সম্পর্কের নানা রূপ: হয়তো আপনি অজান্তেই জড়িয়েছেন কোনো সিচুয়েশনশিপ কিংবা পরিসম্পর্কে
লেখক: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
অনুরাধা আর সীমান্ত, জীবনের ব্যস্ততায় একদিন হঠাৎ করেই পরিচিত হয়। সময়ের সাথে তারা একে অপরের কাছে আসে, তবে তাদের সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই। প্রেম নয়, আবার শুধুই বন্ধুত্বও নয়। তারা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত, কিন্তু কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এই সম্পর্কের ধরনকে বলা যেতে পারে “সিচুয়েশনশিপ” বা বাংলায় “পরিসম্পর্ক’’ বা বলতে পারেন প্রেমন্ধুত্ব। যারা স্বাধীন ও দায়িত্বহীন সম্পর্ক চান এবং ধর্মের বিধানের শিথিলতা বা ধার না ধারতে চান তাদের জন্য হয়তো একটা সাময়িক সমাধান। কিন্তু এটা সামাজিক সংকট তৈরী হওয়ার নতুন উপাদান বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
প্রথমত: মানুষের পরিবার কেন্দ্রীক সমাজ ব্যবস্থার বিপরীত। পরিবার না হলে মানবশিশুর স্বাভাবিক লালন পালন ও বিকাশ হয়না।
দ্বিতীয়ত: খুব স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ হয়তো এ ধরনের সম্পর্কে যেতে পারে কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ খুব কম মানুষই এমন হোন। আমরা সামাজিক নির্ভরশীলতার উপর ভিত্তি করে বেঁচে থাকি। শুধু পরিবার কিংবা দাম্পত্য নয় আমাদের সামাজিক নির্ভরশীলতাও রয়েছে।
যাই হোক বিষয়টা একটু আলোচনা করা যাক
সিচুয়েশনশিপ কী?
সিচুয়েশনশিপ হলো এক ধরনের রোমান্টিক বা শারীরিক সম্পর্ক, যা সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয় এবং এতে কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে সম্পর্কটি বন্ধুত্বের চেয়ে গভীর, তবে এটি প্রেমের মানদণ্ডেও পড়ে না। এটি মূলত সেই সময়ের জন্য কার্যকর, যখন মানুষ আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের দিকে না গিয়ে স্বাধীন থাকতে চায়।
সমালোচকেরা বলেন, এটা বিনামূল্যে পতিতাবৃত্তির মতো। কিন্তু সমর্থকেরা বলেন এখানে পারষ্পরিক বোঝাপড়া এবং সম্মান থাকে, থাকে ভালবাসাও। কোনো পরিসম্পর্ক প্রেম কিংবা বিয়েতেও গড়ায় সূতরাং এই সম্পর্কের স্বীকৃতি থাকা দরকার।
সিচুয়েশনশিপের ভালো এবং খারাপ দিক রয়েছে। এটি একদিকে যেমন স্বাধীনতা এবং মজার একটি সম্পর্ক হতে পারে, তেমনি আবেগের দিক থেকে এটি অস্পষ্ট এবং অস্বস্তিকরও হতে পারে। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে সম্পর্কের দুই ব্যক্তির মানসিকতা এবং তাদের প্রত্যাশার ওপর।
তবে ভাল খারাপ যাই হোক। এ ধরনের সম্পর্কের হার সমাজে দিন দিন বেড়ে চলেছে সেটা কিন্তু দেখার বিষয়। এতে সামাজিক সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে গবেষণা ও প্রতিকারের ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
সিচুয়েশনশিপের লক্ষণগুলো কী কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিচুয়েশনশিপের মধ্যে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে:
সম্পর্কের কোনো স্পষ্ট নাম বা পরিচিতি নেই।
অসংগত যোগাযোগ: নিয়মিত যোগাযোগ বা টেক্সটিং-এর ধারাবাহিকতা থাকে না।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অভাব: সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না।
আবেগের অস্পষ্টতা: আবেগের গভীরতা খুব একটা স্পষ্ট নয়।
আপনি যদি দেখেন সম্পর্কের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত (যেমন একে অপরের বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয়, ছোট ছোট বার্ষিকী উদযাপন, বা নতুন অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি) তৈরি হচ্ছে না, তাহলে হয়তো সময় এসেছে সম্পর্কটির বাস্তবতা যাচাই করার।
যদি সম্পর্কটি কোনো ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ছাড়াই চলতে থাকে এবং আপনি আরো গভীর একটি সম্পর্কে আগ্রহী হন, তাহলে এটি নিয়ে আপনার সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন। তবে এটি করতে গিয়ে চাপ প্রয়োগ করা উচিত নয়।
সিচুয়েশনশিপ বা পরিসম্পর্ক একটি নিরপেক্ষ সম্পর্কের রূপ। এটি একদিকে মজার এবং স্বাধীনতা প্রদানের মাধ্যম হতে পারে, অন্যদিকে এটি আবেগের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। তবে এই ধরনের সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি হলো যোগাযোগ এবং দুই পক্ষের পারস্পরিক সমঝোতা। সবচেয়ে আশংকার হলো মানুষ যদি বিবাহিত জীবন ও পরিবার গঠন না করে এ ধরনের সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে তাহলে পরিবার, সমাজ ও শিশু বিকাশের তথা মানব সভ্যতার জন্য নানা হুমকি নিয়ে আসতে পারে।

