gen z, Color,

নকশার তিন স্তম্ভ:  রঙ, আবেগ ও যোগাযোগ

নকশার তিন স্তম্ভ:  রঙ, আবেগ ও যোগাযোগ

রঙ হলো নকশার প্রথম দরজা। আমরা চোখ মেলেই যেটা সবচেয়ে আগে দেখি, সেটাই রঙ। এটি সরাসরি আবেগের উপর প্রভাব বিস্তার করে, যেমন, কী এটি: হিউ (মূল রঙ), স্যাচুরেশন (তীব্রতা), আর ভ্যালু (আলো,অন্ধকারের মাত্রা)।

রং কিভাবে কাজ করে। লাল মানে আবেগ, শক্তি কিংবা বিপদ। নীল মানে শান্তি, আস্থা কিংবা শীতলতা। কখনো এই রংটির আবেদন একটুও কমেনি। প্রাথমিকভাবে আমরা একে শিশুদের পছন্দের রং মনে করলেও। বড় বড় ব্রান্ড লাল রং ব্যবহার করে। তবে লাল এর মাত্রার ভিন্নতা থাকে। এভাবে অন্যান্য রং এর অর্থ প্রকাশক। একটি স্পা ওয়েবসাইট তাই শান্ত নীল, সবুজ ব্যবহার করে, আবার শিশুদের খেলনার বিজ্ঞাপনে ব্যবহার হয় উজ্জ্বল ও প্রাথমিক রঙ। যেগুলো এক দেখায় আমরা তার নাম বলে দিতে পারি।

রং এভাবে অর্থ বহন করে। রঙের সাংস্কৃতিক অর্থ আছে। সবুজ মানে পরিবেশবান্ধব, পশ্চিমে সাদা বিয়ের প্রতীক, আবার অনেক পূর্বদেশে সাদা হলো শোকের রঙ। ভারতে রমনীরা বিয়ের পর রঙীন বসন পরিত্যাগ করে সাদা গ্রহণ করে। ভালো যেকোনো ডিজাইন এসব বিবেচনা করে তৈরী করা হয়।

রং কখনো একতা আবার কখনো বৈপরীত্য তৈরি করে। একই রঙের বিভিন্ন শেড ব্যবহার করলে নকশায় ঐক্য আসে। আবার ধূসর ঘরে এক টুকরো হলুদ বসালে সেটা হয়ে ওঠে কেন্দ্রবিন্দু। এভাবে আশপাশের রং এর বিবেচনায় নতুন রং চিন্তা করতে হয়। কখনো ম্যাচ আবার কখনো মিসম্যাচ কিংবা কন্ট্রাস্ট বা বিপরীত কালার ব্যবহার করে পুরো ডিজাইনের একটি অর্থবোধক চিত্র তৈরীর চেষ্টা করেন ডিজাইনার।

এসব ক্ষেত্রেও ছোট ছোট পরিবর্তনে বড় প্রভাব রাখতে পারে। শুধু বোতামের রঙ নীল থেকে কমলা করলেই ক্লিক অনেক বেড়ে যেতে পারে, কারণ এটা ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে বেশি কনট্রাস্ট তৈরি করে।

আকৃতি, কাঠামো ও কার্যকারিতার কথা বলতে গেলে আকৃতি হলো কোনো জিনিসের গঠন। আমরা কেমন ব্যবহার করব, সেটি অনেকটাই এর ফর্ম ঠিক করে দেয়। এটিতেআকার, অনুপাত, সিলুয়েট বা সামগ্রিক গঠন নির্দেশ করে।

চেয়ারের সমান আসন আর বাঁকা হেলান বসার সুবিধার জন্য, বোতলের সরু গলা তরল ঢালার জন্য। এভাবে আকৃতি প্রকৃতি অনুসারে বস্তুর কার্যকারিতা ঠিক হয়। এবং বস্তর বয়সও একটা বিবেচ্যবিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রং এর মতো আবেগ প্রকাশ করতেও কখনো আমরা আকরের কাছে যাই। বাঁকানো, প্রাকৃতিক আকৃতি নরম ও বন্ধুত্বপূর্ণ মনে হয় (যেমন কাপের গোলাকার ধরন)। তীক্ষ্ণ জ্যামিতিক রেখা শৃঙ্খলা ও দক্ষতার ইঙ্গিত দেয় (যেমন আকাশচুম্বী ভবন)।

সামঞ্জস্য বা টান তৈরি করতে একই ধাঁচের আকৃতি ব্যবহার করলে শান্তি আসে, ভিন্ন ধাঁচ মেশালে চাক্ষুষ টান জন্মায়। তখন ডিজাইনটি তৈরী হলে সঠিক উপস্থাপন দ্বারা মানুষকে টানতে পারবে।

ছোট পরিবর্তনে বড় প্রভাবগুলো অদৃশ্যমান কিছু নয়। কাঁচির হাতলে সামান্য বাঁকানো রেখা আঙুলে আরাম দেয় তেমনি তাই নকশায় সূক্ষ্ম পরিবর্তন ব্যবহারযোগ্যতাকে আমূল বদলে দিতে পারে।

টেক্সচার কখনো অনুভূতির সাথে সম্পর্ক তৈরী করে। টেক্সচার হলো কোনো কিছুর পৃষ্ঠের গুণ। এটা স্পর্শযোগ্যও হতে পারে, আবার চাক্ষুষও হতে পারে। এটি স্পর্শযোগ্য (যেমন খসখসে পাথর বা মসৃণ কাচ) অথবা দৃষ্টিগত (যেমন কাঠের দানার ছবি স্ক্রিনে)।

এর গভীরতা এক আগ্রহ তৈরি করে, ভয় সৃষ্টি করে ও রহস্য বোঝায় খসখসে ইটের দেয়াল ভারী মনে হয়, চকচকে কাচ হালকা বোঝায়।

মূল্যবোধকে প্রভাবিত করতে টেক্সার ব্যবহার হয়। চামড়া, কাঠ বা ধাতুর টেক্সচার বিলাসিতা ও মানের ইঙ্গিত দেয়। একসময় পাটের ব্যাগ সাধারণ কিছু মনে হতো। এখন দাম বৃদ্ধি ও ব্যবহার কমে যাওয়ার কারণে পাটের ব্যাগ এক ধরনের রুচিশীলতার ইঙ্গিত দেয়।

কিছু কিছু এতটাই স্পর্শী যে ইন্দ্রিয়কে উসকে দেয়। নরম কার্পেট দেখলে ভাল লাগার অনুভূতি হয়, যা উষ্ণতারও প্রতীক বটে। ঠাণ্ডা স্টিলের টেবিল আধুনিকতা আর স্বাস্থ্যবিধির প্রতীক। এটা স্থায়ীত্ব ও কাঠিন্যের একটি মানসিক অনুভূতি সঞ্চালিত করে।

ছোট পরিবর্তনে বড় প্রভাব ফেলে এই বিষয়ে আগে পেন্সিল আবিষ্কারে যে পরিবর্তনের কথা বলেছি। তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। বর্তমানে স্মার্টফোনে ম্যাট ফিনিশ শুধু দৃষ্টিনন্দন নয়, আঙুলের দাগ আটকায় আর হাত থেকে পিছলানো কমায়।

আর আসল ম্যাজিক ঘটে যখন রঙ, আকৃতি আর টেক্সচার একসাথে আসে। কাচের ভবনের আকৃতি যদি কাঠের প্যানেল টেক্সচার দিয়ে মোড়ানো হয়, তখন সেটি তাপরোধক হয়ে ওঠে। সাধারণ গোল ভাঁজানো মাটির ফুলদানির আকৃতি যদি পুরনো নীলচে রঙের ক্র্যাকেল গ্লেজ (টেক্সচার+রঙ) পায়, তখন তা প্রাচীন ও মূল্যবান মনে হয়।

ডিজাইনার আসলে একজন সঙ্গীত পরিচালকের মতো এই তিন উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য আনে। সামান্য উষ্ণ রঙ, নরম কোণ বা খসখসে টেক্সচারের মতো ছোট ছোট পরিবর্তন নকশাকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তোলে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply