নোয়াখালী বিভাগ আন্দোলনের ইতিবৃত্ত
বাংলাদেশের উপকূলীয় জনপদ নোয়াখালী—একদিকে লবণাক্ত বাতাসে গড়া প্রকৃতি, অন্যদিকে শত বছরের সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাজনৈতিক চেতনা ও সংগ্রামের ভূমি। এই জেলার অতীত যেমন গভীর, তেমনি বর্তমানও আন্দোলন, দাবি ও স্বপ্নে পূর্ণ। “নোয়াখালী বিভাগ চাই”—এই দাবিটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দাবি নয়; এটি বৃহত্তর নোয়াখালীর মানুষের আত্মপরিচয়, ঐতিহাসিক অধিকার, উন্নয়নবঞ্চনার ক্ষত, ও ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্ক্ষার দীর্ঘদিনের প্রতিফলন।
নোয়াখালীর উৎপত্তি ও প্রশাসনিক বিবর্তনের শিকড়
বাংলাদেশের প্রাচীন জেলাগুলোর একটি নোয়াখালীর পূর্বনাম ছিল ভুলুয়া। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৭২ সালে এখানে জেলা প্রশাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮২১ সালে ভুলুয়াকে জেলা হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে প্রশাসনিক কাঠামোর নতুন যুগ শুরু হয়। ১৮৬৮ সালের ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনের পর কর্তৃপক্ষ নতুন একটি খাল খননের সিদ্ধান্ত নেয়, আর সেখান থেকেই ভুলুয়া নাম পরিবর্তিত হয়ে আসে “নোয়াখালী”—অর্থাৎ ‘নতুন খাল’।
অবিভক্ত ব্রিটিশ বাংলায় পূর্ববঙ্গকে খাজনা আদায় সুবিধার্থে সরকার চারভাগে ভাগ করে। এগুলোকে বলা হতো কালেন্টটোরাল। এই চারটি ভাগ ছিল ঢাকা, রংপুর, নোয়াখালী ও মোমেনশাহী। মানে সেসময় থেকে নোয়াখালী দেশের ৪টি প্রধান অঞ্চলের একটি ছিল। বিষয়টি আমি আমার লেখা বই ‘‘দেখব বাংলাদেশ এবং গড়ব বাংলাদেশ ( প্রথম প্রকাশ ঢাকা ২০১৭) তে তুলে ধরেছি।
সে সময় বৃহত্তর নোয়াখালী জেলা গঠিত হয় ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর মহকুমা নিয়ে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় ও ১৯১১ সালে তা রদের আগমুহূর্তে ১৯১০ সালে নোয়াখালী অঞ্চলের উন্নয়ন প্রশ্নে জনমত গঠনের সূত্রপাত দেখা যায়। অঞ্চলটির মানুষ তখন থেকেই উন্নয়ন কাঠামোয় স্বতন্ত্র পরিচয়ের দাবি তুলতে থাকে।
১৯৮৪ সালে দেশের সব মহকুমা জেলায় রূপান্তরিত হলে ফেনী ও লক্ষ্মীপুর পৃথক জেলা হিসেবে গঠিত হলেও, বৃহত্তর নোয়াখালীর ঐক্যবোধ আরও দৃঢ় হয়। বহু দশক ধরে এই অঞ্চলকে স্বতন্ত্র বিভাগ ঘোষণার দাবি চলতে থাকে।
নোয়াখালী বিভাগ আন্দোলনের সূচনা : ১৯৯৪
নোয়াখালী বিভাগ আন্দোলনের সংগঠিত রূপ শুরু হয় ১৯৯৪ সালে, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম চৌধুরীর নেতৃত্বে। দেশজুড়ে যখন নতুন বিভাগ গঠনের বিষয়ে আলোচনা থেমে আছে, তখন নোয়াখালীবাসী আবারও উচ্চকণ্ঠ হয়।
১ নভেম্বর ১৯৯৪, মাইজদী কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনে
হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে ১০ দফা দাবিতে গণ-অনশন চলতে থাকে। তখন বাংলাদেশে মাত্র চারটি বিভাগ—ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা। সিলেট, রংপুর কিংবা ময়মনসিংহ এখনো স্বতন্ত্র বিভাগ নয়। সে সময়কার অন্যতম দাবি ছিল— “বৃহত্তর নোয়াখালীকে আলাদা বিভাগ ঘোষণা করতে হবে।”
১৯৮৪ সালে ১৯ জেলা ভেঙ্গে ৬৪ জেলা এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা কেন্দ্রীক ৪ বিভাগ ঘোষনার পর থেকেই নোয়াখালী বিভাগের দাবীতে সোচ্চার হয়ে উঠে নোয়াখালীয়ানরা।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে আন্দোলন : জাতিসংঘে ৬ ঘণ্টার অনশন
১৯৯৪ সালেই আরেকটি নাটকীয় অধ্যায় যোগ হয় আন্দোলনে। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী নোয়াখালীবাসীরা জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে হাড়কাঁপানো শীতে ৬ ঘণ্টার অনশন পালন করেন।
তাদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড—
“Noakhali Division”,
“Stop Discrimination”,
“We Want Noakhali Division”
প্রভৃতি।
অনশন শেষে তারা জাতিসংঘ কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেন। সেখানে বলা হয়—
“নোয়াখালী একটি অবহেলিত ও উন্নয়ন-বঞ্চিত অঞ্চল। প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত করতে নোয়াখালীকে বিভাগ করা প্রয়োজন।” এটাই নোয়াখালী বিভাগ দাবির প্রথম আন্তর্জাতিক উচ্চারণ।
ধারাবাহিক আন্দোলন : ২০০৫, ২০১২ এবং পরবর্তী পর্যায়
২০০৫ : গণ-অনশন ও জনতার সমাবেশ
২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি মাইজদী রেলগেট মাঠে আবারও “নোয়াখালী বিভাগ চাই” শীর্ষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। হাজারো মানুষ এতে অংশ নেন। বক্তারা বলেন— “বঞ্চনার ইতিহাসের অবসান ঘটাতে হলে নোয়াখালীকে বিভাগ করতে হবে।”
২০১২ : নোয়াখালী বিভাগ বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটির গঠন
২০১২ সালে গঠিত হয় “নোয়াখালী বিভাগ বাস্তবায়ন সংগ্রাম কমিটি”।
যদিও আন্দোলন খুব শক্তিশালী ছিল না, তবুও ধারাবাহিক প্রয়াস, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়ার মধ্য দিয়ে দাবি টিকে থাকে।
প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস : নতুন উত্তেজনার সূচনা
২০২২ সালের ২৭ নভেম্বর নিকার বৈঠকে উত্থাপিত হয় ‘পদ্মা বিভাগ’ ও ‘মেঘনা বিভাগ’ গঠনের প্রস্তাব। কুমিল্লা-চাঁদপুর-কোম্পানীগঞ্জ–সম্ভাব্য মেঘনা বিভাগ ঘোষণার গুঞ্জন উঠতেই নোয়াখালীবাসীরা প্রশ্ন তোলে—
“তাহলে বৃহত্তর নোয়াখালীর নিজস্ব বিভাগ হবে না?”
এরপর দাবি আবারও জোরালো হতে থাকে।
২০২৫: আন্দোলনের নতুন উত্থান ও সর্বব্যাপী বিস্তার
২০২৫ সালে এসে নোয়াখালী বিভাগ আন্দোলন নতুন শক্তি ও বিস্তারের রূপ নেয়।
সর্বস্তরের মানুষ—রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, শ্রমিক, ছাত্র, প্রবাসী—সকলেই যুক্ত হন।
মূল কর্মসূচিগুলো ছিল—
-
জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট
-
মাইজদী মোহাম্মদীয়া সড়কে সড়ক অবরোধ
-
বেগমগঞ্জের চৌমুহনী চৌরাস্তায় মহাসড়ক অবরোধ
-
গ্রাম পর্যন্ত আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তার
-
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিদেশের শহরগুলোতে নোয়াখালী বিভাগ চাই আন্দোলন
-
“নোয়াখালী বিভাগ বাস্তবায়ন সমন্বয় কমিটি” ও “নোয়াখালী বিভাগ বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ”–এর কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি
রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে BNP, জামায়াত, এনসিপি এবং অন্যান্য স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনও আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার হয়।
বৃহত্তর নোয়াখালী বিভাগ : কাদের নিয়ে?
প্রস্তাব এসেছে তিনভাবে—
-
নোয়াখালী-ফেনী-লক্ষ্মীপুর—তিন জেলার বিভাগ
-
বৃহত্তর নোয়াখালী, চাঁদুপর সাথে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের কিছু অংশসহ
-
কুমিল্লা ও চাঁদপুরসহ নতুন প্রশাসনিক অঞ্চল (যা নিয়ে বিতর্ক আছে)
আন্দোলনকারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য মডেল হলো—
“নাম হবে নোয়াখালী বিভাগ, কেন্দ্র হবে নোয়াখালী।”
বিভাগ গঠনের পক্ষে মূল যুক্তিসমূহ
নোয়াখালী বিভাগ চাওয়ার পেছনে নিচের যুক্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত—
১. জনসংখ্যা ও আয়তন
বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ বাস করে—একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ প্রতিষ্ঠার উপযোগী জনসংখ্যা।
২. ভৌগোলিক দূরত্ব
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সদর দপ্তর দূরে হওয়ায়—
-
প্রশাসনিক কাজে সময় লাগে
-
ব্যয় বৃদ্ধি পায়
-
জরুরি সেবা পেতে বিলম্ব ঘটানো হয়
৩. অর্থনৈতিক অবদান
নোয়াখালী রেমিট্যান্সের অন্যতম বড় উৎস।
ইন্ডাস্ট্রি, বাজার, বাণিজ্য ও সড়ক যোগাযোগ ব্যাপক উন্নত—
একটি বিভাগকে ধারণ করার সামর্থ্য রয়েছে।
৪. ইতিহাস ও সংস্কৃতি
স্বতন্ত্র উপভাষা, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও গৌরবময় বিপ্লব-সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে।
৫. শিক্ষাবোর্ড ও প্রশাসনিক বিভ্রান্তি
নোয়াখালী চট্টগ্রাম বিভাগের অংশ, কিন্তু শিক্ষা বোর্ড কুমিল্লার অধীনে—
একে মানুষ প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব মনে করে।
৬. উপকূলীয় উন্নয়ন
স্বতন্ত্র বিভাগ হলে উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়ন আরও কার্যকর হবে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমর্থন ও জনমতের মেরুকরণ
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রবাসীদের মধ্যে এখন এক অভিন্ন দাবি—
“নোয়াখালী বিভাগ গঠন করতে হবে।”
BNP প্রকাশ্যে বলেছে— িক্ষমতায় গেলে নোয়াখালী বিভাগ গঠন করা হবে। একই কথা বলছে জামায়াত ও এনসিপি। এজন্য আন্দোলনে নতুন রূপ এসেছে—ঘেরাও, স্মারকলিপি, সড়ক অবরোধ, গণজমায়েত, প্রবাসী বিক্ষোভ।
নোয়াখালী বিভাগ আন্দোলন কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামোর দাবি নয়;
এটি বৃহত্তর নোয়াখালীবাসীর বহুপ্রজন্মের ইতিহাস, বঞ্চনার স্মৃতি, উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বহমান সংগ্রাম।
বিগত শতাব্দীর প্রশাসনিক পরিবর্তন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্মারকলিপি—
সব জায়গায় একটি দাবি প্রতিধ্বনিত হয়েছে—
