বাংলা ভাষায় কোরআনের অনুবাদ
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
‘অতপর (হে নবী), আমি এ (কোরআনকে তোমারই (মাতৃ)-ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে করে তারা (এর থেকে) উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।’ (সরা আদ দোখান, আয়াত ৫৮)।
কালামে হাকীমের এই আয়াতে আল্লাহ সোবহানাহু ওয়া তায়ালা কোরআনকে রসলের ভাষায় সহজ করে নাযিল করার কথা বলেছেন। যেন আরবের লোকেরা আল্লাহর নির্দেশনসমহ সহজে অনুধাবন করতে পারে। শুধু কোরআনই নয়। আল্লাহর প্রেরিত সকল অহীমালা সে অঞ্চলের স্থানীয় ভাষায় প্রেরণ করেছেন এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্য থেকেই রাসল নির্বাচন করেছেন যাতে আল্লাহ মনোনীত বার্তাবাহক লোকদেরকে তাদেরই ভাষায় আল্লাহর পথে ডাকতে পারেন। এতে করে স্থানীয় কওমের লোকেরা আল্লাহর আদেশ নিষেধ, মন্দকাজের পরিণাম ও ভালো কাজের পুরষ্কার স¤ক্সর্কে সহজভাবে ওয়াকেফহাল হতে পারে এবং সে অনুযায়ী আমল করতে পারে। সুতরাং মাতৃভাষায় আল্লাহর কিতাব চর্চা ও তা বোঝার গুরুত্ব প্রশ্নাতীত।
এ অঞ্চলে মুসলমানরা মাতৃভাষায় কোরআন চর্চার সচনা ঘটিয়েছেন অনেক দেরীতে। রসল (স.)-এর যুগে তিনি নিজে বিভিন্ন দেশে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যখন দত পাঠাতেন তখন এর সাথে দোভাষীও থাকতেন, অথবা দত নিজেই একাধিক ভাষা জানতেন। তাঁরা রসল (স.) দেয়া দাওয়াতনামা ও কোরআনের উদ্ধৃতির ভাষাšর করতেন। বলা যায় মৌখিকভাবে হলেও কোরআন অনুবাদের দ্বার উন্মোচিত হয় তখনি।
হিব্র“ ভাষা থেকে ইনজিল অনুবাদের পর মল কিতাবটি হারিয়ে যায়। এ জন্যে ইতালীতে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে’ যার বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘অনুবাদক হলো প্রতারক’। এই কারণে এবং নানা অপব্যাখ্যার আশংকায় বিশ্বজুড়ে কোরআন অনুবাদের প্রবণতা তখনো শুরু হয়নি।
মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাষার মধ্যে সর্বপ্রথম কোরআনের অনুবাদ হয় ফার্সি ভাষায়। ইরানের বাদশাহ আবু সালেহ মানসুর বিন নহ (৯৪৬-৯৭৬) এ অনুবাদটি করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশেও সর্ব প্রথম কোরআনের যে অনুবাদটি প্রকাশিত হয় সেটাও ফার্সি ভাষায়। হযরত মাওলানা শাহ ওয়ালী উল্লাহ (১৭০৩-১৭৬২) এ গৌরবময় কাজটি স¤ক্সন্ন করেন। এর পরপরই কোরআনের প্রথম উর্দু অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৭৭৬ সালে।
বাংলা ভাষায় কোরআন চর্চা এক সময় নামায ও দোয়া দরুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। ১৭-১৮ শতকে বাংলায় ব্যাপক কোরআন চর্চার সচনা হয় মাত্র। কোরআনের তরজমা, তাফসীর ও আলোচনা আগে মৌখিক পর্যায়ে ছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা হয় ১৭৭৭ সালে। মুসলমানদের তত্ত্বাবধানে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১৫ সালে কলকাতায়। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুন্সী হেদায়াত উল্লাহ ও মুনসী সৈয়দ আবদুল্লাহ।
প্রথাগত নিয়মে পবিত্র কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদ করেন মাওলানা আমিরুদ্দীন বসুনিয়া। তিনি রংপুর জেলার গঙ্গাচড়ার মটকপুরের বাসিন্দা।
আমিরুদ্দীন বসুনিয়া রচিত কোরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদ কপিটি কোথায়ও আছে বলে এমন সংবাদ নেই। তবে এক সময় এটির একটি কপি আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের (১৮৬৯-১৯৫৩) কাছে মজুদ ছিলো বলে তার ‘বাংলা প্রাচীন পুঁথির বিবরণ’ গ্রন্থে পাওয়া যায়। তিনি এতে আমিরুদ্দীন বসুনিয়ার অনুবাদ গ্রন্থের শেষ এবং শুরুর চরণগুলো উল্লেখ করেছেন। তখন পর্যš বাংলা সাহিত্যে গদ্যের প্রচলন হয়নি। বিরাট গ্রন্থটি ছিলো পদ্য ছন্দে, এটা ছিলো তখনকার ট্রাডিশন। তবে অনুবাদে মৌলিকত্ব ঠিক রাখা হয়েছিলো।
শুরুর অংশ- শুরু এই কেতাবের নামেতে আল্লাহর
দয়াময় দয়ালু বহুত রহম যাহার।
সকলি তারিফ আছে ওয়া¯ে আল্লাহর
পালনে ওয়ালা সেই সারা সংসার।
শেষের অংশÑ আর যত কাফের কহে তাহারা সবে
হায় হায় মাটি হৈতাম হৈতো ভাল তবে
মাটি হৈলে হেছাব কেতাব নাহিত দিতে হৈতো
আজ এত দুষ্কুর তবে নাহিক মিলিত।’
এর মল কপি সম্পর্কে ডঃ মুজিবুর রহমানের গ্রন্থসত্রে জানা যায় যে, সৈয়দ আলী আহসান ও মতিয়ুর রহমান বসুনিয়ার বরাত অনুযায়ী একটি কপি কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ গ্রন্থাগারের ৫০২ নম্বর সংখ্যায় মজুদ ছিলো। এটিই যে বাংলা ভাষায় কোরআনের প্রথম অনুবাদ এ ব্যাপারে গবেষকদের মাঝে দ্বিমত নেই। এটি রচনার সাল নিয়ে মতানৈক্য থাকলেও প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এর রচনাকাল যাই হোক না কেন প্রকাশকাল ছিলো ১৮০৮ কিংবা ১৮০৯। স্বভাবতই রচনাকাল আরো আগেই হবে এবং তিনি পুরোটা কোরআনই অনুবাদ করেছিলেন কিন্তু প্রকাশ করে যেতে পারেন নি। ফলে তার মূল পান্ডুলিপি আর উদ্ধার করা যায়নি।
বসুনিয়া সম্পর্কে এর চাইতে বেশী তথ্য জানা যায়নি। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায় তিনি ছিলেন একজন পুঁথি সাহিত্যিক, আবার কেউ তাকে মাওলানা বলেও আখ্যা দিয়েছেন। হতে পারে তিনি উভয় বৈশিষ্টেরই অধিকারী ছিলেন। রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া ইউনিয়নে এখনো যে কয়টি বসুনিয়া পরিবার রয়েছে তাদের কাছে তার সন্ধান পাওয়া যেতে পারে এবং যেসব সৌখিন পুথি সংগ্রহকারীদের কাছে বিরল পুঁথি রয়েছে সেগুলো থেকে তার প্রকাশিত অনুবাদটির সন্ধান করা যেতে পারে। কারণ বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ থাকলেও এতসব রাজনৈতিক পট পরিবর্এতনের
পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরীতে এর কপি থাকার কথা নয়। বিশেষ করে যেহেতু
ই অনুবাদটির অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মাঝে রয়েছে এর কাগজ। সাইজ ছিলো ডিমাই ১২ পেজি, পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৬৮, ছাপা কারো মতে লিথো প্রেস, আবার কারো মতে (উল্লেখ্য লির্থো মুদ্রণ যš আবিস্কার হয় ১৭৯৬ সালে) আবার কারো মতে কাঠ বা পাথরের ব্লকে ছাপা হতে পারে। চীনা মাটি বা পোড়ামাটির ফলকেও ছাপা হতে পারে। উল্লেখ্য এটি ছিলো কোরআনের আমপারার কাব্যানুবাদ। এটা তো জানা কথা যে, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগ ছিলো কাব্য ও পুঁথিচর্চার। আবদুল করীম সাহিত্য বিশারদের কাছে রক্ষিত কপিটির গায়ে অনুবাদকের নাম লেখা না থাকা সত্ত্বেও পরবর্তীতে শেখ ফজলুল করীম, মুহাম্মদ আবদুর রহমান, ডঃ মুজিবুর রহমান, মতিউর রহমান বসুনিয়া, মুহাম্মদ আলীমউদ্দিন, অধ্যাপক আলী আহমদ, হামেদ আলী প্রমুখ গবেষক বা লেখকের নাম, পরিচয় ও প্রকাশকাল নিয়ে সবাই একমত হয়েছেন। অধ্যাপক মোফাখখার হোসেন খান সাল নিয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও আমিরুদ্দীন বসুনিয়াকেই প্রথম অনুবাদক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
আধুনিক যুগের গবেষকরাও এই মতের সমর্থন করেন। এর মধ্যে রয়েছেন মাওলানা মহিউদ্দীন খান, ডঃ মু¯াফিজুর রহমান, হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ, ডঃ আবদুল অদুদ, ডঃ নজরুল ইসলাম খান আল মারুফ। তারপর কোরআনের বাংলা অনুবাদ করেন কলকাতা নিবাসী পাটওয়ার বাগানের মির্জাপুর মহল্লার জনৈক আকবর আলী। এটি প্রকাশিত হয় ১২৭৫সন/১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে। অনুবাদক স্বপ্রণোদিত হয়ে হাজী সৈয়দ আবদুল্লাহর কলকাতার আহমদী প্রেস থেকে মুদ্রণ করেন। এ অনুবাদটিও আমপারার অনুবাদ। ‘তরজমা আমছেপারা’ শিরোনামের এ অনুবাদটির অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিলো এতে কিছু ব্যাখ্যাও সংযোজিত হয়েছিলোÑ ‘ফায়দা’ নামে।
অনেক ইতিহাসবিদ গবেষক মনে করেন এর মধ্যে মুসলমান আলেমরা কোরআনের ব্যাপক অনুবাদ করেন। তারা আলোচনা ও ফতোয়ার ব্যাখ্যার জন্যে কোরআন ও হাদীসের অনুবাদ
করেন। তা ছিলো সরা বা বিষয়ভিত্তিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পর্নাঙ্গও ছিলো; কিšু এগুলো তারা ছাপার কথা ভাবেননি। আরেকটি অনুবাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি হচ্ছে কোরআনের প্রথম পারার অনুবাদ। ১৮৭৯ সালে এ অনুবাদটি করেন জনৈক রাজেন্দ্রনাথ মিত্র। কলকাতার আয়ুর্বেদ প্রেস থেকে ১৬ পৃষ্ঠার বইটি ৫০০ কপি ছাপা হয়েছিলো।
কোরআনের প্রথম পর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ করেন মাওলানা নঈমুদ্দিন; কিšু প্রকাশনার কাজে তিনি পিছিয়ে পড়েন। এটি প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে। তার আগেই ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের পর্ণাঙ্গ কোরআনের প্রথম অনুবাদটি প্রকাশিত হয় ১৮৮৫। গিরিশচন্দ্র ছিলেন নবদীক্ষিত ব্রাহ্মধর্ম অনুসারী। রাজা রাম মোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের নববিধান মন্ডলির ধর্ম প্রচারক ছিলেন তিনি। তিনি ময়মনসিংহ জেলা মেজিস্ট্রেটের নকল নবীশের রাজ করতেন। কিছুকাল তিনি শিক্ষকতাও করেন এবং পত্রিকাও স¤ক্সাদনা করেছেন। তার অনুবাদে কোরআনের মল শিক্ষাকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি বিধায় এটি তেমন সমাদৃত হয়নি। কথিত আছে তিনি মলত ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচার কাজে সুবিধার জন্যেই এই কাজটি করেছেন।

