পাপুয়া নিউগিনি: বিমান যে দেশের প্রধান বাহন

পাপুয়া নিউগিনি: বিমান যে দেশের প্রধান বাহন

চলুন যাই পাপুয়া নিউগিনি

পাপুয়া নিউ গিনি (Papua New Guinea) ওশেনিয়া অঞ্চলের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, যা প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। দেশটি নিউ গিনি দ্বীপের পূর্ব অংশ এবং আশেপাশের কয়েকটি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত। এর রাজধানী পোর্ট মোরেসবি। পাপুয়া নিউ গিনি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ, যেখানে সোনা, রূপা, তামা, নিকেল, পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো খনিজ সম্পদের বিপুল মজুদ রয়েছে। এছাড়াও, বনজ, কফি, মাছ, পাম তেল, ভ্যানিলা, কোকো এবং কোপরা উৎপাদন দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দেশটাকে ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইতে পড়ে জেনেছি। ছবি অধিবাসী দেখে আফ্রিকান দেশ মনে হলেও এটা আসলে ওশেনিয়া মহাদেশে অবস্থিত। ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া আর সলোমান দীপের মাঝখানে দেশটিও শত শত দ্বীপের সমষ্টি। তবে এই দেশের প্রধান বাহন হালকা বিমান। দেশটি সম্পর্কে আমার আগ্রহ হয় বছর কয়েক আগে সেখানকার নাগরিক এবং বাংলাদেশী বংশোদ্ভুৎ এক ব্যবসায়ীর ভিসা কার্ড হ্যাক করে ১ বাংলাদেশী তরুদের গ্রেপ্তার হওয়ার পর।
দেশটির পার্বত্য অঞ্চল ও দ্বীপের সমাহার বিধায় পরিবহনের জন্য পাপুয়া নিউ গিনিতে ঔপনিবেশিক আমলে বিমানের প্রচলন শুরু হয়েছিল। বর্তমানে বেশিরভাগ ভ্রমণ ও মলামাল পরিবহনের জন্য বিমানের ব্যবহার করা হয়। রাজধানী পোর্ট মোর্সবির সাথে পিএনজির অন্যান্য প্রধান শহরগুলির কোনও সড়ক যোগাযোগ নেই বললে চলে। একইভাবে, অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে পৌছানোর জন্য একমাত্র মাধ্যম হল হালকা বিমান আর কিছু ক্ষেত্রে জাহাজ বা নৌকা।

সাম্প্রতিক ইতিহাস
১৮৮০ সালে দেশটি উত্তরে জার্মান নিউগিনি এবং পাপুয়া অঞ্চল এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়। দক্ষিণের অংশ, বর্তমান পাপুয়া নিউগিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রণে আসে। আইনত স্বতন্ত্র নিউ গিনি প্রাক্তন জার্মান উপনিবেশ থেকে লীগ অফ নেশনস ম্যান্ডেট পেয়ে স্বতন্ত্র দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নিউগিনি সামরিক অভিযানের সময় দেশটি প্রচণ্ড যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে পাপুয়া নিউ গিনি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে রানী করে একটি স্বাধীন কমনওয়েলথভূক্ত রাজ্যে পরিণত হয়। ২০২২ সালে দ্বিতীয় রানী এলিজাবেথের মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর থেকে তৃতীয় চার্লস পাপুয়া নিউ গিনির রাজা।

নানাবিধ বৈচিত্র: ভাষা ও জনসংখ্যা
পাপুয়ানিউ গিনিতে ইংরেজীসহ ৮৪০টি ভাষা রয়েছে। বেশিরভাগই স্থানীয় ভাষা। গ্রামভিত্তিক দেশটির জনসংখ্যা আসলে ১ কোটি ৭০ লাখের কাছাকাছি। বাংলাদেশের দশভাগের ১ ভাগ। তবুও পাপুয়া নিউ গিনি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে জনবহুল দ্বীপ রাষ্ট্র। আয়তন কিন্তু বাংলাদেশের ৩ গুনেরও বেশী। রাজধানীর নাম পোর্ট মোর্সবি. দেশটি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দ্বীপ। দেশটির আয়তন, ৪,৬২,৮৪০ বর্গ কিমি।

ব্যবসা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা

পাপুয়া নিউ গিনিতে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য বেশ কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করে।
বিশেষ করে খনিজ সম্পদ, কৃষি, বনজ এবং মৎস্য শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য।
দেশটির অর্থনীতি দ্বৈত প্রকৃতির; একটি অংশ আধুনিক খনন শিল্পের উপর ভিত্তি করে, যেখানে সোনা, রূপা, তামা, নিকেল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করা হয়।
অন্য অংশটি ঐতিহ্যবাহী অর্থনীতি, যা বনজ, কফি, মৎস্য, পাম তেল, ভ্যানিলা, কোকো এবং কোপরা উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল।
১৮৫২ সালে পাপুয়ান উপদ্বীপের রেডস্কার উপসাগরের মৃৎপাত্রে প্রথম সোনার সন্ধান পাওয়া যায়। ২০১৯ সালের হিসাবে, পিএনজির প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৩.৮%, মুদ্রাস্ফীতির হার ৪.৩%।

পাপুয়া নিউ গিনির বিনিয়োগ প্রচার কর্তৃপক্ষের (Investment Promotion Authority – IPA) সাথে আপনার ব্যবসা নিবন্ধন করতে হয়। তারপর কর শনাক্তকরণ নম্বর (ট্যাক্স আইডি) নিতে হয়। পাপুয়া নিউ গিনিতে কর্পোরেট আয়করের হার আবাসিক সংস্থার জন্য ৩০% এবং অনাবাসিক সংস্থার জন্য ৪৮%। এখানে প্রাদেশিক বা স্থানীয় আয়কর নেই।

বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা, অভিবাসন ও নাগরিকত্বের সুযোগ??

পাপুয়া নিউ গিনিতে ভ্রমণ, অভিবাসন বা নাগরিকত্বের জন্য বাংলাদেশিদের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সাধারণত, ভিসা প্রাপ্তির জন্য নিম্নলিখিত ধাপগুলি পালন করতে হয়:

পাপুয়া নিউ গিনির দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে ভিসা আবেদনপত্র পূরণ করতে হয়। তবে বাংলাদেশে কোনো দূতাবাস নেই। পাসপোর্ট, ছবি, আমন্ত্রণ পত্র (যদি প্রযোজ্য হয়), আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হয় আবেদনের সাথে। তারপর ভিসা ফি দিয়ে আবেদন করতে হয়। সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করারা পর ভিসা দেয়া হয়।

অভিবাসন বা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হলে, সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ভিসা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা বা বিনিয়োগের ভিত্তিতে আবেদন করা যেতে পারে। প্রত্যেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যা পাপুয়া নিউ গিনির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে।

ইন্দোনেশিয়ার সাথে সীমান্ত থাকলেও থেকে সড়ক পথে পাপুয়া নিউ গিনি ভ্রমণ সম্ভব নয়। এই দুটি দেশের মধ্যে সরাসরি সড়ক সংযোগ নেই। তবে, পাপুয়া নিউ গিনির একমাত্র স্থলসীমান্ত ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া প্রদেশের সাথে রয়েছে। এই সীমান্ত পারাপারের জন্য কিছু প্রস্তুতি নিতে হয়, তবে আগের তুলনায় এখন এটি সহজ হয়েছে। জয়াপুরায় অবস্থিত পাপুয়া নিউ গিনির কনস্যুলেটে পর্যটক ভিসার জন্য আবেদন করা যায়। কনস্যুলেটটি মেনডিতে অবস্থিত, যা জয়াপুরার কেন্দ্র থেকে ১০ মিনিটের সবুজ পাবলিক মোটর ভেহিকল (PMV) রাইডে পৌঁছানো যায়।

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পাপুয়া নিউ গিনিতে অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা নেই। তবে, পূর্বে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পাপুয়া নিউ গিনিতে ভিসা প্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে, যা ৩০ দিনের জন্য প্রদান করা হয়।

খারাপ দিক হচ্ছে,
পাপুয়া নিউ গিনিকে প্রায়শই নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার জন্য বিশ্বের মিডিয়ায় নাম আসে। ল্যানসেটের ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে বুগেনভিল দ্বীপের ২৭% পুরুষ তাদের স্ত্রী বা সঙ্গী নয় এমন নারীদের ধর্ষণ করার কথা জানিয়েছেন। এবং গণধর্ষণের হার ১৪.১%। এই দেশে দলবেঁধে নারী ও পুরষ র্ধষণের একটি পুরনো রীতির কথাও জানা যায়।
এই বিষয়ে আইন প্রয়োগ করে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি উন্নতির চেষ্টা করা হচ্ছে।

পার্বত্য অঞ্চলে উপজাতীয়দের মধ্যে সহিংসতা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যাবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় আরও বেশি প্রাণহানি ঘটছে। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্বেও এই দেশে পর্যটন জনপ্রিয় হয়নি।
আরেকটি বিষয় হলো সাম্প্রতিক বছরসমূহে অবৈধ অভিবাসীরা অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথ হিসেবে পাপুয়া নিউঘিনিকে ব্যবহার করায় এবং তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশী থাকায় বাংলাদেশীদের ভিসা আবেদনগুলো যথাযথভাবে চেক করা হয়। এছাড়া অবৈধভাবে যাওয়া বাংলাদেশী নাগরিক ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের উদ্দ্যেশে যাওয়া বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য পাপুয়া নিউগিনিতে অস্ট্রেলিয়ার আইন শৃংখলা বাহিনীর তত্বাবধানে ডিটেনশান তৈরী করা হয়েছে। যা দালালদের খপ্পরে পড়া হাজারো তরুনের জন্য এক জাহান্নাম বলা যায়। তাই সাধা সাবধান।

ইন্টারনেট অবলম্বনে- জাহাঙ্গীর আলম শোভন। ছবি: FreepiK

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply