ছবি: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ঠ (এসডিজি) স্থানীয়করণ বা লোকালাইজেশনের চ্যালেঞ্জ

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ঠ (এসডিজি) স্থানীয়করণ বা লোকালাইজেশনের চ্যালেঞ্জ
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ঠ (এসডিজি) বাস্তবায়ন বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় লক্ষ্য। স্থানীয়করণ বা লোকালাইজেশনের মাধ্যমে প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা এই প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি। তবে, এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, যা সঠিকভাবে মোকাবিলা করা না গেলে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বাংলাদেশে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে আমি সংশয় প্রকাশ করছি। আমার সংশয়ের কারণগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো-

১. লক্ষ্যস্থির প্রক্রিয়ায় গলদ
এসডিজি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় নানা ত্রুটি রয়েছে। অগ্রাধিকার তালিকা প্রণয়নে স্থানীয় চাহিদার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূচক বাস্তবায়নে দেরি হয়। বাস্তবমুখী লক্ষ্য ঠিক না করে কোন লক্ষ্য ঠিক করলে সেটা কাগজে কলমে অর্জিত হয়েছে দাবী করা যাবে এ ধরনের লক্ষ্য স্থির করা হয়। ফলে বেশীরভাগ কর্মসূচী মুখ থুবড়ে পড়ে।

২. বোঝাপড়ার অভাব
বাস্তবায়নের সাথে জড়িত সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে এসডিজির সূচক এবং লক্ষ্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত বোঝাপড়ার অভাব রয়েছে। এতে কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা সম্ভব হয় না। সঠিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা হয় না। সরকারী অফিসে যেমন সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক কাজের দায়িত্ব দেয়া হয় না। সরকারী সংস্থাগুলো যখন বেসরকারী খাত থেকে বিশেষজ্ঞ ডাকে তখনও পরিচিতির উপর ভিত্তি করে লোকদের সম্পৃক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ঠতা বা দক্ষতার উপর নয়।

৩. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
সরকারি দপ্তরগুলোতে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি এবং দায়সারা মানসিকতা টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা ব্যাহত করছে। উদ্যোগগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়ন না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসছে না। এখানে আমলাদের একটা অংশ মনে করে তারাই সব বোঝে বাকী কিছু বোঝে না। উপরন্ত তারা মাঠ-কর্ম বা ফিল্ড ওয়ার্ক করার বদলে তারা ঘরকর্ম বা টেবিলে বসে কাজ সারতে বেশী পছন্দ করে। এমনকি গ্রামীণ এলাকার পরিবর্তে শহুরে এলাকাকে প্রাধান্য দিয়ে লক্ষ্যকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে।

৪. সমন্বয়হীনতা
সরকারি বিভিন্ন দপ্তর এবং সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে, স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক দপ্তরের মধ্যে সহযোগিতার অভাবে অনেক প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হয়। সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরগুলো ঠিকভাবে সম্পৃক্ত হয়না। হলে সময়মতো সাড়া দেয়া না। আর দিলে যে ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়া হয়। কয়দিন পর আবার তার বদলি হয়ে যায়।

৫. কর্মসূচির ধারাবাহিকতার অভাব
এসডিজি বাস্তবায়নে গ্রহণ করা অনেক কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হয় না। এক প্রশাসনের অধীনে শুরু হওয়া প্রকল্প পরবর্তী প্রশাসনের সময়ে আর গুরুত্ব পায় না। সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাজেট ঘাটতি ইত্যাদি কারণে কর্মসূচীর ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। ছন্দপতন হয়।

৬. বাস্তবতা বর্জিত প্রতিবেদন
অগ্রগতির প্রতিবেদনগুলো অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। বানোয়াট তথ্য এবং কাগজে-কলমে সাফল্যের গল্প পরিবেশিত হলেও বাস্তবে প্রভাব সীমিত। কাজকে সহজ করার জন্য ক্ষেত্রবিশেষে নিজেদের সফলতা জাহির করার জন্য ভুল অগ্রগতি ও প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। েএতে কর্মসূচী এবং তার উদ্দেশ্য দুটোই মুখ থুবড়ে পড়ে।

৭. জনগণের সম্পৃক্ততা কম
সাধারণ জনগণকে এসডিজি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করতে না পারা অন্যতম বড় ব্যর্থতা। তাদের সচেতনতা এবং অংশগ্রহণ ছাড়া প্রকল্পগুলো টেকসইভাবে কার্যকর হয় না। সংশ্লিষ্ঠ, প্রান্তিক এবং সাধারণ জনগনকে সম্পৃক্ত করা হয় না। অথচ বলা হয় সাধারণ জনগনের জন্যই এটা কাজ করছে। সাধারণ মানুষের সমস্যা না জানা এবং জনমুখী বাস্তবায়ণ পদ্ধতি এখন জরুরী দরকার।

৮. লক্ষ্যসম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার অভাব
সরকারি কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে। ফলে, বাস্তবায়নে ভুল পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত দেখা যায়। লক্ষ্য বাস্তবায়নে যাদের সম্পৃক্ত করা হয় তারা এর বৃহৎ লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চায়না। তারা শুধু হুকুম তামিল ও প্রতিবেদন তৈরীর কথা ভাবে। ফলে লক্ষ্য অর্জনের পথ বেঁকে যায়।

৯. স্থানীয় সরকারের অনিয়ম
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং দুর্নীতি এসডিজি প্রকল্পগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে। তদারকির অভাবেও প্রকল্পের মান বজায় থাকে না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দেয়া হয় অদক্ষ লোকদের স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে। তারউপর আছে নানারকম আশ্রিত প্রশ্রিত দূর্নীতি। যারা আসলে মুল কাজের চেয়ে পকেট ভরতে বেশী ব্যস্ত থাকে। সরকারের কোটি টাকা গচ্ছা যাচ্ছে কিনা সেটা বিষয় নয়, সে হাজার টাকার পকেটমানি পেল কিনা সেটা বিষয়।
প্রযুক্তির ব্যবহার:
এসডিজি স্থানীয়করণের জন্য প্রযুক্তি যেমন ডেটা অ্যানালাইসিস সফটওয়্যার, জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (GIS), বা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।

১০. বেসরকারি খাতের ভূমিকা:
বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রভাব এবং তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে।

১১. জনমুখী সচেতনতা অভিযান:
জনগণকে সম্পৃক্ত করতে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কীভাবে গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

১২. আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা:
অন্য দেশের উদাহরণ দিয়ে দেখানো যেতে পারে, কীভাবে তারা এসডিজি স্থানীয়করণে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে এবং সেখান থেকে কী শেখা যায়।

এসডিজি স্থানীয়করণের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করা জরুরি। সরকারের কার্যকর সমন্বয়, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, এবং বাস্তবসম্মত অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সকল অংশীদারের সমন্বিত উদ্যোগই বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করতে পারে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply