চলে বিশেষে আরো কিছু আনুষ্ঠানিকতার এখনও প্রচলন আছে।
এসব অনুষ্ঠান আধুনিক কমিউনিটি সেন্টার বা ক্লাবে বাঙালির চিরন্তন রুপে আর ধরা দেয় না। নিজেদের সংস্কৃতির রুপকথা চাঁদের আলোয় বসে দাদী-নানীর মুখে শোনার দিন শেষ। ঐ সময়ে শিশুদের স্কুলের পড়া তৈরি করতে হয়। আরব্য রজনী, মহাভারতের কাহিনী, গ্রীক ও রোমান গল্পগুলো প্রযুক্তির ছোঁয়া দিয়ে নতুন করে উপভোগ করছে একবিংশ শতাব্দীর আইটি যুগের মানুষ। দু:খের বিষয় হলেও সত্য যে বাংলাদেশে এসবের দিকে এখনও নজর দেয়া হচ্চে না। এমনকি কার্টুন করার উদ্যোগও সীমিত। অথচ আমাদের লোকপুরান, রুপকথা, কিংবদন্তী গীতিকাগুলোর গ্রীক আর লাটিন সভ্যতার ন্যায় নতুনভাবে স্বাদ নিতে পারি। শেক্সপিয়র আর হোমারের গল্পগুলোতে তাদের পুরানেরই প্রকাশ।
একটা বিষয় বাঙালি এখনো ধরে রাখতে পেরেছে। সেটা হলো আচার। একে অবশ্য লোকজ কালচার না বলে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি বলাই ভালো। পারিবারিক সুদৃঢ় ও সুন্দর বন্ধনজনিত বাপ, বেটা, মা, মেয়ে তাদের সম্পর্ক ও পারস্পরিক আচরণ বাদ দিলেও পারিবারিক আচারের ক্ষেত্রে বাঙালির কিছু নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। আছে প্রতিপালনীয় আচার যেমন- নববধূ মানেই একটু বেশি শিষ্টাচার চর্চা। শালী মানেই ইয়ার্কি মশকরার সম্পর্ক আর জেঠাস মানে মুরব্বি। দেবর মানেই একটু মিলেমিশে, ভাসুর মানেই দূরত্ব। ছেলের শ্বশুর বাড়ি মানে আদর আপ্যায়ন। জামাই মানে অতিভদ্রতা। এছাড়া দূরতম ও নিকটতম প্রতিটি সম্পর্ক নিয়েই আচরণের বিশেষ ব্যাকরণ এখনো বাঙালি সমাজে প্রচলিত। বাবার সামনে ধূমপান করা বাঙালি সমাজে এখনো নাজায়েজ বলেই ধরা হয়।

পেশার পরিবর্তন হচ্ছে বা হয়েছে। কিন্তু বাঙালির বিশ্বাসের পরিবর্তন তেমনটা হয়নি। নতুন দোকান মানেই মিলাদ তবারক, নতুন চাকরি মানেই মিষ্টি, নতুন ফসলে নবান্ন, নতুন ধানে মসজিদে শিন্নী। প্রাচীন পুঁথি আর দলিল দস্তাবেজে বাঙালীর তাবিজ কবয প্রীতি আর তন্ত্র মন্ত্রের যে ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশী সময় ধরে চলে আসছে তা আজো সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্দ, মগ সকলেই এই তেলপড়া পানিপড়ার মতো দাওয়ার উপর এখনো ভক্তি করে থাকে। গ্রামে গঞ্জে এখনো কদাচিত দেখা যায় মুমুর্ষ রোগীর জন্য তাবিজ কবজ নিয়ে চলছে দৌড়ঝাপ। একে হয়তো আমরা সংস্কৃতি বলি না বলি কু-সংস্কৃতি বা কু-সংস্কার। এসব কবে কখন কিভাবে চালু হয়েছে তা এখন হদিস করা কঠিন। আজ হয়তো বিশ্বাসের সাথে সংঘর্ষ, বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও যুক্তির উন্নয়ন এর কারণে আমরা সহজে এসব আচারকে কুসংস্কার বলে চিহ্নিত করতে পারি। আজ যে আমরা শান্তির জন্য পায়রা উড়াই, মৃতের জন্য প্রার্থনা বা নিরবতা পালন করি। কে জানে তিনশ বছর পর এসবকেই না জানি বলা হয় ভুল সংস্কার। তখন যুক্তি থাকবে পায়রার সাথে শান্তির কি সম্পর্ক যদি আপনি জনসম্মুখে এসে শান্তির কথা বলে পায়রা উড়ান বা নিজ দলের লোকদের মানুষ হত্যা করার হুকুম দেন। অথবা একজন মানুষ মারা গেছে তার পাপ পূন্যই তার পরিণতি ঠিক করবে তার জন্য প্রার্থনা করার কি প্রয়োজন হবে। অথবা যে মরে গেছে তার জন্য এক মিনিট সময় নষ্ট করারইবা কি দরকার!
কিছু কিছু আচার হয়তো আমাদের পরিচয়জনিত সংস্কৃতির মতো। সেগুলো বিশ্বাস থেকে জন্ম হয়নি বরং প্রয়োজন থেকে তৈরী করা হয়েছে। বাঙালির গরমের চিরন্তন বন্ধু হাতপাখা হারিয়ে যায়নি কখনো তা গরমের বন্ধু, কখনো সৌন্দর্যবর্ধক আবার কখনো শিল্পিত উপাদান। আজ নকশীকাঁথা আধুনিক জীবনের অনুসঙ্গ হয়ে পড়েছে। গাঁয়ের মেয়েদের হাতের ফুলতোলা পাঞ্জাবী না পরলে শহুরে মানুষদের সাজসজ্জায় পরিপূর্ণতা আসে না।

আমরা কতটা প্রাচীন ধরে রেখেছি? কতটা প্রাশ্চাত্যকে গ্রহণ করেছি? কতটা নিজেদের জন্য নতুনকে তৈরী করেছি? আর কতটা মিশ্রণ করে নিয়েছি তার সঠিক হাল হাকিকত বের করার জন্য গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা কতটা পুরানকে ধারণ করতে পেরেছি এবং তা আরো কতদূর বয়ে নিয়ে যেতে পারবো? সেটা হয়তোবা আপেক্ষিক। আমরা কতটা ভিনদেশী সংস্কৃতিকে আচার বানিয়ে নিয়েছি এবং সেটা কতটা ধারণ করছি? তা কিন্তু আমাদের চোখের সামনে বিরাজমান। নিজেদের সংস্কৃতি থেকেই কতটাইবা নতুন আস্বাদন করছি? তা কেবল উপলব্দিরি চেতনার বিষয়। আমরা প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্য, লোকজ ও আধুনিক সংস্কৃতির কতটা সংমিশ্রণ তৈরি করেছি। তা আমাদের কোথায় নিয়ে দাড় করাবে তা কেবল সময়ই বলে দেবে। তবে আমাদের চিরন্তন গৌরবের কৃষ্টকে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তাকে বাঁচাতেই হবে তাকে ধরে রাখতেই হবে।