প্লাটফর্ম কর্মীদের নিয়ে ভাববার সময় কি এসেছে?

প্লাটফর্ম কর্মীদের নিয়ে ভাববার সময় কি এসেছে?

প্লাটফর্ম কর্মীদের পেশাদারিত্ব ও পেশাগত উন্নয়ন প্রসঙ্গে
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশ আমাদের জীবনের প্রতিটি খাতে পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘প্লাটফর্ম অর্থনীতি’। ফুড ডেলিভারি, রাইড শেয়ারিং, অনলাইন মার্কেটপ্লেস—এসব আমাদের নতুন জীবনের অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্লাটফর্ম ভিত্তিক ডিজিটাল অর্থনীতি এসএমই খাতকে বদলে দিতে পারে আমূলভাবে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা মানুষেরা, অর্থাৎ প্লাটফর্ম কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কি যথেষ্ট ভাবছি?

বিশ্ববাণিজ্যের দ্বৈত প্রবণতা

বলা হয়ে থাকে, বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ এখন দুটি শক্তির টানাপোড়েনে: একদিকে সুরক্ষাবাদ বা প্রোটেকশনিজম—যার প্রমাণ আমরা পেয়েছি ব্রেক্সিট এবং টিপিপি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসায়; অন্যদিকে রয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তি, যা জাতীয় সীমারেখাকে ভেঙে দিয়ে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য ও সংযুক্ততাকে উৎসাহ দিচ্ছে। এই সংযুক্ততার ফলেই ক্ষুদ্র ই-কমার্স উদ্যোগ, ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সিং, রাইড শেয়ারিং বা পণ্য ডেলিভারির মতো খাতগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত হতে পেরেছে।

বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। অনলাইনভিত্তিক প্লাটফর্মগুলোর প্রসারের ফলে দেশে যেমন জীবনের গতি বেড়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থান। আমাদের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এই খাতে যুক্ত হয়ে কিছুটা হলেও বেকারত্বের চাপ কমিয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন খাতে কাঙ্খিত বিকাশ না হওয়ায় এই বিকল্প খাত এখন নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে।

প্লাটফর্ম অর্থনীতির মূল্যায়ন ও চ্যালেঞ্জ

সম্প্রতি ফেয়ারওয়ার্ক বাংলাদেশ রেটিং ২০২৩ শীর্ষক একটি গবেষণায় দেশের ১১টি প্লাটফর্মকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এটি ফেয়ারওয়ার্কের তৃতীয় প্রতিবেদন, এবং এতে দেখা যাচ্ছে, আগের বছরের তুলনায় কিছু উন্নতি হয়েছে। যেমন, ২০২২ সালে যে তিনটি প্লাটফর্ম (চালডাল, হ্যালোটাস্ক ও সেবা) সর্বোচ্চ স্কোর করেছিল, ২০২৩ সালে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে দারাজসহ মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান।

তবে কেবল মান বা স্কোর নয়, প্রশ্ন হচ্ছে এই খাতের কর্মীরা কতটা নিরাপদ, স্বীকৃত, সম্মানজনক ও উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাইডার, ডেলিভারি পার্সন বা রাইড শেয়ার ড্রাইভাররা স্বাধীন কর্মী (গিগ ওয়ার্কার) হিসেবে কাজ করেন, যারা কোনো প্রতিষ্ঠানিক সুবিধা পান না। তাদের কাজের শর্ত, ঝুঁকি ও আয় বিষয়ক প্রশ্নগুলো এখন সমালোচনার কেন্দ্রে।

রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা ধীরে ধীরে রাইডারদের কমিশন কমিয়ে দিচ্ছে। এটা করা হচ্ছে মূলত কোম্পানির লাভজনকতা বাড়ানোর জন্য, কারণ শুরুর দিকে প্লাটফর্মগুলো প্রচার ও ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু এখন কোম্পানিগুলো টিকে থাকার সংগ্রামে ব্যস্ত।

এর বিপরীতে রাইডারদের মধ্যেও নতুন একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে—অ্যাপ না ব্যবহার করে সরাসরি ‘খ্যাপ’ নেওয়া। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো রাজস্ব হারায় এবং পুরো ইকোসিস্টেমটি ঝুঁকির মুখে পড়ে। অথচ সরকার এ বিষয়ে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না। রাইড শেয়ারিং নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গাফিলতি রয়েছে। যেমন, সরকার লাইসেন্স ও বিধি দিয়ে প্লাটফর্ম ব্যবসাকে নিয়মবদ্ধ করেছে, অথচ একই সাথে কর ফাঁকি দিয়ে কোনো রাইডার অ্যাপ এড়িয়ে “যাবেন নাকি” মডেলে যাত্রী নিতে পারে! এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতা অসম হয়ে পড়ে।

প্লাটফর্ম কর্মীদের বাস্তব চিত্র

ফেয়ারওয়ার্কের গবেষণায় প্লাটফর্ম কর্মীদের জীবনের নানা বাস্তবতা উঠে এসেছে। চালডাল ও দারাজ কিছু কর্মীদের মাসিক বেতন দেয়, যা কাজের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হয় এবং সেখানে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আয়ের নিশ্চয়তা নেই—কর্মীকে তার দক্ষতা, পরিশ্রম, সুস্থতা এবং কোম্পানির কাজের চাহিদার উপর নির্ভর করে প্রতিদিনের রোজগার ঠিক করতে হয়।

জরিপ অনুযায়ী, অনেক সময় পণ্য ডেলিভারির সময় যদি কোনো ক্ষতি হয়, তার দায় দিতে হয় কর্মীকেই। এতে মানসিক চাপ তো বাড়েই, কর্মীরা এটিকে অন্যায়ও মনে করে।

প্লাটফর্ম কর্মীদের একটি বড় অংশ তাদের উপার্জন নিয়ে সন্তুষ্ট নন। স্বাস্থ্যবীমা, দুর্ঘটনায় আর্থিক সহায়তা—এসব তারা চায়। কেননা তারা রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে, আর বাংলাদেশে এই ঝুঁকি বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেশি।

একজন কর্মীর আর্থিক চিত্র

অ্যাপ-বেইজড্ ট্রান্সপোর্ট ইউনিয়নের সভাপতি বেলাল আহমেদ একটি চিত্র তুলে ধরেছেন: একজন উবার ড্রাইভার প্রতিদিন গড়ে ৩,০০০ টাকার সেবা দেন। এর মধ্যে ৭৫০ টাকা কমিশন, ১৫০০ টাকা জ্বালানী, ২৫০ টাকা খাবার ও মোবাইল খরচ দিয়ে হাতে থাকে ৫০০ টাকা। মাসে ২৫ দিন কাজ করলে আয় হয় ৩১,২৫০ টাকা। সেখান থেকে গাড়ির ব্যয়, গ্যারেজ ভাড়া, মেরামত ইত্যাদি বাদ দিলে প্রকৃত আয় দাঁড়ায় ১৭,৫০০ টাকা। অথচ এই আয় নিশ্চিত করতে তাকে ১২-১৪ লাখ টাকার বিনিয়োগ করতে হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে দেয়, প্লাটফর্ম কর্মীরা নিছক ‘ফ্রিল্যান্সার’ না—তারা একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, যাদের শ্রম ও সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন দরকার।

তাহলে করণীয় কী?

বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, এখনই সময় এসেছে প্লাটফর্ম কর্মীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বীকৃতি নিয়ে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পর্যায়ে ভাবার। প্লাটফর্মগুলো অবশ্যই ব্যবসায়িক লাভ দেখবে, কিন্তু সেইসাথে কর্মীদের মানবিক দিকও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

“প্লাটফর্ম কর্মী” শব্দটি যেন কেবল একটি ট্যাগ না হয়, বরং এটি হোক একটি মর্যাদাসম্পন্ন পেশার নাম।

সরকারের উচিত এই খাতকে নীতিমালার মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, কর কাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা। পাশাপাশি প্লাটফর্মগুলোও যেন কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা এবং সহায়তা সিস্টেম গড়ে তোলে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্লাটফর্ম কর্মীরা যেন সমাজের প্রান্তিক, অবহেলিত জনগোষ্ঠী হয়ে না থাকেন—তাদের স্বীকৃতি দেওয়া ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ। এখন, সেই ভাববার সময়ই বটে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply