প্রেস রিলিজ বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখার কাঠামো

প্রেস রিলিজ বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখার কাঠামো

একটি সম্পূর্ণ প্রেস রিলিজের কাঠামো

এইরে সেরেচে আবার মনে হয় কাটা কাটা কথা বলছ। থাকনা কথার বাসরে কথার মেলা। আমরা এগিয়ে যাই কিছু জ্ঞানের কথার সূত্র ধরে। একটুখানি কাঠামো না হয় শিখে নিই। নিয়ম ভাঙ্গার জন্যও নাকি নিয়ম জানতে হয়। দরজা বা ওয়াল কোনটা ভাঙবেন সেটা জানার জন্য দরজা বা ওয়ালটা কোথায় তাতো জানা দরকার! কি বলেন?
জনসংযোগ কর্মকর্তা বা পাবলিক রিলেশন অফিসার বা লেখক প্রেস রিলিজের জন্য একটি মানকে পেশাদার কাঠামো ধরে অনুসরণ করে থাকেন। একটি প্রেস রিলিজ লেখার সময় খেয়াল রাখতে হয় এর মূলতথ্য চোখে পড়া, গুরুত্ব বোঝা ও পাঠকের তথ্য প্রাপ্তির সহজতা। আজকাল ভাষাগত উপস্থাপনায় পরিবর্তন আসলেও প্রেস রিলিজের মূল কাঠামো অভিন্ন।
সংবাদের ক্ষেত্রে যেমন প্রতিনিয়ত কাঠামোগত নানা পরিবর্তন যুক্ত হচ্ছে। সে তুলনায় প্রেস রিলিজের নতুত্বের পরিসর সীমিত। প্রেস রিলিজ বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এমন কেউ লিখছেন যিনি সাংবাদিক বা সংবাদকর্মী নয়। তাই এটা কাঠামোবদ্ধ না হলে তার জন্য গুরুত্বানুসারে তথ্য উপস্থাপন কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি এলোমেলো করে ফেলতে পারেন। পাঠকের রুচি অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা না সাজিয়ে কোম্পানীর প্রোপাগান্ডার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে গুরুত্বহীন বিষয়কে সামনে নিয়ে আসতে পারেন। এতে করে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি উপাদান হিসেবে এটি খুব দূর্বল, আকর্ষনহীন এবং বিরক্তিকর হয়ে উঠতে পারে। তাই সংবাদ মাধ্যম গৎবাধা জিনিসই পছন্দ করে। অবশ্য বিষয় পছন্দ হলে অনেক সময় তারা পিআর থেকে সংবাদ খুঁজে নেন অথবা প্রেস রিলিজটাকেই নতুন করে উপস্থাপন করে থাকেন। অবশ্য এজন্য তার হাতে সময় থাকারও দরকার হয়।
আমরা এখানে একটি কমন প্রেস রিলিজের বডি কাঠামো দেখতে পাচ্ছি। যেখানে ছক করে দেখানো রয়েছে। কোন অংশটি কি?
ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরলে বিষয়টি নিন্মরুপ
১. একটি লোগোযুক্ত লেটারহেডে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি স্থান পাবে।
২. এটি যে প্রেস রিলিজ সেটা লেখা থাকবে। এর প্রেরণের তারিখ ও সূত্র থাকবে।
৩. এক বা একাধিক শিরোনাম থাকবে অথবা ডেক বা সাবহেড থাকবে।
৪. প্রকাশের ডেডলাইন থাকলে তা উল্লেখিত থাকবে।
৫. প্রথাগত ইন্ট্রো বা সূচনার মাধ্যমে প্রাথমিক তথ্য দিয়ে এটা শুরু হবে।
৬. ইন্ট্রো বা সূচনা প্যারার পরে আসবে তথ্যসমৃদ্ধ মূল অংশ বা বডি প্যারা।
৭. শেষ করার আগে আসবে ব্রয়লারপ্লেট। ব্রয়লার প্লেট কি তা যথাস্থানে আলোচনা করা হবে।
৮. সবশেষে আসবে শেষ বার্তা বা ইন্ড নোটেশন এবং ফাইনাল নোট।
৯. পিআর এর শেষে থাকবে সমাপ্তি চিহ্ন বা ### এবং যিনি পিআর পাঠাচ্ছেন তার নাম, পদবি, স্বাক্ষর। থাকতে পারে একটি ছোট ধন্যবাদ নোট।

 

এতক্ষন দেখলেন শিরোনাম এবার বিস্তারিত:
১. লোগোযুক্ত লেটারহেড
কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যখন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হবে তখন অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের প্যাডে বা লেটার হেডে তা লিখে পাঠাতে হবে। সফটকপি কিংবা হার্ডকপি উভয়ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য। সফটকপির ক্ষেত্রে অনুমোদিত বা ভেরিফাইড ই-ইমেল আইডি থেকে পাঠাতে হবে। মানে জিমেইল ইয়াহু নয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইটের সাথে সমন্বয় করা ই-মেইল আইডি থেকে পাঠাতে হবে। যেমন, ব-পধন@মসধরষ.পড়স, রহভড়@ব-পধন.হবঃ। এদুটোর মধ্যে প্রথমটা নয়, দ্বিতীয়টা। প্যাডে অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাও ও ওয়েবসাইট থাকা দরকার।

২. প্রয়োজনীয় যোগাযোগ তথ্য:
একটি প্রেস রিলিজ লিখে পাঠানোর পর কাজ শেষ হয়ে যায়না বরং কাজ শুরু হয়। সেটা সংবাদ মাধ্যম বা সাংবাদিকদের দিক থেকে। তারা প্রথমেই দেখে এইটি কোনো সঠিক সূত্র থেকে এসেছে কিনা? তারপর সেখানে কোনো তথ্য ঘাটতি থাকলে সেজন্য তারা ফোন দিয়ে জানতে চাইতে পারে। তাই প্রেস রিলিজ কে দিচ্ছেন তার নাম পদবি স্বাক্ষর ছাড়াও থাকবে ফোন ও ইমেইল ঠিকানা। আপাত দৃষ্টিতে এটা প্রেস রিলিজের কোনো অংশ নয় বা বডি নয় কিন্তু একটি পূর্ণ পিআর এর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এটি।

৩. শিরোনাম ও বিষয়
সংবাদের যেমন শিরোনাম অবিচ্ছেদ্য অংশ প্রেস রিলিজও শিরোনাম ছাড়া অপূর্ণ। আমাদের দেশে অনেকে শিরোনামের স্থলে প্রেস রিলিজ লিখে দেন। প্রেস রিলিজ কিন্তু মূল শিরোনাম নয়। শিরোনাম হচ্ছে সেটা যা শুরুতে বড় করে লেখা থাকবে এবং যা থাকে পাঠক ঘটনার মূলটা আঁচ করতে পারবে। এটা পুরো পিআর এর একটা সংক্ষিপত রুপ। সংবাদের শিরোনাম লেখার অনেক নিয়ম আছে। কিন্তু প্রেস রিলিজ এর শিরোনাম রাখার ভাল উপায় দু’টি
ক। মূল ঘটনাকে উপজীব্য করে সংবাদ শিরোনাম লিখা
খ। প্রতিষ্ঠান বা পণ্যকে তুলে ধরে শিরোনাম লিখা
যেমন অনলাইনে সরকার ৮০ টাকার পেঁয়াজ ৩৬ টাকা দামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। এ সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শিরোনাম ই-ক্যাব থেকে লিখেছে।
‘‘ই-ক্যাব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পেয়াজ অনলাইনে’’।
কিন্তু অধিকাংশ মিডিয়া নিউজ করেছে, ৩৬ টাকায় পেয়াজ মিলবে অনলাইনে’’
সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টি হচ্ছে কোনটা জনসাধারণের স্বার্থ বা আগ্রহের বিষয় সেটা আগে আসবে। প্রতিষ্ঠানগুলো চায় শিরোনামে নিজেদের নামের উপর আলোকপাত করতে। শিরোনামে প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলে সবার আগে নামটা চোখে পড়ে কিন্তু ঘটনা বা জনসাধারণের লাভের কথা না থাকলে সেটা পাঠক শিরোনাম দেখে এড়িয়ে যেতে পারে।

৪. ডেক বা সোলডার
জাহাজের যেমন ডেক থাকে। তেমনি শিরোনামের একটা ডেক থাকতে পারে। মানে মূল শিরোনাম যদি বিষয়টার একটা ধারণা দিতে না পারে তখন সাবহেডের দরকার হয়। তবে এমন সাবহেড শুধু তখনি দেয়া যায় যখন নিউজটা জনগুরুত্বপূর্ণ আর এর জন্য পত্রিকার সম্পাদক কিছুটা বড় জায়গা বরাদ্ধ করতে সম্মত হবেন। এধরনের সাবহেড নিউজের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়। নিউজের উপরেও হতে পারে নিউজের ভাষায় তখন একে বলে সোলডার। যেমনটা মাথা ও শরীরের মাঝখানে যেমন ঘাড় থেকে তেমনি খবরের শিরোনাম ও শরীরের মাঝে সোলডার।

৫. তারিখ ও সময়
সংবাদের যেমন ঘটনা ঘটার তারিখ গুরুত্বপূর্ণ তেমনি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশের তারিখ। কারণ একটা নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলে আর সংবাদের যেমন কোনো সংবাদমূল্য থাকে না। তেমনি খবর বিজ্ঞপ্তিও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এজন্য প্রেস রিলিজ লেখার সময় ঘটনার তারিখ উল্লেখ করতে হবে। প্রেস রিলিজটা কত তারিখে প্রেরণ করা হচ্ছে আর দশটা চিঠি বা আবেদনপত্রের মতো এর গায়ে তারিখ লিখা থাকা চাই। আর এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে ঘটনাটার ব্যাপারে প্রেস রিলিজ পাঠানোর হচ্ছে সে ঘটনা ঘটনার ২৪ ঘন্টা পার হয়েছে কিনা তাহলে এর সংবাদমূল্য থাকেনা। বর্তমানে ২৪ ঘন্টা ধরা হতো প্রিন্ট মিডিয়ার যুগে। টিভি মিডিয়ার যুগে ১২ ঘন্টা। অনলাইন মিডিয়ার এই যুগে ৬ ঘন্টা পরেও যদি পাঠানো হয় তাতেও এর প্রচার সম্ভাবনা কমে যাবে। বর্তমানে ১ ঘন্টাতেও সংবাদ বা পিআর বাসি হয়ে যায়।
তাই আজকাল সবাই পিআর আগে থেকে রেডি করে রাখে ঘটনা ঘটার সাথে সাথে তা পাঠিয়ে দেয়া হয়। ক্ষেত্রবিশেষে শুধু বক্তব্যগুলো জুড়ে দেয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুমতি নিয়ে বক্তব্যও আগে থেকে লিখে রাখা হয়।

৬. প্রেস রিলিজের সূচনা:
এক্ষেত্রে একটি সংবাদের প্রথম অংশ যেমন হয় একটি প্রেস রিলিজের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। মৌুলক যেসব প্রশ্ন পাঠকের মনে আসবে সেগুলোর উত্তর থাকবে। সংবাদের ভাষায় আমরা যাকে বলি ‘‘ষড় ক’’। এক্ষেত্রে এর আকৃতিও ছোট বা শব্দসীমা দ্বারা আবদ্ধ থাকবে। অহেতুক দীর্ঘসূচনা পাঠকের বিচ্যুতি ঘটাবে, সংবাদ বিজ্ঞপ্তিকে হালকা করবে সবচেয়ে বড় কথা হলো এটা এডিট করে প্রকাশ করার মতো সময় ও মানসিকতা না থাকলে বার্তা সম্পাদক এটি এড়িয়ে যাবেন।

৭. মূল অংশ :
একে ইংরেজীতে বলে ইড়ফু ড়ভ চজ, এখানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও তথ্য থাকে। ঘটনার পটভূমি এমনকি কোনো পরিসংখ্যান ও উদ্বৃতিও থাকতে পারে। এতে পাঠকের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের সন্নিবেশ থাকবে। তবে শব্দ ভাষা ও তথ্যের বাহুল্য একে মেদযুক্ত করে পাঠক ও সম্পাদকের বিরক্তির কারণ যেন না হয় তা খেয়াল রাখতে হবে।

১০. বয়লারপ্লেট 
এটা খুব ছোট একটা অংশ। মূল তথ্য দেয়ার পর যে সংস্থা বা সংগঠনের পক্ষে প্রেস রিলিজটি যাচ্ছে তাদের সম্পর্কে ২ লাইনের একটা সংক্ষিপ্ত সার বা সামারি। অথবা ঘটনার পটভূমি থাকতে পারে। যেমন চালডাল ডট কম এর একটা পিআর গেলো সেটা হয়তো নতুন কোনো সেবা সংযোজনমূলক। মূল পিআরটা শেষ হলে, চালডাল সম্পর্কে দুই লাইনের একটা সামারি থাকলো। যেমন চালডাল ডট কম দেশের প্রথম ও শীর্ষ অনলাইন গ্রোসারি শপ। গত করোনাকালীন সময় থেকে মানুষের ঘরে ঘরে নিত্যপণ্য সেবা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। চলতি বছর ক্রেতার আস্থাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ৩শভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

১১. সমাপ্তি ও স্বাক্ষরকারী:
প্রেস রিলিজ যেখানে শেষ হয়ে যাবে। তারপর যোগাযোগ তথ্য বা অন্যান্য আভ্যন্তরীন তথ্য থাকতে পারে। এখন সম্পাদক কিভাবে বুঝবেন যে প্রেস রিলিজটা কোথায় শেষ হয়েছে। এজন্য আমাদের দেশে সাধারণত নিচে লেখা থাকে ধন্যবাদান্তে তারপর স্বাক্ষরকারীর নাম পদবি ও অন্যান্য তথ্য। ### এ ধরনের হ্যাশচিহ্নের ব্যবহার দেখা যায়।
উত্তর আমেরিকায় সাধারণত “-৩০-” চিহ্নটি বয়লারপ্লেট বা বডি পরে লেখা থাকে। অনেকে সোজাসাপ্টা সমাপ্তি বা ঃযব বহফ লিখে থাকেন।
দমকার দেশে তাতেও রক্ষা হয়না। দেশে এতো এতো সংবাদ মাধ্যম আর অনলাইন পত্রিকা বের হয়েছে। এদের কিছু আছে এসব জানে না, বুঝেওনা। মেইল বডিতে যা পায় তাই কপি পেস্ট করে দেয়। আমার নিজের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তির নিচে লেখা ছিল ‘‘ সংবাদ মাধ্যমের জন্য বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন- তারপর ফোন নাম্বার সেটাও তুলে দিয়েছে কপি করে’’। তারপর পাবলিকের ফোন আর ফোন!

১২. প্রেস লেটার/কভার লেটার:
খুব ব্যাকরণগত ব্যাপার যদি হয়। তাহলে একটা কভার লেটার লেখা নিয়মের মধ্যে পড়ে। যদিও আজকাল কেউ এই কভার লেটার লিখেন না। বা লিখার দরকার হয়না। এমনকি বাড়তি একটা লেখা থাকুক সম্পাদকও চাননা। এটা মূলত পিআর ছাপানোর অনুরোধ।
যেমন, বরাবর
সম্পাদক, দৈনিক খবরাখবর
বিষয়: প্রেস রিলিজ প্রকাশ প্রসঙ্গে
জনাব, আপনার স্বনামধন্য দৈনিকে নিচের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অনুরোধ করছি।
নিবেদক…………………………………….

মিয়া মোহাম্মদ জুম্মুর আলী তালুকদার

এটা হয়তো এরকম এক লাইনের হবেনা। এখানে কেন এই পিআরটা ছাপানোর দরকার। সে সম্পর্কে আরো ২/১ লাইন থাকতে পারে। আগেই বলেছি। এর প্রচলন এখন উঠে গেছে। কারণ বার্তা সম্পাদক পিআর এর গুরুত্ব বুঝে ছাপবেন অনুরোধ দেখে নেয়।

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বই: প্রেস রিলিজ গাইডলাইনস

লিংক” https://www.rokomari.com/book/211928/press-release-guidelines