ডিজিটাল বিজনেস আইডি ডিবিআইডি কতটা স্মার্ট
ই-কমার্স খাতে অস্থিরতার প্রেক্ষিতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করার সুবিধার্থে বিগত ২০২২ সালের ০৬ ফ্রেব্রুয়ারী ডিবিআইডি আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন করা হয় এবং ১৯ ফ্রেব্রুয়ারী সকলের জন্য নিবন্ধনের সুযোগ দেয়া হয়। ০৬ ফ্রেব্রুয়ারী অনুষ্ঠানে মোট ১২টি কোম্পানীকে ডিবিআইডি দেয়ার কথা ছিল। তারমধ্যে ১২টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে সেদিন দাওয়াত দিয়েও ডিবিআিইডি দেয়া হয়নি সমন্বয়হীনতার কারণে এমন সমস্যা হয়েছিল। জানানো হয়েছিল শীঘ্রই তাদের ডিবিআইডি দেয়া হবে। পরবর্তীতে দেখা যায়। দেয়া হয়েছে মাত্র ৫টি প্রতিষ্ঠানকে। বাকীদের অনেকে এখনো ডিবিআইডি পায়নি।
ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনয়ন এবং ই-কমার্সের অনুমোদন সহজ করার উদ্দেশ্য নিয়ে ডিবিআইডি চালু করা হলেও দেখা যাচ্ছে এর কোনো উদ্দেশ্যই সফল হচ্ছে না দীর্ঘ ২ বছর পরও। প্রথমত প্রায় ৫ লক্ষ ই-কমার্স ও এফকমার্স উদ্যোক্তা থাকলেও নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন ১০ হাজারের কম। যা মোট সংখ্যার ২%। এবং আবেদনকারীদের মাত্র ১৫% শতাংশ ডিবিআইডি পেয়েছে। একদিকে আবেদনকারীদের ভুল আবেদন ও অন্যদিকে সঠিক নির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনার অভাব।
আবেদন কম হওয়ার কারণ:
প্রথমত: ডিবিআইডি থাকলে উদ্যোক্তাদের কোনো সুবিধা হয়না এবং না থাকলেও ব্যবসা করতে কোনো সমস্যা হয় না। আমাদের প্রস্তাবমত ডিবিআইডিকে ট্রেড লাইসেন্স এর বিকল্প করার প্রস্তাব ছিল, সেটি এখনো করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত: ডিবিআইডি আবেদন প্রক্রিয়ায় বার বার বিভিন্ন জটিলতা তৈরী হয়েছে। যেমন প্রথম দিকে কারিগরি সমস্যা, তৎপরবর্তীতে বিশিষ্ঠ ব্যক্তির সুপারিশ চাওয়া. তৎপরবর্তিতে বাড়ী ওয়ালার জাতীয় পরিচয় পত্র চাওয়া এর কারণ। বর্তমানে পদ্ধতিগতভাবে সহজ হলেও জটিলতা শেষ হয়নি।
কিছু প্রতিষ্ঠানের ডিবিআইডি আবেদন নাকচ করা হয়েছে, বার বার আবেদন খারিজ করে দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে তাদের ট্রেড লাইসেন্স নাম এবং ওয়েবসাইট নাম এক নয়। এটি একটি যৌক্তিক নয়। প্রতিষ্ঠানের নাম এবং ট্রেড লাইসেন্স বা ওয়েবসাইট আলাদা হতে পারে। সেক্ষেত্রে ওয়েবসাইটটি সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের কিনা তার প্রমাণক দেখতে হবে। যথাযথ প্রমাণ দিলে আবেদন গ্রহণ করা উচিত।
আরেকটি সমস্যা হলো- ডিবি আইডি যে তালিকা সেখানে বিভিন্ন তথ্যের সাথে ডিবিআইডি নাম্বারটি প্রদর্শণ করা হয়না। অথচ এই নাম্বারটি হলো এর প্রধান বিষয়। কারণ এই নাম্বারই হলো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের পরিচায়ক। দ্রুত ভিউ পরিবর্তন করে নাম্বার প্রদর্শণ করানো উচিৎ।
অনুমোদিত ডিবিআইডিগুলো যে ক্রম অনুসারে দেখানো হয় তা জটিল। এখানে সরবশেষ আবেদনটিকে ১ নাম্বার হিসেবে দেখানো হয়। এতে করে প্রতিবার নতুনটি যুক্ত হওয়ার সাথে সাথে সবগুলোর ক্রমিক নাম্বার বদলে যায় এবং এগুলোকে চিহ্নিত করা আরো জটিল হয়ে যায়।
৩। ডিবিআইডি মূলত সেইসব প্রতিষ্ঠানের জন্য যাদের অনলাইন উপস্থিতি আছে হতে পারে সেটা ওয়েবসাইট, সোসাল মিডিয়া পেইজ অথবা মোবাইল অ্যাপ। অথচ যেসব ডিবিআইডি অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেগুলোর ১% এর কোনো ওয়েবসাইট ও ফেসবুকে পেইজ নেই। এরকম ৬টি কোম্পানীর নাম ইতোমধ্যে আরজেএসকে জানানো হয়েছে।
৪। তিনি দেখান যে, সনামধন্য কোম্পানীর ডিবিআইডি আবেদন বাতিল করা হয়েছে ট্রেড লাইসেন্স ও ওয়েবসাইটের নামের ভিন্নতার কারণে অথচ ৫% এর বেশী আবেদন ইতোমধ্যে আরজেএসসি অনুমোদন করেছে যাদের কোম্পানী নাম ও ওয়েবসাইট আলাদা। প্রথম ৮শ ডিবিআইডির মধ্যে আংশিক আলাদা পাওয়া গিয়েছে ২৯টি এবং সম্পূর্ণ আলাদা পাওয়া গিয়েছে ১৭টি।
এমনকি এমন ২টি কোম্পানী পাওয়া গিয়েছে যাদের নামে এমএলএম এর অভিযোগ রয়েছে। যাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে কেউ আবার জেলে আছে অথচ এদেরকে ডিবিআইডি দেয়া হয়েছে। এবং এসব কোম্পানী ডিবিআইডিকে এমএলএম এর পারমিশন বলে মানুষকে ধোকা দিচ্ছে। এদের নামে পত্রপত্রিকায় নিউজ প্রকাশিত হয়েছে। তবুও কিভাবে তারা ডিবিআইডি পেল? এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এটি একটি বড়ো সমস্যা। যেখানে সঠিক ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ডিবিআইডি পাচ্ছে না মাসের পর মাস ধরে অন্যদিকে এধরনের প্রতিষ্ঠান ডিবিআইডি পাচ্ছে। বিষয়টি অবাক হওয়ার মতো।
ডিবিআইডি তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একটি প্রতিষ্ঠান দারাজের ওয়েবসাইট দেখিয়ে ডিবিআইডি নিয়েছে। যা কাম্য ছিলনা। সামান্য নামের পার্থকের কারণে দেশের শীর্ষ ই-কমার্স কোম্পানীকে ডিবিআইডি দেয়া হচ্ছে না। অথচ আরেকটি শীর্ষ ই-কমার্সের নামে অন্য এক ব্যক্তি ডিবিআইডি নিয়েছে।
ই-ক্যাব থেকে অভিযোগ করা হয় যে, ‘‘ই-ক্যাব’’ নাম দিয়েও এক ব্যক্তি ডিবিআইডি নিয়েছে। একটি বর্ণ পবির্তন করেছে মাত্র। এই নামে ডিবিআইডি না দেয়ার জন্য তিনি অনুরোধ করেন। (e-CAB/ ekab)|
ডিবিআইডির অন্যতম শর্ত হলো, এতে নামের বাংলা বানান ও ইংরেজী বানান থাকতে হবে। কিন্তু অন্তত ৩% আবেদন অনুমোদন দেয়া হয়েছে যেগুলো নামের শুধু ইংরেজী বানান রয়েছে বাংলা বানান নেই।
২০২১ সালের ৪ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঘোষিত ‘‘ ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ অনুসারে’’ ঔষধ প্রশাসন কতৃক আলাদা ‘‘অনলাইন ফার্মাসী’’ ড্রাগ লাইসেন্স ব্যতিত কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ঔষধ বিক্রি করতে পারবেনা। অথচ অনুমোদিত ডিবিআইডিতে কমপক্ষে ২টি এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদেরকে উল্লেখিত লাইসেন্স ব্যতিরেকে ডিবিআইডি দেয়া হয়েছে।
একজন ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানের নাম ইংরেজীতে লেখা হয়েছে কারু (karu) অথচ বাংলায় প্রতিষ্ঠানের নামের কলামে লেখা হয়েছে ‘‘ হোসাইন আহমেদ’’।
আবেদনকারীদের করনীয়
১। কিভাবে নির্ভুল ফরম পূরণ করা যায় সেটা দেখে নিয়ে ফর্ম পূরণ করুন।
২। ফর্ম পূরণ এর আগে দেখে নিন আপনার ওয়েব সাইট ও পেইজে আপনি ব্যবসার প্রয়োজনীয় সব তথ্য দিয়েছেন কিনা যেমন- নাম, লোগো, ঠিকানা, ফোন, ই-মেইল, অভিযোগ জানানোর উপায়, পণ্য সেবার ধরণ ইত্যাদি।
৩। ফর্ম পূরণ আগে যে বিষয়গুলো ঠিক করে নিবেন, সেগুলো হলো- আপনার প্রতিষ্ঠানের পণ্য ফেরত নীতি ও মূল্য ফেরত নীতি থাকতে হবে তা বাংলা ও ইংরেজী ২ ভাষায় দর্শনীয় স্থানে লিখিত থাকতে হবে। কুকিজের ক্ষেত্রে একই নিয়ম।
৪। পন্যের সঠিক বিস্তারিত বিবরণ থাকতে হবে। পণ্যটি অ্যাবলেবেল আছে কিনা সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
৫। সর্বোপরী ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ মেনে চলতে হবে।
তা না হলে আপনার আবেদন নাকচ হতে পারে।
কিভাবে এসব সমাধান করা যায়?
১। ডিবিআিইডি বিষয়ক সচেতনতা তৈরী করতে প্রচারণার ও কর্মশালার পাশাপাশি এর কোনো কার্যকারিতা সৃষ্টির কথা বলেন। যেমন ডিবিআইডি দ্বারা ব্যাংক হিসেব খোলার সুযোগ রাখা যেতে পারে।
২। ডিবিআইডিতে ভুল আবেদন এর সংখ্যা কমাতে আবেদন এর প্রথম অংশে যেসব কারণে আবেদন ভুল হয় তার একটা চেকলিস্ট রাখতে বলেন। যার উত্তর শুধু হ্যাঁ অথবা না দিয়ে করা যাবে।
৩। তিনি ই-ক্যাবসহ ৫টি আইসিটি এসোসিয়েশন এর সদস্যদের ৭দিনের মধ্যে ডিবিআইডি দেয়ার প্রস্তাব দেন। যৌক্তিকতা হিসেবে বলেন, কারণ এসব প্রতিষ্ঠান সদস্যপদ দেয়ার সময় ছবি, এনআইডি, টিন, ট্রেডসহ যাবতীয় শর্তপূরণ করে এবং যাচাই বাছাই হয়ে এসেছে।
৪। যাচাই বাছাই ও অনুমোদন এর দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ই-কমার্স সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন এবং ই-ক্যাব থেকে এ ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
৫। যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম ও ওয়েবসাইট নাম আলাদা তাদের ওয়েবসাইটে যদি মুল কোম্পানীর সংশ্লিষ্টতা ও মালিকানার প্রমাণ থাকে সেক্ষেত্রে ডিবিআইডি দেয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
৬। আরজেএসসি, ই-ক্যাব ও এটুআই বসে সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করে ডিবিআইডি সফলতা বৃদ্ধির কথাও বলেন।
৭। চিহ্নিত হওয়া ভুলগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে। এবং পরবর্তীতে যাতে এ ধরনের ভুল না হয় তা খেয়াল রাখতে হবে।
৮। যেসব ঝুকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে ডিবিআিইডি দেয়া হয়েছে। সেগুলো অনতিবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
৯। যেসব কারণে ডিবিআইডির আবেদন বাতিল হয়ে যায়। সেসব বিষয় মূল ফর্মের প্রথম পাতায় যোগ করে YES/NO অপশন দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।
১০। অবশ্যই আবেদন ফর্মে বিজনেস ক্যাটাগরি থাকতে হবে।

