দুই ট্যাটনের গল্প: সমানে সমান- জসীম উদদীন
( জসীম উদদীন এর এই গল্পটি আমি অনেক ছোটবেলায় পড়েছিলাম। মনে গেঁথে গিয়েছিল। কিন্তু ছোটোখাটো অনেক কিছু ভুলে গিয়েছিলাম। নতুন করে আমার পড়ে স্মৃতি ঝালািই করে নিলাম। এটা বাচ্চারা শুনে অনেক মজা পায়) ছবি: চ্যাট জিপিটির সৌজন্য
ছোট্ট একটা নদী, হাঁটিয়াই পার হওয়া যায়। তার পশ্চিম পারে থাকে এক ট্যাটন, নাম ধূলি । পুব পারে থাকে আর এক ট্যাটন । তার নাম বালি । ট্যাটন মানে অতি চালাক। লোক ঠকাইয়া বেড়ানোই তাহার পেশা । বালি এক ছালা বিচেকলার বীজ মাথায় লইয়া নদীর ওপার দিয়া যাইতেছে। পশ্চিম পারের ট্যাটন ধূলি তেমনি আর এক ছালা গাবের পাতা মাথায় করিয়া নদীর এপার দিয়া যাইতেছে । কেউ কাহাকে জানে না ।
ধূলি বালিকে ডাক দিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তোমার ছালায় কি লইয়া যাইতেছ ?”
দুইজনে নদীর এপার ওপার পথ ধরিয়া চলিতেছে। আর প্রত্যেকে প্রত্যেকের বুদ্ধিতে শান দিতেছে, কি করিয়া একে অপরকে ঠাকইবে। ধূলি ভাবে, যদি আমার গাবের পাতার বস্তা বদল করিয়া ওর গোলমরিচের বস্তা লইতে পারিতাম! বালি ভাবে, যদি আমার কলার বীজের বস্তা বদল করিয়া ওর তেজপাতার বস্তা লইতে পারিতাম! কিন্তু কেউ কাহাকে কিছু বলে না, কেবল মনে মনে নানা ফন্দি ফিকির আঁটে। আর একথা সেকথা বলিয়া এ ওর আপন হইতে চায় ।
অনেকক্ষণ পর বালি ধূলিকে বলে, “আচ্ছা ভাই! তোমার সঙ্গে যখন এতই খাতির হইল, আইস আমরা একে অন্যের বোঝা বদলা-বদলি করি।” ধূলি ত তাহাই চায়! সে তাহার গাবের পাতার বস্তার বদলে যদি গোলমরিচের বস্তা লইতে পারে তবে ত পোয়াবারো ।
একটু কাশিয়া সে জবাব দেয়, “আগেকার দিনে রাজপুত্রেরা বন্ধুত্ব করিতে পাগড়ি বদল করিত, এসো ভাই আমাদের বন্ধুত্ব হোক ছালা বদল করিয়া ।” দুইজনেই দুইজনের কথায় খুশি ।
বালি তাহার কলাবীজের বস্তা বদল করিয়া ধূলির গাবের পাতার বস্তা লইল । এ বলে আমি ওকে ঠকাইয়াছি। ও বলে আমি তাকে ঠকাইয়াছি! সেইজন্য কেউ কারো বস্তা পরীক্ষা করিল না ।
বাড়িতে লইয়া গিয়া ধূলি দেখে, তার বস্তা ভরিয়া শুধু বিচেকলার বীজ। একটাও গোলমরিচের দানা নাই। বালি ও তেমনি দেখিল, তার বস্তা ভরিয়া শুধু গাবের পাতা। প্রত্যেকে মনে মনে হাসিল, আর এ ওর বুদ্ধির তারিফ করিতে লাগিল। কিন্তু দুইজনে মনে মনে ফন্দি আঁটিতে লাগিল, কি করিয়া একে অপরকে ঠাকইবে।
পরদিন ভোরবেলায় বালি নদীর ওপারে চুলা জ্বালাইয়া তার উপরে এক হাঁড়ি গরম পানি জ্বাল দিতে লাগিল। নদীর এপার হইতে ধূলি ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “দোস্ত! কি করিতেছ ?”
ধূলি বলিল, “আমিও ভাই তোমার গোলমরিচ বেচিয়া বেশ কিছু পাইয়াছি। কিন্তু আমার ত চুলা নাই । আমার কাছে কিছু চাউল আছে। তোমার হাঁড়ির মধ্যে ছাড়িয়া দেই। দুইজনে একসঙ্গে ভাত খাইব ।”
বালি ভাবিল, “তা মন্দ কি! আমি ত শুধু পানি সিদ্ধ করিতেছি। ও যদি এর মধ্যে কিছু চাউল ছাড়িয়া দেয়, তবে ওর উপর দিয়াই আজিকার সকালের আহারটা সারিয়া লইব ।”
প্রকাশ্যে বলিল, “তা বেশ ত তোমার চাউল লইয়া আইস। আমরা একসঙ্গে রান্না করিয়া খাই ।”
নদীতে পানি অল্প । হাঁটিয়াই পার হওয়া যায়। এপার হইতে ধূলি আসিয়া সেই উনানের পাশে বসিল। বালি যেই একটু ওদিকে তাকাইয়াছে, অমনি ধূলি তার কাপড়ের এক কানি একটা পোটলার মতো করিয়া ধরিল। যেন ধূলি বুঝিতে পারে, তার মধ্যে চাউল আছে । তারপর বালিকে বলিল, “দেখ— দেখ ভাই । অকাশ দিয়া কেমন একটা পাখি যাইতেছে।”
পুব পারের ট্যাটন একটু চাহিয়াছে, অমনি ধূলি তার কাপড়ের পুটলি খুলিয়া হাঁড়ির মধ্যে চাউল ঢালিতেছে এরূপ ভান করিয়া কাপড় ঝাড়া দিতে লাগিল। তারপর হাঁড়ির মুখে ঢাকনি দিয়া দুইজন চুলায় জ্বাল দিতে লাগিল। অনেকক্ষণ চুলায় জ্বাল দিয়া যখন তাহারা ঢাকনি খুলিল, তখন দেখা গেল হাঁড়ির মধ্যে শুধুই গরম পানি সিদ্ধ হইতেছে। একটাও ভাত নাই । একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিয়া তাহারা সবই বুঝিতে পারিল ।
বালি তখন ধূলিকে বলিল, “দেখ ভাই ! এখন সত্যই বুঝিতে পারিলাম, আমরা কেহ কাহারও চাইতে বুদ্ধিতে কম না। আমাদের এই মূল্যবান বুদ্ধি একে অপরের উপর ছাড়িয়া শুধুই সময় নষ্ট করিতেছি। এসো আমরা সত্যিকার বন্ধু হই। আমাদের দুইজনের বুদ্ধি একসঙ্গে ব্যবহার করিলে আমরা অনেক লাভ করিতে পারিব।”
ধূলি বলিল, “বেশ ভাই! আমি তাহাতে রাজি আছি ।”
তখন দুই বন্ধু অনেক পরামর্শ করিয়া এদেশ ছাড়িয়া বহু দূরে আর এক দেশে চলিয়া গেল । সেখানে যাইয়া শুনিল, এক বিদেশী সওদাগর কিছুদিন হইল মারা গিয়াছে ।
তাহার টাকা-পয়সার অন্ত ছিল না। আত্মীয়-স্বজনেরা তাহা ভাগ-বাটোয়ারা করিয়া লইয়াছে ।
পরদিন সকালবেলায় বালি সেই সওদাগরের বাড়ির সামনে যাইয়া ডাক ছাড়িয়া কাঁদিতে লাগিল । তাহার কান্না শুনিয়া পাড়ার সকলে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কাঁদ কেন ?”
বিদেশী লোক বলিয়া সবারই একটু দয়ার ভাব! আর লোকটি অমন ইনাইয়া বিনাইয়া কাঁদিতেছে! তাহার কান্না শুনিয়া সকলের চোখে পানি আসিল ।
কিন্তু সওদাগরের আত্মীয়-স্বজনেরা বলিল, “ও যে সওদাগরের ছেলে তার প্রমাণ কি ?”
বালি তখন কান্না থামাইয়া বলিল, “আমার পিতা আমাদের দেশে যাইয়া আমার মাকে বিবাহ করিয়াছিলেন । তারপর এদেশে আসিয়া আমাদের খবর লন নাই। আমি বিদেশী লোক । প্ৰমাণ কোথায় পাইব ? মৌলবি সাহেবেরা বলেন, মরা ব্যক্তির জান তার কবরের মধ্যে লুকাইয়া থাকে। আপনজনের ডাকে তাহারা কখনও কখনও গায়েবি আওয়াজ করিয়া থাকেন। আসুন আপনারা আমার সঙ্গে । বাপজানের কবরের কাছে যাইয়া একবার তাহাকে ডাক দেই। যদি তিনি কথা বলেন, তবে প্রমাণ হইবে আমি তাঁর সত্যিকার ছেলে ।”
একথা শুনিয়া সকলেই রাজি হইল। কবরের কাছে আসিয়া বালি ডাক ছাড়িয়া কাঁদিতে লাগিল, “বাপজানগো! তুমি মরিয়া গিয়াছ। আমাকে কিছু দিয়া যাও নাই। আমি যদি তোমার সত্যিকার ছেলে হই, তবে আমার ডাকে সাড়া দাও।”
গাঁয়ের লোকেরা অবাক হইয়া শুনিল, কবরের ভিতর হইতে গোঁ গোঁ আওয়াজ হইতেছে। বালি তখন বলিল, “বাপজানগো ! তোমার টাকা-পয়সা সকলে ভাগ করিয়া লইয়াছে । আমার কিছুই নাই । আমাকে কিছু দিয়া দাও ।”
কবরের ভিতর হইতে ধূলি আওয়াজ করিল, “ও আমার সত্যিকার ছেলে। তোমরা ওকে সাত ছালা টাকা দাও। নতুবা তোমাদের খুব খারাপ হইবে।”
ধূলি কবরের মধ্যেই পড়িয়া রহিল। একবারও বালি তাহার কথা মনে করিল না। দুপুরবেলায়, যখন কবরের কাছে কোনো জনমানব নাই, সেই সময় ধূলি কবর হইতে উঠিয়া জানিল, বালি আগেভাগেই টাকা লইয়া চলিয়া গিয়াছে ।
সে তখন শহরের দোকান হইতে খুব দামি একজোড়া জরির জুতা কিনিল ; তারপর যে পথ দিয়া বালি গরুর গাড়ি লইয়া গিয়াছিল, তাহারই চাকার দাগ দেখিয়া দৌড়াইতে লাগিল । অল্পক্ষণের মধ্যে সে বালির কাছাকাছি আসিয়া পৌঁছিল এবং অন্য পথে ঘুরিয়া দৌড়াইয়া তার খানিকটা সামনে যাইয়া একখানা জরির জুতা পথের মধ্যে রাখিয়া দিল ।
তারপর আরও মাইল খানেক যাইয়া অপর জুতাখানা পথের আর এক জায়গায় রাখিয়া দিয়া সে একটা ঝোপের মধ্যে লুকাইয়া রহিল ।
বালি গরুর গাড়ি লইয়া যাইতে দেখে পথের মধ্যে একখানা সুন্দর জরির জুতা পড়িয়া রহিয়াছে। কিন্তু একখানা জুতা দিয়া কি কাজ হইবে? পরিতে ত পারিবে না! জুতাখানা নাড়িয়া চাড়িয়া সে পথের মধ্যে ফেলিয়া দিল ।
তারপর মাইলখানেক দূরে যাইয়া সে আর একখানা জুতা দেখিতে পাইল । তখন সে ভাবিল, “আগের জুতাখানা যদি সঙ্গে আনিতাম, তবে ত দুইখানা একত্র করিয়া বেশ পায়ে দিতে পারিতাম । আর এই জুতাখানা আমার পায়েও বেশ লাগসই ।” তখন সে গাড়ি থামাইয়া আগের জুতাখানা আনিবার জন্য দৌড় দিল ।
ইতিমধ্যে ঝোপের আড়াল হইতে ধূলি আসিয়া গরুর গাড়িতে উঠিয়া টাকাসমেত গাড়িখানা বাড়ির পথে চালাইয়া দিল ।
এদিকে বালি দৌড়াইয়া আসিয়া গাড়ির কোনো খোঁজ পাইল না। সে তখন বুঝিতে পারিল, নিশ্চয়ই ইহা ধূলির কাজ। সে দৌড়াইতে দৌড়াইতে ধূলির বাড়ির দিকে ছুটিল ।
ধূলি টাকা-পয়সা গনিয়া গাঁথিয়া মাটির তলে পুঁতিয়া শুইবার আয়োজন করিতেছে ; এমন সময় বালি আসিয়া বলিল, “দোস্ত ! সবই বুঝিয়াছি। এবার টাকা-পয়সা ভাগ করিবার আয়োজন কর।”
ধূলি বলিল, “দোস্ত। রাত অনেক হইয়াছে। কাল সকালে আসিও। দুইজনে টাকা-পয়সা ভাগ করিয়া লইব ।”
সারারাত জাগিয়া ধূলি তার বউয়ের সঙ্গে শলাপরামর্শ করিতে লাগিল, কি করিয়া বালিকে ঠকাইয়া সাত বস্তা টাকাই সে নিজে লইবে ।
পরদিন সকালে বালি আসিয়া যখন তার দরজায় ঘা দিল, বউ তখন ডাক ছাড়িয়া কাঁদিয়া উঠিল, “আজ রাত্রে তোমার দোস্ত মারা গিয়াছে । আমি এখন কোথায় যাইবগো!”
বালি বিজ্ঞাসা করিল, “দোস্ত মরিবার আগে টাকা-পয়সার কথা কিছু বলিয়াছে ? সাত ছালা টাকা আমরা কাল লোক ঠকাইয়া আনিয়াছি।”
বউ ত যেন আসমান হইতে পড়িল! “কই, না ত, সাত ছালা টাকা ? আমাদের ঘরে একটা আধলা পয়সা পর্যন্ত নাই। ওগো, আমি কেমন করিয়া বাঁচিবগো । কে আমাকে খাওয়াইবেগো!”
বালি সবই বুঝিল । সে বলিল, “বউ! তুমি কাঁদিও না । আমি তোমাকে বিপদে আপদে দেখিব। আমার দোস্ত যখন মরিয়াই গিয়াছে, আমি তাকে কবর দিয়া আসি।”
এই বলিয়া সে ধূলির পায়ে দড়ি বাঁধিয়া টানিয়া লইয়া চলিল । টানিতে টানিতে তাহাকে কাঁটা’ গাছের মধ্যে দিয়া লইয়া যায় । ইটা খেতের মধ্যে দিয়া লইয়া যায় । কাঁটার খোঁচায়, ইটের ঘষায় তাহার হাত-পা ক্ষত-বিক্ষত হইয়া যায়, তবু ধূলি কথা বলে না । কথা বলিলেই ত সাত বস্তা টাকার ভাগ দিতে হইবে!
এমনি করিয়া টানাটানিতে দুপুর গড়াইয়া সন্ধ্যা হইল । সন্ধ্যা গড়াইয়া রাত হইল। কিন্তু তবুও ধূলি কথা বলে না। তখন তাহারা আসিয়া পড়িয়াছে এক বনের ভিতর। এখন অন্ধকারে বাড়ি ফিরিবারও উপায় নাই। বালি ধূলিকে এক গাছতলায় রাখিয়া, সে নিজে গাছের ডালে উঠিয়া বসিয়া রহিল ।
সে পথ দিয়া একদল ডাকাত ডাকাতি করিতে যাইতেছিল। তাহারা দেখিতে পাইল, গাছের তলায় একটি মড়া পড়িয়া রহিয়াছে। দেখিয়া ডাকাতের সর্দার বলিল, “আজ বড় শুভ যাত্রারে ভাই! পথে একটি মড়া দেখিতে পাইলাম।” এই বলিয়া তাহারা চলিয়া গেল। রাত প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে ; ডাকাতেরা সাত বস্তা টাকা ডাকাতি করিয়া আনিয়াছে ।
ফিরিবার সময় তাহারা এই গাছের তলায় আসিয়া টাকা ভাগ করিতে লাগিল। ডাকাতের সর্দার বলিল, “দেখ ভাই! এই মড়া দেখিয়াছিলাম বলিয়াই আজ আমরা এত টাকা পাইলাম। এক কাজ করি, একে আমাদের টাকার একটা ভাগ দেই।” অপর ডাকাত বলিল, “ও ত মরিয়া গিয়াছে, ওকে টাকা দিলে কাল হয়তো অপর কেহ আসিয়া লইয়া যাইবে । ও আর ভোগ করিতে পারিবে না। তার চাইতে এসো ভাই এক কাজ করি, ওকে এখানে কবর খুঁড়িয়া মাটি দিয়া যাই ।”
তখন সকল ডাকাত একটি কবর খুঁড়িয়া যেই মড়াটিকে কবরে নামাইয়া দিবে, অমনি ধূলি হাত পা আছড়াইয়া চিৎকার করিয়া উঠিয়াছে। গাছের উপর হইতে বালি তাদের ঘাড়ে লাফাইয়া পড়িয়াছে। ভয়ের চোটে টাকা-পয়সা ফেলিয়া সমস্ত ডাকাত দে চম্পট । তখন দুই বন্ধু হাসিতে হাসিতে এ ওর সঙ্গে কোলাকুলি করিল ।
তারপর সেই সাত বস্তা টাকা আগের সাত বস্তার সাথে যোগ করিয়া তাহারা সমান সমান ভাগ করিয়া লইল ।
