“ডিজিটাল বাংলাদেশ” ধারণার মূল প্রতিশ্রুতি ছিল— সময় কম লাগবে, খরচ কমবে, অফিসে দৌড়ঝাঁপ কমবে
৪) সেবা এক জায়গায় পাওয়া যাবে, কাগজবিহীন (Paperless) প্রশাসন গড়ে উঠবে এবং ৬) ঘরে বসেই নাগরিক সেবা পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল সেবা নাগরিকবান্ধব না হয়ে নতুন ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি ও হয়রানির কাঠামো তৈরি করেছে।
প্রযুক্তিগত জটিলতা: “ডিজিটাল” কিন্তু কাগজের বোঝা
ডিজিটাল সিস্টেমে আবেদন করতে গিয়ে নাগরিকদের যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়:
-
প্রায় সব আবেদনেই স্ক্যান করা কাগজপত্রের কপি চাওয়া হয়
-
নির্দিষ্ট PDF ফরম্যাট বাধ্যতামূলক
-
ফাইল সাইজ লিমিট থাকে, যা সাধারণ ব্যবহারকারী বোঝেন না
-
ফাইল ছোট করতে গিয়ে ডকুমেন্টের লেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়
-
আবেদন বাতিল হলেও কোথায় ভুল হয়েছে তা পরিষ্কার জানানো হয় না
👉 ফলে ডিজিটাল সিস্টেম আসলে মধ্যস্বত্বভোগী, কম্পিউটার দোকান বা দালালের উপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
সার্ভার সমস্যা ও অকার্যকর পোর্টাল
বহু সরকারি ওয়েবসাইট ও অ্যাপ নিয়ে সাধারণ অভিযোগ:
-
নিয়মিত সার্ভার ডাউন
-
ব্রাউজার সামঞ্জস্য সমস্যা (“এই ব্রাউজারে কাজ করবে না”)
-
আবেদন জমা দেওয়ার শেষ মুহূর্তে সাইট অচল
-
কিছু সেবা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা
-
OTP, ভেরিফিকেশন কোড না আসা
এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়—মানুষকে বারবার সাইবার ক্যাফে/ইউডিসি যেতে হয়।
তথ্য নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার ঝুঁকি
ডিজিটাল সেবায় নাগরিকরা দিচ্ছেন: জন্ম সনদ, এনআইডি, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা, পারিবারিক তথ্য,
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে:
-
ডেটা সুরক্ষার মান কেমন?
-
তথ্য ফাঁস বা অপব্যবহার হলে দায় কার?
-
ডেটা বিক্রি বা অননুমোদিত প্রবেশ ঠেকাতে কার্যকর মনিটরিং নেই। এমন কি এই তথ্য চুরি নিয়ে অসংখ্য সংবাদ প্রকাশিত হলেও রাষ্ট্র বা সরকার নির্বিকার। কারণ প্রথমত এসব নীতি বা পলিসিতে তথ্য চুরির জন্য সরকারী কর্মচারীদের কোনো দায় রাখা হয়নি। দ্বিতীয়ত এসব সিস্টেম যারা চালায় তাদের উপর সরকার এক রকম জিম্মি হয়ে যায়।
নীতিগত ও কাঠামোগত দুর্বলতা
ডিজিটাল সিস্টেম তৈরির ক্ষেত্রে কিছু বড় সমস্যা লক্ষ্য করা যায়:
-
প্রকল্প ব্যয় বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি
-
স্বল্পমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি
-
সিস্টেম চালুর পর ঠিকমতো আপডেট বা উন্নয়ন হয় না
-
নির্দিষ্ট কোম্পানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়
-
সরকারি কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমিত
ফলে একসময় সিস্টেম “অচল কিন্তু চালু” অবস্থায় পড়ে থাকে — নাগরিক ভোগে, দায় কেউ নেয় না।
ডিজিটাল হয়রানি: ঘুষ ও অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রদানের নতুন পথ
ডিজিটাল সেবা দুর্নীতি কমানোর কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়:
ক) ইউডিসি ও স্থানীয় সেবা কেন্দ্র
-
নির্ধারিত ফি কম, কিন্তু নেওয়া হয় কয়েকগুণ বেশি
-
“সার্ভার সমস্যা”, “ফাইল ভুল”, “আজ হবে না” — এসব অজুহাতে ঘোরানো হয়
খ) পাসপোর্ট ও অন্যান্য যাচাই প্রক্রিয়া
-
পুলিশ ভেরিফিকেশন কমলেও
-
ফর্মে ত্রুটি দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা দাবি
-
অপ্রয়োজনীয় দালাল চক্র সক্রিয়
গ) শিক্ষা সংক্রান্ত ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন
-
স্কুল পরিবর্তনে জটিলতা
-
তথ্য সংশোধনে দীর্ঘসূত্রতা
ঘ) ভূমি সেবা ডিজিটাল হলেও
-
অনলাইন আবেদন
-
নির্ধারিত টাইমলাইন
তবুও বাস্তবে ঘুষ ছাড়া ফাইল এগোয় না—“ভুল ধরা” হয় চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে।
কৌশলগত জটিলতা: ধাপে ধাপে ফাঁদ
অনেক সরকারি ডিজিটাল আবেদনে দেখা যায়:
-
বহু ধাপ
-
আগেভাগে সম্পূর্ণ ডকুমেন্ট তালিকা নেই
-
মাঝপথে নতুন শর্ত
-
রিজেক্ট হলে শুরু থেকে আবেদন
এতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং শেষে বলে —
“টাকা দিলে যদি হয়, সেটাই দিই”
এভাবে ডিজিটাল সিস্টেম অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘুষের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা?
-
গ্রামাঞ্চলের মানুষ
-
কম শিক্ষিত নাগরিক
-
প্রবীণ ব্যক্তি
-
নারী ও প্রতিবন্ধী নাগরিক
-
ডিজিটাল ডিভাইস বা দক্ষতা নেই এমন মানুষ
যারা সবচেয়ে বেশি সেবার প্রয়োজনীয়, তারাই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার।
ডিজিটাল সেবার উদ্দেশ্য ছিল সহজীকরণ, কিন্তু বাস্তবতার বড় অংশে তা হয়ে উঠেছে:
| প্রত্যাশা | বাস্তব অভিজ্ঞতা |
|---|---|
| কাগজবিহীন | স্ক্যান কপি নির্ভর |
| সময় সাশ্রয় | বারবার আবেদন ও যাতায়াত |
| খরচ কম | দালাল ও অতিরিক্ত চার্জ |
| স্বচ্ছতা | প্রযুক্তিগত অজুহাতে গোপন দুর্নীতি |
| ঘরে বসে সেবা | সাইবার ক্যাফে নির্ভরতা |
করণীয় (নীতিগত সুপারিশ)
১. One-time document upload system (বারবার একই কাগজ না চাইলে)
২. আবেদন বাতিল হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভুল দেখানোর ব্যবস্থা
৩. সব সাইটে সরল বাংলা নির্দেশিকা + ভিডিও গাইড
৪. সার্ভার মনিটরিং ড্যাশবোর্ড পাবলিক করা
৫. নির্ধারিত ফি’র তালিকা পোর্টালে দৃশ্যমান + অভিযোগ বাটন
৬. ডেটা সুরক্ষায় স্বাধীন অডিট
৭. প্রতিটি ডিজিটাল সেবায় ধাপভিত্তিক ডকুমেন্ট তালিকা শুরুতেই দেখানো বাধ্যতামূলক
৮. ইউডিসি ও অফিসভিত্তিক গোপন গ্রাহক জরিপ (Mystery Audit)
৯. প্রযুক্তি নয়, সেবা-নকশা (Service Design) ভিত্তিক সংস্কার
ডিজিটাল সিস্টেম নিজে সমস্যা না — সমস্যা হচ্ছে অস্বচ্ছ নকশা, দুর্বল বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির অভাব। প্রযুক্তি যদি নাগরিকের নিয়ন্ত্রণে না গিয়ে আমলাতন্ত্র ও দালালচক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে “ডিজিটাল” শব্দটা কেবল নতুন মোড়কে পুরনো হয়রানিকেই টিকিয়ে রাখে।
বি:দ্র: লেখাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহযোগিতায় তৈরী করা হয়েছে।

