বাংলাদেশের মোটর ভ্যাসেল শিল্প ও ব্যবসা
নির্মাণ, পরিবহন, মালিকানা ও লিজ কাঠামো
নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জীবনধারায় নৌপথের ভূমিকা অনন্য। দেশের প্রায় ২৪,০০০ কিলোমিটার নৌপথ এর মধ্যে প্রধানত ৬,০০০ কিমি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয়। নদীপথে পণ্য পরিবহন, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা ও দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরসমূহে পণ্য সরবরাহের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো লাইটারেজ ভ্যাসেল বা এমভি (Motor Vessel)।
এই ভ্যাসেলগুলো দেশে নিজস্বভাবে তৈরি হয়, দেশীয় উদ্যোক্তা ও কোম্পানিগুলো পরিচালনা করে এবং এগুলোর মাধ্যমে একটি বিশাল অর্থনৈতিক চেইন পরিচালিত হয়, যা বন্দর, কাস্টমস, লেবার, সরবরাহকারী থেকে শুরু করে দেশের বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।
এমভি ভ্যাসেল তৈরির ব্যবসা
দেশেই গড়ে উঠছে শিপইয়ার্ড
চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা অঞ্চলে বেশ কিছু শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড গড়ে উঠেছে, যারা অভ্যন্তরীণ নৌযান তৈরি ও মেরামতের কাজ করে। যেমন:
-
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড (চট্টগ্রাম)
-
মেঘনা শিপইয়ার্ড (নারায়ণগঞ্জ)
-
মের্সাস খান ব্রাদার্স শিপইয়ার্ড (মুন্সিগঞ্জ)
-
ইস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ইত্যাদি।
এখান থেকে বার্জ, ট্যাংকার, এমভি লাইটারেজ জাহাজ, ড্রেজার এমনকি মাঝারি আকারের সমুদ্রগামী জাহাজও তৈরি হয়। এগুলো আন্তর্জাতিক মানের হলেও মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে লক্ষ্য করে বানানো হয়।
নির্মাণ খরচ
একটি সাধারণ ১,৫০০-২,০০০ টন ধারণক্ষমতার লাইটারেজ ভ্যাসেল তৈরি করতে আনুমানিক ৪-৬ কোটি টাকা খরচ হয়। সাইজ, ইঞ্জিন, কাঠামো ও বিশেষ চেম্বারের মান অনুসারে খরচ কম-বেশি হয়।
সাধারণত এগুলো Mild Steel Plate দিয়ে নির্মিত হয় এবং দেশেই সবকিছু Fabrication হয়। ইঞ্জিন ও কিছু বিশেষ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে (চীন, জাপান, ভারত) আনা হয়।
এমভি লাইটারেজ দ্বারা মাল পরিবহন ব্যবসা
প্রধান কাজ কী?
-
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে বড় সমুদ্রগামী জাহাজ (মাদার ভ্যাসেল) থেকে কার্গো নামিয়ে এসব এমভিতে লোড করে ঢাকাসহ অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরে (নারায়ণগঞ্জ, মেঘনাঘাট, মাদারীপুর, বরিশাল, খুলনা, পাবনা) পাঠানো হয়।
-
চাল, গম, মিসর, সিমেন্ট ক্লিংকার, কয়লা, লোহা, ফার্নেস অয়েল, কেমিক্যাল এসবই প্রধানত বহন করে।
আকার ও সক্ষমতা
-
বাংলাদেশে ৫০০-৩,০০০ টনের এমভি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।
-
বছরে অভ্যন্তরীণ নদীপথে আনুমানিক ৭ কোটি টনের বেশি মাল পরিবাহিত হয়, যার সিংহভাগই এমভির মাধ্যমে।
কেন এভাবে লাইটারেজ প্রয়োজন?
কারণ চট্টগ্রামের জেটি/বার্থের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বড় জাহাজ সরাসরি ঢাকায় বা অন্য অভ্যন্তরীণ বন্দরে যেতে পারে না। ফলে লাইটারেজের মাধ্যমে মালকে নদীপথে ছড়িয়ে দিতে হয়। এতে বন্দর দ্রুত খালি হয় ও খরচও কমে।
মালিকানা, পরিচালনা ও অপারেশন
কে এই ব্যবসা চালায়?
-
দেশের প্রায় ৮০% লাইটারেজ ভ্যাসেল ব্যক্তি মালিকানাধীন বা পার্টনারশিপের মাধ্যমে চলে।
-
কিছুটা কর্পোরেট কোম্পানি যেমন Akij Shipping Line, Saif Powertec Marine, Kabir Steel, নিজেরাও এমভি ভ্যাসেল চালায়।
-
অনেকে এক বা একাধিক ভ্যাসেল নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে সরাসরি ব্যবসা করে।
পরিচালনা কিভাবে চলে?
-
নিজেরা সরাসরি ফ্রেইট চুক্তি করে, অথবা এজেন্ট নিয়োগ করে।
-
কিছু মালিক কোম্পানি ভ্যাসেল পরিচালনা করে “মাস্টার” বা “ক্যাপ্টেন” এর মাধ্যমে।
-
অনেক সময় আবার বড় ইমপোর্টার/ট্রেডাররা পুরো ভ্যাসেল “কনট্রাক্ট” বা “লিজ” নিয়েও চালায়।
লিজ ও কন্ট্রাক্ট ভিত্তিক ব্যবসা
ভ্যাসেল কন্ট্রাক্ট বা লিজ কিভাবে চলে?
-
বড় আমদানিকারক বা সিমেন্ট কোম্পানি পুরো ভ্যাসেল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া নেয়। এতে দৈনিক বা মাসিক ভাড়া নির্ধারিত থাকে।
-
যেমন ২০০০ টন ধারণ ক্ষমতার একটি এমভি দিনে আনুমানিক ১.৮-২.২ লাখ টাকা ভাড়া নিয়ে থাকে।
-
টন প্রতি ভাড়া হিসাবেও চলে, যেমন ৬০০-৭০০ টাকা/টন।
চুক্তির ধরন
-
“Time Charter” (নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া)।
-
“Voyage Charter” (প্রতি যাত্রার জন্য চুক্তি)।
-
এ ধরনের কনট্রাক্টে মালিক নাবিক, ফুয়েল, মেইনটেন্যান্স সামলায়, আর চার্টারার শুধু মাল লোড-আনলোড করে।
সমস্যাসমূহ
নৌযান নির্মাণ ও মেরামতে সমস্যা
-
এখনো অনেক ছোট ইয়ার্ডে মানসম্পন্ন টেস্টিং সুবিধা নেই।
-
দক্ষ ওয়ার্কশপ, ওয়েল্ডার, মেরিন ইঞ্জিন মিস্ত্রির ঘাটতি।
-
ইন্সুরেন্স কাভারেজ পেতে জটিলতা।
নদী খনন ও নাব্যতা
-
বহু নদীতে নাব্যতা কমে যাওয়ায় লোড কমিয়ে চালাতে হয়। এতে খরচ বাড়ে, লাভ কমে।
ব্যাংকিং ও অর্থায়ন সমস্যা
-
এমভি তৈরি বা কিনতে সহজ লোন পাওয়া যায় না।
-
শিপ মর্গেজ বা চলমান ভ্যাসেলকে জামানত হিসেবে সহজে নেয় না অনেক ব্যাংক।
আইনগত ও প্রশাসনিক ঝামেলা
-
সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতা পূর্ণ।
-
BIWTA / Mercantile Marine Department এর অনুমোদন পেতে ঘুষ ও দালালি অনেক সময় অস্বীকার করা যায় না।
সম্ভাবনা
কম খরচের লজিস্টিক
নদীপথে প্রতি টন পণ্য পরিবহনের খরচ রোড বা রেল থেকে অনেক কম। ফলে বাল্ক ট্রেডের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাইটারেজ চাহিদা অব্যাহত থাকবে।
দেশেই তৈরি হচ্ছে
দেশে নিজস্বভাবে শিপইয়ার্ডে তৈরি হওয়ায় আমদানি নির্ভরতা নেই। পাশাপাশি এই খাত থেকে হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিক তৈরি হচ্ছে।
রপ্তানি প্রবণতা
বাংলাদেশে তৈরি কিছু বাল্ক ভ্যাসেল ভারত-আফ্রিকা এমনকি মালদ্বীপেও যাচ্ছে। ভবিষ্যতে রপ্তানির সুযোগ আছে।
উপসংহার
লাইটারেজ (এমভি) ব্যবসা বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি নীরব চালিকা শক্তি। সিমেন্ট, কয়লা, গম, খাদ্যশস্য, এমনকি ফার্নেস অয়েল এর সরবরাহ এই ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।
সরকার যদি সহজ শর্তের লোন, BIWTA/মেরিন ডিপার্টমেন্টের সেবা সহজ করা, নদী খনন ও নাব্যতা রক্ষা এবং শিপ ইন্সুরেন্স কাভারেজ সহজ করার দিকে মনোযোগ দেয়, তাহলে এই খাত কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে আরও কয়েক লক্ষ কর্মসংস্থান হবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বহুগুণ মসৃণ হয়ে যাবে।

