পণ্য বয়কট একটি নিরস্ত্র আন্দোলন

পণ্য বয়কট একটি নিরস্ত্র আন্দোলন

পণ্য বয়কট একটি নিরস্ত্র আন্দোলন

পণ্য বয়কট নিয়ে আমাদের দেশে মোটামোটি বেশ জমকালো বিতর্ক আছে। মূলত ৪ ধরনের মানুষ আছে। এক ধরনের মানুষ মনে করেন আমাদের যেহেতু অস্ত্র ও ক্ষমতা নেই এবং অন্য দেশের মানুষ মারারে ইচ্ছেও নেই। তাই আমাদের উচিৎ নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ কোনো আন্দোলনের মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। তাছাড়া যেহেতু যেসব দেশ যুদ্ধবাজ হয় তারা ব্যবসার মাধ্যমে অর্থ আয় করে সে অর্থ যুদ্ধে ব্যয় করে। আমার অনেক কোম্পানী আছে ইসরাইলকে যুদ্ধের জন্য বা বিভিন্ন কাজে অনুদান ও সহযোগিতা করে থাকে। সূতরাং আমাদের মতো ভোক্তাদের উচিৎ নৈতিক জায়গা থেকে তাদের পণ্য বর্জন করা।

অন্য একদল হলো- এদের নিজেদের কোনো চিন্তা নেই। এসব নিয়ে যখন অন্য কেউ মাঠ গরম করে তখন তাদের কাছে মনে হয়। তাইতো আমাদের উচিৎ বয়কট আন্দোলনে শামিল হওয়া। এরা আবার সব সময় সিরিয়াস না আবার তাদের পছন্দের পণ্যের ব্যাপারে তারা নীতিভঙ্গ করে। কাদের সংখ্যা কত শতাংশ সেটা বের করা কঠিন।

সর্বশেষ ইসরাইলকে সহযোগিতা করার অভিযোগে কোকাকোলা বয়কটে বাংলাদেশে বড় ধাক্কা খায় এই জায়ান্ট। সূত্রমতে তাদের বিক্রি ২৩% পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। এমনকি তাদের হয়ে যারা বিজ্ঞাপন করেছিল। তারাও নেটিজেনর রোষানলে পড়েছিল।

অন্য একদল আছে, যারা মনে করে পণ্য টন্য বয়কট হওয়া ঠিক নয়। কারণ এতে দেশের ক্ষতি হয়। প্রথমত, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আমাদের দেশে আসতে চাইবেনা দ্বিতীয়ত দেশে উৎপাদিত বিদেশী ব্রান্ড বয়কট করলে দেশীয় কোম্পানী এবং যারা সেখানে চাকরি করে তাদের উপর প্রভাব পড়ে।

সর্বশেষ দল হলো, কিছুটা বেপরোয়া তাদের মতে। কোথাও কি যুদ্ধ? আর এখানে বয়কট। এসব করে কি লাভ? তারা অতো যুক্তি তর্কের মধ্যে নেই। তাদের অতো সয়না।

আমার মত হলো বয়কট একটি নিরস্ত্র যুদ্ধ। কেউ সংখ্যায় অনেক হওয়া সত্বেও দূর্বল হয় এটা তার জন্য একটা ভাল উপায় রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধের চেয়ে। তবে যুদ্ধি যেমন অনেক প্রশিক্ষণ, প্রস্তুতি, নেতৃত্ব, দায়িত্ব বন্টন, পরিকল্পনা ও রসদ চেইন মেনটেন করে হয়। বয়কট যুদ্ধও সেভাবে করতে হবে। তা না হলে প্রয়োজন নেই। আমার কাছে সবচেয়ে ভাল উপায় হলো আমেরিকা, ইসরাইল,সৌদি ও জাতিসংঘে সারাবিশ্ব থেকে কয়েক লাখ ই-মেইল পাঠানো। বিশেষ বাংলাদেশের পণ্যবর্জন কর্মসূচী বিদেশী বিনিয়োগ বাঁধাগ্রস্থ করতে পারে।

বয়কট আন্দোলন কেমন হওয়া উচিৎ নয়

১) হুট করে ১দিন কথা বললাম তারপর হারিয়ে গেলাম।

২) কোনো সংগঠন নেই, কমিটি নেই,  বিচ্ছিন্ন স্লোগান।

৩) খোজ খবর না রেখে যেকোনো কোম্পানী শত্রু ঘোষণা

৪) পণ্যটি ছাড়া দেশ চলবে কিনা, কোনো স্টাডি না করে শুরু করা।

৫) বিকল্প পণ্য নির্বাচন না করা বা জনসাধারণকে বিকল্প না দেয়া।

ইতিহাসের কিছু বয়কট আন্দোলন

  • গান্ধীজীর লবণ আন্দোলন,

  • দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী বয়কট,

  • ফ্রান্সে কৃষিপণ্য বর্জন—
    এইসবই নির্বিচারে নয়, বরং পরিকল্পিত জনচাপ তৈরি করে পরিবর্তন এনেছে।

  • বাংলাদেশ ২০২৪ সালে কোকাকোলা বয়কট আন্দোলন

 

বয়কট কেন একটি নিরস্ত্র আন্দোলন বা কার্যকর অস্ত্র

১। বয়কট এর জন্য অস্ত্র কিনতে হয়না। এবং মরণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়না

২। যারা অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করতে পারবেনা। মজলুম। কিন্তু সংখ্যায় বেশী,  তাদের জন্য কার্যকর

৩। রসদ যুদ্ধের ১টি অংশ। যখন আপনার বিরুদ্ধে কেউ যুদ্ধ করে। আর সে যুদ্ধে কোনো ব্যক্তি দেশ ও প্রতিষ্ঠান রসদ, অস্ত্র ও অর্থ সহযোগিতা করে তখন তার কার্যকর বয়কট ভাল কাজ দিতে পারে।

৪। যখন আপনি ঐক্যবদ্ধ অথবা বড়ো একটি অংশ আপনার সাথে রয়েছে। তখন আপনি খেল দেখাতে পারেন।

কিভাবে পরিকল্পনা প্রস্তুতি  নিতে হবে

* সঠিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা করতে হবে।

* এই যুদ্ধের মূল  অস্ত্র প্রচারণা। তাই প্রচার যন্ত্র ব্যবহারে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ লাগবে।

* তথ্যের সূত্র উল্লেখ করতে হবে।

* স্পষ্ট উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হবে।

* লক্ষ পরিষ্কার থাকতে হবে? কি কারণে, কার বিরুদ্ধে, কতদিন চলবে?

  • বিকল্প প্রদান (বয়কট করলে কোন পণ্য ব্যবহার করা হবে?)

  • মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে (কারা মানছে, কারা মানছে না)

  • যুক্তিভিত্তিক প্রচারনা চালাতে হবে।

  •  নেতৃত্ব ঠিক করতে হবে। দায়িত্ব বন্টন করতে হবে।

  • কয়েকদিন পর পর পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।

ই-মেইল প্রতিবাদ

কিন্তু ই-মেইল প্রেরণ মনে হয় তার পাশাপাশি চলতে পারে। 


যারা বিভিন্ন বিষয়ে বয়কট আন্দোলন করেন। এবং সামাজিক মাধ্যম গরম রাখেন। তারা আরেকটি কাজ করতে পারেন। তা হলো সংশ্লিষ্ঠ সংস্থা ও দেশে পরিকল্পনা করে সকলকে দিয়ে হাজার হাজার লাখ লাখ প্রতিবাদী ই-মেইল পাঠানো। কারণ আপনি বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় ফেসবুকে কি লিখছেন সেটা কয়জন জানতে পারছে। আপমি যেমন জানেন না যে, তামিল ভাষায় আজ কি কি প্রতিবাদ হয়েছে? গত ১ সপ্তাহে উর্দু ভাষায় কি ভাইরাল হয়েছে? মারাঠি ভাষায় কি পরিমাণ কনটেন্ট গত ১ মাসে লিখা হয়েছে? কিংবা স্পেনিশ ভাষায় সবচেয়ে বেশী হ্যাশট্যাগ কোনটা পড়েছে? সূতরাং আপনার এই ফেসবুক পোস্টও গুটি কয়েক মানুষ ছাড়া পৃথিবীর কেউ জানে না। তাই অফিসিয়াল ও নীতি নির্ধারকদের রিচ করার জন্য ই-মেইল একটি ভাল অস্ত্র। এক সময় মানুষ হাজার হাজার চিঠি লিখতো এবং টাকা খরচ করে তা প্রেরণ করতো। এখনতো বাড়তি টাকা খরচ করতে হচ্ছে না। এমনটি চিঠির ড্রাপ্টিংও একে অপরকে করে দেয়া যায় বা এআই দিয়ে করা যায়।

 

এটা এক ধরনের ডিজিটাল প্রতিবাদ, যার মাধ্যমে—

  • নীতিনির্ধারকদের চাপ সৃষ্টি করা যায়, পরিকল্পিত ভাবে সংশ্লিষ্ঠ সকল নীতি নির্বারকের কাছে ব্যাপক সংখ্যক মেইল পাঠাতে হবে।

  • সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, সংবাদ মাধ্যমেও লেখা ও প্রতিবাদ পাঠানো যায়।
  • মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে সচল করা যায়। তাদের কাছে মেইল প্রেরণ করার মাধ্যমে তবে তথ্যসহ।

আমার পরামর্শ:

* ই-মেইল আন্দোলনের একটি পরিকল্পনা তৈরী করুন।

প্রথমত:  ১ টি মূল কমিটি গঠন করুন। এবং কিছু সাব ও জোনাল কমিটির প্লান করুন।

দ্বিতীয়ত: একটা সংক্ষিপ্ত, যুক্তিবদ্ধ, আবেগ-নিয়ন্ত্রিত ইমেইল খসড়া তৈরি করুন। সেখানে কিছু নির্ভরযোগ্য তথ্য, পরিসংখ্যান, মানবিক আবেদন ও সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান রাখুন।

তৃতীয়ত: যেসব শব্দ লিখলে মেইল স্প্যাম এ চলে যাবে তা পরিহার করে টেকনিক্যালী সঠিকভাবে লিখুন।  কোনো ধরনের ভুল শব্দ, বাক্য, তত্ত্ব, তথ্য দেয়া থেকে বিরত থানুন। কোনো তথ্য দিলে তার সূত্রও লিংক উল্লেখ করুন।

তৃতীয়ত: কাদের কাছে মেইলগুলো পাঠানো হবে সকলের ই-মেইল আইডি এক জায়গায় করুন।

চতৃর্থত: ওয়েবসাইট, পেইজ ও পোস্টারিং এর মাধ্যমে প্রচার করুন।  সবাইকে তালিকাভূক্ত জায়গায় মূল মেইলকে একটি সম্পাদনা করে পাঠাতে বলেন।

পঞ্চমত: টাইম লাইন সেট করে কাজ করুন। যেমন আগামী ২৪ ঘণ্টায় ১০ হাজার মেইল। ৭ দিনে ১ লাখ। ১ মাসে ১০ লাখ। এভাবে । ট্রাক করার জন্য সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার করুন। যারা মেইল পাঠিয়েছে তাদেরকে বলুন একটি কমন হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে পোস্ট বা কমেন্ট করতে।

এবার আসি পণ্য বয়কট আন্দোলন।

বাংলাদেশে অনেক ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তাই যারা এই আন্দোলন করছেন। তাদেরকে বলবো। সত্যিকার কারা ইসরাইলকে সহযোগিতা করছে। জেনে তারপর করুন। ভুল জিনিস করলে ২ দিন পর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে। একসময় মানুষ আর এ ধরনের আহবানে সাড়া দেবে না।

সেজন্য যা করতে পারেন। ( এটা কঠিন কিছু না। চ্যাট জিপিটিকে বললেও করে দেবে)

  1. তালিকা প্রস্তুতি: ইসরায়েলকে সহায়তাকারী কোম্পানিগুলোর সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি।

  2. সচেতনতা বৃদ্ধি: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্যভিত্তিক প্রচারণা।

  3. বিকল্প পণ্যের প্রচার: স্থানীয় ও নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পণ্যের তালিকা প্রস্তুত ও প্রচার।

  4. সমন্বিত কর্মসূচি: স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সাথে সমন্বয় করে বয়কট কার্যক্রম পরিচালনা। 

৪. ইসরায়েলকে সহায়তাকারী কোম্পানির তালিকা

(এআই এর সহযোগিতায় করা হয়েছে)

নিম্নে কিছু উল্লেখযোগ্য কোম্পানির তালিকা দেওয়া হলো, যারা ইসরায়েলের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িত:

প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা:

  • Microsoft: ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে ক্লাউড ও AI প্রযুক্তি সরবরাহ করে। (বাংলাদেশে প্রায় সবাই এটা ব্যবহার করে। এখন আপনি হয়তো এটা বয়কট করতে পারবেন না। তাই এই কোম্পানীকে ১০ লাখ মেইল পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।)

  • Google: ইসরায়েলে গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালনা করে।

  • (দেখেন গুগলের সেবা এমন পর্যায়ের যে আপনি কেন বিশ্ব গুগলকে বয়কট করতে পারবে না। তাহলে মেইল পাঠানো কি ভালে না।)
  • Amazon: ইসরায়েলে প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও স্টার্টআপ অধিগ্রহণ করে।
  • (অ্যামাজন এর সমকক্ষ কেউ নেই। তাকে বয়কট করে যদি কোনো ফল পাওয়া যায়। সেজন্য বাংলাদেশ কোনো বিষয় না তার কাছে। বিশ্বব্যাপী আন্দোলন হলে সম্ভব)
  • Intel: ইসরায়েলে বৃহৎ গবেষণা ও উৎপাদন কেন্দ্র পরিচালনা করে।

  • ( আমরা অনেক সময় না জেনেও এবং অনিচ্ছা সত্বেও ব্যবহার করি। তাই এদের জন্য  মেইল প্রেরণ ভাল পদ্ধতি)

খাদ্য ও পানীয়:

( এখানে কিছু করার আছে)

  • McDonald’s: ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে সমর্থন প্রদান করে।

  • Coca-Cola: ইসরায়েলে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে।

  • Nestlé: ইসরায়েলের Osem কোম্পানির মালিকানায় রয়েছে।

️ পোশাক ও প্রসাধনী:

( হ্যাঁ এগুলো না হলে আপনার কিচ্ছু আসবে যাবে না। আবার এগুলোতে বাংলাদেশী ক্রেতা এত কম যে, তাদেরও কিছু হবে না।

  • Puma: ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে স্পনসর করে।

  • Zara (Inditex): ইসরায়েলে ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান:

  • AXA: ইসরায়েলি ব্যাংকে বিনিয়োগ করে।

  • (সত্যি কথা বলতে একে আপনার কিছু করার নেই।

দ্রষ্টব্য: এই তালিকাটি বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত এবং সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে।

তাহলে বিষয়টা দাঁড়ালো ই-মেইল খুভ ভাল অস্ত্র। যা সব জায়গায় চলবে। তবে পণ্য বয়কট সঠিকভাবে করেও যদি যেসব ক্ষেত্রে কিছু করা যায়। মন্ত কি?