গ্রন্থ পর্যালোচনা: The Power of Habit – Charles Duhigg
বইয়ের নাম: The Power of Habit
লেখক: চার্লস ডুহিগ (Charles Duhigg)
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১২
ভাষা: ইংরেজি
প্রকাশনী: Random House
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪০০ (হার্ডকভার সংস্করণ)
বইয়ের ধরন: নন-ফিকশন, সেলফ-হেল্প, মনোবিজ্ঞান ভিত্তিক গবেষণা
বইটা প্রথম হাতে নিয়েছিলাম একঘেয়ে একটা অফিস লাইফের সময়, যেখানে মনে হচ্ছিল আমি রোবটের মতো চলছি—একই রুটিন, একই ক্লান্তি। “The Power of Habit” নামটা তখন শুধু আকর্ষণ করেছিল নামের জন্যই। পড়তে শুরু করতেই বুঝলাম, এই বইটা কোনো চটকদার মোটিভেশনাল গাইড নয়, বরং এটা একটা অনুসন্ধান—মানুষ কেন কিছু করে, কীভাবে অভ্যাস তৈরি হয়, আবার ভাঙে কীভাবে।
বইয়ের পটভূমি ও বিষয়বস্তু
চার্লস ডুহিগ মূলত নিউইয়র্ক টাইমস-এর একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বইটিতে তিনি অভ্যাস তৈরির বিজ্ঞান এবং তা আমাদের ব্যক্তি জীবন, ব্যবসা, সমাজ ও সংস্কৃতিকে কীভাবে প্রভাবিত করে, সেটা বিশ্লেষণ করেছেন। বইটি তিনটি মূল ভাগে বিভক্ত—ব্যক্তিগত অভ্যাস, সফল প্রতিষ্ঠানের অভ্যাস, এবং সামাজিক পরিবর্তনের অভ্যাস।
লেখক ‘হ্যাবিট লুপ’ নামে একটি ধারণা উপস্থাপন করেন—cue → routine → reward। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট ইঙ্গিত বা সংকেত (cue), আমাদের একটি রুটিন বা আচরণে (routine) পরিচালিত করে এবং শেষ পর্যন্ত আমরা একটি পুরস্কার (reward) পাই, যা আমাদের ব্রেইন সেই অভ্যাসকে শক্তিশালী করে। এই কাঠামোটা বোঝার পর আমি নিজের মধ্যেও কিছু অদ্ভুত অভ্যাসের ব্যাখ্যা খুঁজে পেলাম।
উদাহরণ হিসেবে লেখক সাবওয়ের সাবস্যান্ডউইচ চেইন, অলকোহলিক্স অ্যানোনিমাস, টার্গেট রিটেইল কোম্পানি—এমন অনেক প্রতিষ্ঠানের অভ্যাসভিত্তিক কৌশল তুলে ধরেছেন যা পড়ে মনে হয়, “আরে, এভাবে তো আমিও প্রতিদিন ম্যানিপুলেটেড হচ্ছি!”
লেখক পরিচিতি
চার্লস ডুহিগের লেখায় সাংবাদিকের অনুসন্ধানী মেজাজ স্পষ্ট। তিনি Pulitzer Prize বিজয়ী প্রতিবেদক এবং The New Yorker, Harvard Business Review-তেও লেখেন। তাঁর লেখার ভঙ্গি খুব গঠনমূলক, তথ্যসমৃদ্ধ, এবং মাঝে মাঝে গল্প বলার মতো—যেটা পাঠকদের সঙ্গে একটা সংযোগ তৈরি করে।
ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা
আমি ব্যক্তিগতভাবে বইয়ের সেই অংশটা সবচেয়ে উপভোগ করেছি যেখানে উইলিয়াম জেমসের অভ্যাস নিয়ে দর্শন ও মনোবিজ্ঞানের আলোচনা ছিল। নিজের একটা অভ্যাস ভাঙার চেষ্টা করছিলাম—প্রতিদিন সন্ধ্যায় অকারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো। বইয়ে পাওয়া “হ্যাবিট রিডিজাইন” ধারণা মেনে আমি ওই অভ্যাসের cue ও reward খুঁজে বের করে সেটার routine পাল্টে ফেললাম। চমকপ্রদভাবে, এক মাসেই উন্নতি টের পেয়েছি।
পাঠক ও সমালোচকের অভিমত
The New York Times Book Review বলেছে, “Duhigg delivers a first-rate book – an exciting blend of science, psychology, and storytelling.”
অন্যদিকে, The Guardian মন্তব্য করেছে, “A serious look at the science of habit — without ever becoming dry or overly technical.”
বিখ্যাত উদ্যোক্তা Tony Hsieh (Zappos) এই বইয়ের প্রশংসা করে বলেছেন, “It has changed the way I think about my routines — in both personal and professional life.”
দুর্বল দিক
তবে বইটির একমাত্র দুর্বলতা বলা যায়, মাঝে মাঝে কিছু অধ্যায় কিছুটা দীর্ঘ ও তথ্যভিত্তিক হয়ে পড়ে, যেটা সাধারণ পাঠকদের জন্য একঘেয়ে লাগতে পারে। আরও কিছু অধ্যায় সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর করা যেত।
বই থেকে শেখার ব্যবহারিক প্রয়োগ
এই বই থেকে শেখা সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—আমরা আমাদের অভ্যাসের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, কিন্তু অভ্যাসও আমাদের দ্বারা পরিবর্তনযোগ্য।
যে কেউ যদি নিজের লাইফস্টাইল, কাজের রুটিন বা খারাপ অভ্যাস নিয়ে হালকা হতাশায় থাকেন, এই বইটা তাদের জন্য একটা কার্যকর রোডম্যাপ হতে পারে। শুধু পড়লেই হবে না, ভেতরের কাঠামোটা বুঝে জীবনে প্রয়োগ করলেই এর আসল ফল পাওয়া যাবে।
The Power of Habit কোনো ম্যাজিক্যাল বই নয়, বরং এটা আমাদের বাস্তব জীবনের অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার একটি সৎ প্রয়াস। অভ্যাসের ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যক্তি উন্নয়ন সম্ভব—এই বার্তাটা খুব স্পষ্টভাবে ও নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছে দেয় বইটি।

