ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান কোথায়?

ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান কোথায়?

ফিলিস্তিন সংকটের সম্ভাব্য সমাধান কোথায়?

ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটময় ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিপূর্ণ। গত বছরের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে।​

২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ৪২,৫১৯ ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় ৯৯,৬৩৭ জন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি হামলায় গাজার হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির, মসজিদ ও গির্জাসহ হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, গাজার প্রায় ৮৫ শতাংশ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, এবং খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।​

২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৪৩,২০০ ছাড়িয়েছে। লেবাননেও ইসরায়েলের হামলায় ৪৫ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। ​যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে, তবে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধবিরতির জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে এখনো স্থায়ী সমাধান আসেনি।

সংকটের সমাধানকে যদি আমরা ২ ভাগে ভাগ করি যেমন জরুরী সমাধান ও স্থায়ী সমাধান। তাহলে জরুরী সমাধানের আওতায় কি কি ভাবা যেতে পারে আর স্থায়ী সমাধানের আওতায় কি কি ভাবা যেতে পারে?

জরুরি সমাধান (Short-term Solutions)
এই সমাধানগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সহিংসতা বন্ধ করা এবং মানবিক পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য কার্যকর হতে পারে।
১. যুদ্ধবিরতি ও সহিংসতা বন্ধ: তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি: জাতিসংঘ বা নিরপেক্ষ পক্ষের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের মধ্যে দ্রুত যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা।
২. আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন: জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠানো।
৩. হামাস-ইসরাইল সমঝোতা: উভয় পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে অস্ত্রবিরতির শর্ত নির্ধারণ করা।
৪. মানবিক সহায়তা ও পুনর্বাসনে অবরোধ প্রত্যাহার: গাজা উপত্যকার ওপর ইসরাইলি অবরোধ শিথিল করে খাদ্য, ওষুধ, পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
৫.শরণার্থীদের পুনর্বাসন: বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য আশ্রয়, খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৬. আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা: জাতিসংঘ, আইসিআরসি (ICRC), ও অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে গাজা ও পশ্চিম তীরের জনগণের জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা পাঠানো।
৭. রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিশ্বনেতাদের হস্তক্ষেপ: জাতিসংঘ, আরব লিগ, ওআইসি (OIC) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আরো কার্যকর উদ্যোগ নিতে বাধ্য করা।
৮. অস্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণে এগিয়ে আসা: নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনা করা।

সাম্ভাব্য  স্থায়ী সমাধান ও বাস্তবতা
১. দুই-রাষ্ট্র সমাধান (Two-State Solution):
ইসরাইল ও ফিলিস্তিনকে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া, প্রতিষ্ঠা করা এবং সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা। জাতিসংঘের ১৯৪৭ সালের প্রস্তাব অনুসারে অধিকাংশ এলাকা দিয়ে ফিলিস্তিনকে স্বাধীনতা দেওয়া। এবং পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী করা। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করা।

বাস্তবতা হলো ২ রাষ্ট্র সমাধানটি সবার চোখে দৃশ্যমান সবচেয়ে সহজ ও গ্রহণযোগ্য হলেও বাস্তবে তা সঠিক প্রমাণিত হয়নি। কেননা গত ৭৮ বছরে সমস্যা সমাধান হয়নি। বরং আরো বেড়েছে।

২) আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ অঞ্চল (Internationally Controlled Zone)
জেরুজালেমসহ কিছু বিতর্কিত অঞ্চলকে জাতিসংঘ বা নিরপেক্ষ সংস্থার নিয়ন্ত্রণে রেখে আন্তজাতিক নিরপেক্ষ অঞ্চল বা ইউএন-পিসল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা যাতে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবে। মানে যতদিন পর্যন্ত ২ দলের সম্প্রীত না হবে ততদিন পুরো এলাকা জাতিসংঘ শান্তি এলাকা নামে পরিচিত থাকবে। এবং জাতিসংঘ শান্তি মিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। যদিও ধারণা করা যায় যে, যদিও ইসরাইল এটা মানবেনা। তারা এখনো পশ্চিম তীরে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দমননীতি চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্গনের ঘটনা ঘটছে।

৩) তৃতীয় রাষ্ট্র সমাধান

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে যে সমাধানটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং কার্যকর হতে পারে। সেটা হলো তৃতীয় রাষ্ট্র সমাধান। এই ধারণার মূল হলো ফিলিস্তিন ও ইজরাইল ছাড়াও এখানে একটি তৃতীয় রাষ্ট্রের জন্ম হবে।  এই রাষ্ট্রের মানচিত্র হবে বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের অংশ নিয়ে এবং দুই দেশের মাঝখানে। এটি প্রাথমিক অবস্থায় জাতিসংঘ রাষ্ট্র বা জাতিসংঘ শান্তিভূমি বা UN Pea eland হিসেবে থাকবে। এ আইডিয়াটি আমি আলাদা লেখায় বিস্তারিত তুলে ধরব।

৫) অন্যান্য করনীয়

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব লীগ, ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যস্থতায় সমঝোতা করা। ইসরাইলের আগ্রাসন ও বসতি স্থাপন বন্ধ করা। ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। ফিলিস্তিনের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহায়তা বৃদ্ধি। ইসরাইল-ফিলিস্তিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে সহাবস্থান নিশ্চিত করা। ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা। ফিলিস্তিনিদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করা। ফিলিস্তিনে স্বাধীন বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা। শিক্ষা, অবকাঠামো ও চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি করা।

প্রশ্ন: কেন বিশ্বনেতারা সংকটের সমাধান করছে না?

ক) আরব বিশ্বের বিভক্তি: আরব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ সংকট ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে তারা শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
খ) আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তা: জাতিসংঘের কার্যকর উদ্যোগের অভাব ও নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো নীতির কারণে বাস্তবসম্মত সমাধান বিলম্বিত হচ্ছে।
গ) পশ্চিমা বিশ্বের পক্ষপাতিত্ব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো ইসরাইলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। কারণ তারা মনে করে ইসরাইল তাদের মিত্র। এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি নিধনে তাদের পূর্বপুরুষেরা যে অন্যায় করা হয়েছে তার বদলে তাদের উচিৎ ইহুদিদের পক্ষে থাকা।
ঘ) সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তা ইস্যু: হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠীর কার্যকলাপের কারণে ইসরাইল নিরাপত্তার অজুহাতে দমনমূলক নীতি অব্যাহত রেখেছে।
ঙ) ইসরাইলের অনড় নীতি: জাতিসংঘ একাধিকবার ফিলিস্তিনের পক্ষে রেজুলেশন পাস করলেও ইসরাইল তা মানছে না।
চ) যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের বিরুদ্ধে যেকোনো কঠোর সিদ্ধান্তে ভেটো দেয়।
ছ) রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক: পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, তাই তারা ইসরাইলের প্রতি কঠোর হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের সাথে ইসরাইলে বাণিজ্য রয়েছে। সেসব দেশে তাদের শক্ত লবিও রয়েছে। আরব এলাকায় তাদের সবচেয়ে একনিষ্ট মিত্র মনে করা হয় ইসরাইলকে। ইসরাইলকে ব্যবহার করে তারা মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাসের ওপর প্রভাব বজায় রাখতে চায়। মার্কিন রাজনীতিতে ইহুদি লবির (যেমন AIPAC) ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। মার্কিন নির্বাচনে ইহুদি সম্প্রদায়ের আর্থিক প্রভাব রয়েছে।
জ) আরব নেতাদের অনৈক্য: আরব ও বিশ্বও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে ব্যর্থ, যার ফলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। যদিও অনেকে মনে করে এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও আরবদেশগুলোর উপর তাদের চাপ।
পশ্চিমা মূলধারার মিডিয়া ইসরাইলের পক্ষে প্রচারণা চালায়। তাদেরকে সচেতন করতে হবে।  ফিলিস্তিনিদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে দেখিয়ে ইসরাইলকে ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ দাবি করতে সাহায্য করে। তাদেরকে এই অবস্থান থেকে যতটা সম্ভব সরিয়ে আনতে হবে।

(লেখাটির ‘‘তৃতীয় রাষ্ট্র আইডিয়া ব্যতিত পুরো অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশ্ন এবং উত্তরের মাধ্যমে তৈরী করা হয়েছে। প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার জন্য এমনটা করা হয়েছে।)

এসব আলোচিত সমাধানের রাইরে দীর্ঘদিন ধরে আমি একটা সমাধান নিয়ে ভাবছি। তা আমি অন্য একটি লেখায় শীঘ্রই ব্যাখ্যা করবো।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply