মেয়েশিশু
বাবা মায়ের বিচ্ছেদে গাছের পাতা থেকে ঝুরে পড়ে ফুলশিশু

বড় গল্প, আমার রাতজাগা পাখি, শেষ (৫ম) পর্ব

আমার রাতজাগা পাখি

পর্ব: ৫

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

(চলমান গল্প)

– আসলে অতীত মানুষের জীবনে কখনো কিছু দিতে পারে না। যে অতীত ভালোকিছু দেয়নি। তা নিয়ে আমি কিছু বলতে চাইনা। না আপনাদের ব্যাপারে আমি কিছু বলছিনা। আমার নিজের একটা অতীত আছে। সে অভিজ্ঞতায় বলছি। আপনি হয়তো জেনেছেন। আজই আমরা বিয়ে করছি। আসলে সবকিছু হিসেব করে তারিখ পাকা করা হয়েছে। বিদেশে আমার ব্যবসায় বানিজ্য রয়েছে। তাই কোনোভাবে তারিখ বদলানো যাচ্ছে না। তাছাড়া এর আগে মামলা না কি কিসের জন্য একবার তারিখ পেছানো হয়েছে। আত্মীয় স্বজন সবাই জানে। আচ্চা আমাকে এখন যেতে হবে। কাল না হয় একবার আসবে। আপনি যখন এসে গেছেন ভালোই হলো। নাহলে সত্যি খুব সমস্যা হয়ে যেত। আসলে আমিতো রোজ আসি আমি বুঝতে পারিনি জেসি এতটা অসুস্থ্। আশা করি কিছু মনে করবেন না। আমি জানি এই সময় মেয়ের পাশে মায়ের থাকার দরকার ছিলো। আপনিতো রয়েছেন।

তার কথা শেষ করতে না দিয়ে আমার স্ত্রী তাকে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। মনে হয় বিশ থেকে পঁচিশ মিনিট একটু দূরে গিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে নানা আলাপ আলোচনা শুরু করলেন। সেসব শোনার কোনো কৌতুহল জাগলো না আমার।

সকালে আমার মা ঘুম থেকে উঠে এসেছে। মাকে বসিয়ে রেখে আমি একটু নাস্তা আনতে এলাম। গিয়ে দেখি মেহমানরা কেউ নেই। মায়ের সাথে বসে সকালের পরটাভাজি খাচ্ছি হাসপাতালের নার্স আমার হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিলেন।

‘‘আমার মেয়েটাকে একটু দেখো। তোমাকে আমি কখনো ভালবেসেছি কিনা জানি না। তবে কখনো শ্রদ্ধা করতে পারিনি। ভবিষ্যতে অন্তত ভালো নাবাসলেও শ্রদ্ধা করতে শিখবো। আমার মেয়ের জন্য তোমার কাছে আমি ছোট হয়ে থাকবো। যদি তুমি তাকে দেখ। আমি পারলাম না। আমার চারপাশকে আমি এতটাই বাড়তে দিয়েছি যে, তার মধ্যে নিজেই ডুব দিয়ে বসে আছি। আমি শেষ বেলায়ও পারলাম না। আমার করনীয় ঠিক করতে। আমার স্বপ্ন আমার আশা আমাকে দূর থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে, এমনকি আমার সন্তান থেকেও দূরে। জানি না কতদূরে গিয়ে আমি হারিয়ে যাব। হয়তো আমার মেয়ে বড় হয়ে আমাকে ঘৃণাই করবে। তবুও তুমি তাকে সঠিক শিক্ষা দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি। শেষতক এইকথা মনে করেই তাকে তোমার কাছে রেখে গেলাম। অনেকদিন চাকরী করনা। মেয়ের চিকিৎসার জন্য টাকাপয়সা লাগলে বলতে দ্বিধা করো না। আমাকে অন্তত এইটুকু সুযোগ দিও। আমি কালই চলে আসবো। আমার মেয়ের কাছে। সুস্থ্য না হওয়া পর্যন্ত থাকবো। তুমি ঘাবড়ে যেওনা। আমি এখনো আছি, যাইনি, অন্তত আমার মেয়ের কাছে। কিন্তু তোমার সাথে আজ থেকে যোজন যোজন মাইলের ব্যবধান হয়ে গেল। এতদিন ভেবে সবার আলোচনা ও উৎসাহে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাছাড়া খালিদ খুব কেয়ারী। বলতে পারে হয়তো আমার মন থেকে আমি কিছু করিনি। খালিদের বিশেষ যোগ্যতায় সে সবকিছু আদায় করে নিয়েছে। ওর স্ত্রী রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে। মানুষটা ভালো মনে হয়। কিন্তু এখন সন্দেহ হচ্ছে নিজেকে, যে আমি ভালো কিনা।’’ ভালো থেকো।

 

কয়েকবার পড়লাম। নতুন কোনো অর্থ বের হলো না। দিনে মেয়ে কয়েকবার মার কথা জানতে চাইলো। সেদিন কিছু টেস্টর রিপোর্ট হলো। ডাক্তারদের খুবই কনফিউজড মনে হলো। আরো কিছু রিপোর্ট এর জন্য অপেক্ষা। অবস্থার বিশেষ কোনো উন্নতি হলো না। একবার আমার সাবেক স্তীর বড়বোন এসে দেখে গেলেন। আমার সাথে কোনো কথা হয়নি। সম্ভবত আজ সন্ধ্যায় তার ছোটবোনের আকদ। তিনি আমার মায়ের সাথে যেসব কথা বলেছেন তার সারাংশ এই, কাল সকালে মেয়ের মা আসবে। আশা করি সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি করুনাহীন কণ্ঠে করুনাময় ভবিষ্যৎবানী করে চলে গেলেন। মেয়ের মা এর মধ্যে কয়েকবার ফোন দিয়ে খবর নিয়েছে।

রাতে ডাক্তার দেখে গেলেন। পরীক্ষার রিপোর্ট এর পর কিছু ওষধ বদলে দিলেন। সেগুলো আনলেন।

বাবা এসেছেন। মাকে বললেন রেস্ট করতে, এবং আমাকেও। আজ তিনি নাতনীর জন্য রাত জাগবেন। দাদাকে দেখে বেশ খুশি হয়েছে আমার মেয়ে অনেকক্ষণ দাদার হাত ধরে ছিলো।

আমাকে অন্যরুমে যেতে বলল। আমি গেলাম না। রাতে খেয়ে বেডের পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়রাম। রাত আনুমানিক তিনটা হবে। মেয়ে হঠাৎ শব্দ করে উঠলো। আমি তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। বাবা দৌড় দিলেন ডাক্তার ডাকতে। মেয়ে চোখ বড়ো করে ফেললো। বড়ো বড়ো করে নি:শ্বাস নিতে থাকলো। একসময় থেমে গেল। একটু পানি দিয়েছিলাম মনে হয় মুখে। ডাক্তার  এলো। আমি সাতপাঁচ না ভেবে ফোন দিলাম একটা বিশেষ নাম্বারে। কোনো সাড়া এলো না।

ডাক্তারের মুখের দিকে চেয়েছিলেন আমার মা বাবা দুজনেই। ডাক্তার নমনীয় এক ইশারা দিতে তারা কান্না জুড়ে দিলেন।

আর আমি আমার কান্নার কি সুযোগ আছে। আমার কান্না পেলনা। কারণ আমিতো জিতে গেছি। কোনো বাবার জন্য কি এটা জয় হতে পারে।

(সমাপ্ত)

 

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply